সামাজিক বিবর্তনে নারী ও পুরুষের যৌথ প্রচেষ্টা

বিবর্তন বলতে আমরা পরস্পর সম্পর্কিত একটা সত্তার সামগ্রিক ব্যবস্থাকে বুঝি, যা সুপ্ত ও প্রকাশ্য দুই অবস্থাতেই পাওয়া যায় এবং যা প্রাকৃতিক, জৈবিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ধারার বিকাশ সাধন করে। কিন্তু, সামাজিক বিবর্তনের ধারণাটি ভিন্ন। সামাজিক বিবর্তন বলতে সমাজব্যবস্থায় স্বাভাবিক রূপান্তরকে বোঝায়। প্রাথমিক পর্যায়ে মানব সমাজের সামাজিক সংহতি ছিল খুবই শক্তিশালী। কিন্তু, জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে উত্পাদন ব্যবস্থায় শ্রমবিভাজনের ফলে সামাজিক সংহতি দুর্বল হয়ে সমাজে জৈবিক সংহতির সৃষ্টি হয়।

সামাজিক বিবর্তনের সঙ্গে নারী এবং পুরুষের অর্থনৈতিক সম্পর্ক লক্ষ্য করা যায়। শুরুতে জীবন রক্ষার জন্য উত্পাদনের উপায়গুলো ছিল খুবই অনুন্নত। শ্রমের বিভাগও বিকাশ লাভ করেনি। নারী ও পুরুষের কাজের মধ্যেও তেমন পার্থক্য সৃষ্টি হয়নি। এই পর্যায়ে উত্পাদনের ক্ষেত্রে ব্যক্তি সম্পর্ক ছিল অপরিহার্যরূপে সামাজিক ও সমষ্টিগত। আদিম সাম্যবাদ যখন ছিল তখন কোনো ধরনের ব্যক্তিগত মালিকানা ছিল না। মানুষ যৌথভাবে বসবাস করত, দলবদ্ধভাবে খাবার জোগাড় করে যৌথভাবে খাদ্য গ্রহণ করত। বনের পশু বা জঙ্গলের কোনো মালিকানা ছিল না। সবার সমান সমান অধিকার। উত্পাদনের উপকরণগুলো ছিল সমাজের অধিকারে। উত্পাদনের উপকরণের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানার ধারণা তখনো আসেনি। কোনো শ্রেণি ছিল না; তাই কোনো শ্রেণি শোষণও ছিল না। উত্পাদনের উপায়ের যৌথ সম্প্রদায়গত মালিকানা শোষণের অনুপস্থিতি, স্বাভাবিক লিঙ্গ ও বয়সের বিভক্তির ভিত্তিতে যৌথ শ্রম, দ্রব্য সামগ্রীর দাম বণ্টন, উত্পাদিকা শক্তির বিকাশের নিম্ন মাত্রা এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।

আদিম সাম্যবাদী সম্প্রদায় বা গোত্র ছিল সংখ্যায় ক্ষুদ্র। এই ধরনের মানবগোষ্ঠী তার সব সদস্যের খাদ্যের সংস্থান করার আশা করতে পারত না। এ ধরনের কোনো সম্প্রদায়ের শ্রম সংগঠন করা হতো কম-বেশি একটি পরিকল্পনা অনুসারে। ধারণা করা হয়, এ ধরনের সমাজে বর্গ মাইল প্রতি ১৫০ জনের মতো মানুষ থাকে। এই সমাজব্যবস্থা অনেকটা মাতৃত্বপরায়ণ ছিল বলা চলে। কারণ, সামাজিক সম্পর্ক এবং ফসল চাষের কাঠামো নারীবাদী কাজের চার পাশে সংগঠিত হতো। বিপরীতভাবে, শিকারী-সংগ্রাহক সমাজগুলো সাধারণত পিতৃতান্ত্রিক ছিল কারণ তাদের সামাজিক বন্ধন এবং শিকারের কাঠামো পুরুষতান্ত্রিক কাজের চারপাশে সংগঠিত হতো। মূলত, নারীরা উদ্যান-কৃষি সমাজের কাজ এবং বেঁচে থাকার কেন্দ্রে থাকে, তাই তারা পুরুষদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান।

সমাজ নির্মাণে, সমাজের অবস্থা পরিবর্তনে নারী ও পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা সফল করছে সেই আদি যুগ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত, যা এখনো আমাদের মাঝে বিরাজমান। আগের মতো নারী-পুরুষ সমানতালে কাজ করে চলেছে। আদি যুগে যেমন কৃষিকাজ বা গৃহস্থালির অন্যান্য কাজে একে অপরের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যেত তেমনি এখনো সেই সম্পর্ক বিরাজমান। নারী-পুরুষের এই সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এগিয়ে যাচ্ছে পৃথিবী। তাই তো কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ নজরুলের এই উক্তিটিই প্রমাণ করে যে সামাজিক বিবর্তনে নারী-পুরুষের যৌথ প্রচেষ্টা বিদ্যমান সেটা শুধু অর্থনৈতিক বিষয়েই নয়, সামগ্রিক বিষয়েও।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়