কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা হলো ৯ বছর হয়েছে। দুই শতাধিক শিক্ষার্থী এরই মধ্যে এমবিবিএস পাশ করে চলে গেছে। কিন্তু তারা নিজস্ব ক্যাম্পাস ও ভবনে শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ পায়নি। এর মধ্যে দুই বার প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। অথচ প্রকল্পের কাজ এগিয়েছে মাত্র ৫৫ ভাগ। অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতিসহ নানা জটিলতায় অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প থমকে গেছে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম চলছে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালসংলগ্ন মেডিক্যাল অ্যাসিসটেন্ট ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (ম্যাটস) ভবনে। বর্তমানে পঞ্চম থেকে নবম ব্যাচের ২৮৭ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। আবাসনের ব্যবস্থা না থাকায় অস্থায়ী ক্যাম্পাসে নানা ধরনের ভোগান্তি সয়ে তারা শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছেন। অন্যদিকে এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ চিকিত্সাসেবা থেকে হচ্ছেন বঞ্চিত। এদিকে, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের গঠিত তদন্ত টিমের প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট দোষী কর্মকর্তা-প্রকৌশলীরা আসছেন শাস্তির আওতায়। গত মঙ্গলবার একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্পের অনিয়মে জড়িতরা অবসরে গেলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২১ সালের ৫ জানুয়ারি একনেক সভায় এ প্রকল্পের মেয়াদ আবারও বৃদ্ধি ও অতিরিক্ত প্রাক্কলন ব্যয়সংক্রান্ত ফাইলটি উপস্থাপন করা হয় প্রধানমন্ত্রীর সামনে। প্রকল্পের ধীরগতির জন্য তিনি চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে ফাইলটি ফেরত পাঠান এবং উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত টিমকে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।
২০১২ থেকে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজের অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময় দুদফা সময় বাড়ানো হয়। সেই বর্ধিত সময় শেষ হলেও কাজ এগোয়নি বেশি দূর। ফলে মেয়াদ শেষ হওয়ায় প্রকল্পের কাজ এখন পুরোপুরি বন্ধ। প্রকল্প এলাকায় বর্তমানে বিরাজ করছে ভুতুড়ে পরিবেশ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুষ্টিয়া সফরে এসে কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী মহাসড়কসংলগ্ন ২০ একর জায়গার ওপর কুষ্টিয়া সরকারি মেডিক্যাল কলেজের বহুতল একাডেমিক ভবন ও ১০তলা ফাউন্ডেশনের ছয়তলা হাসপাতাল ভবনসহ অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। প্র্রকল্পের জন্য ২৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। নির্মাণাধীন ৫০০ শয্যার হাসপাতাল, একাডেমিক ভবনসহ অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ থমকে গেছে। কবে নাগাদ কাজ আবার শুরু হবে তা কেউ সঠিকভাবে বলতে পারছে না।
প্রকল্পটি সরেজমিনে দেখতে আইএমইডির সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত টিম গত ১৭ জানুয়ারি কুষ্টিয়া আসে। তদন্ত টিম অতিসম্প্রতি প্রকল্পটি বাস্তবায়নে খাতওয়ারি অনিয়ম-দুর্নীতি চিহ্নিত ও জড়িত সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দাখিল করেছে। এতে জড়িত কর্মকর্তা-প্রকৌশলীরা শাস্তির আওতায় আসবে কিনা তা নিয়ে জনমনে ছিল সংশয়। কিন্তু গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্পটি বাস্তবায়নে অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিলে জড়িতরা যে শাস্তি পাবেন সেটি নিশ্চিত হয়। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজের সংশোধনী প্রকল্পটি অনুমোদন প্রদান করেন। এর আগে ২০১৬ সালে আইএমইডির অন্য তদন্ত টিমের প্রতিবেদনেও প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র উঠে আসে।
ঐ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অনুমোদিত প্রকল্পের শর্ত ভঙ্গ ও ডিজাইন পরিবর্তন করে কাজ বাস্তবায়নে ধাপে ধাপে ব্যয় বৃদ্ধি, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি ও কারিগরি সাব-কমিটির কার্যবিবরণীসহ সুপারিশ অনুমোদন, চুক্তিপত্র, কার্যাদেশপত্র ইত্যাদির কোথাও অনুমোদিত কাজের পরিমাণ এবং চুক্তিভুক্ত খাতের মূল্য বৃদ্ধির পরিমাণ উল্লেখ না করে সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়। এছাড়া অননুমোদিতভাবে চুক্তিমূল্য ও ডিপিপি মূল্যের অতিরিক্ত ব্যয়সহ নানা অনিয়ম হয়েছে বলে ঐ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক কুষ্টিয়া গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহিদুল ইসলাম জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণ অনুসন্ধানে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত টিম সরেজমিন তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। বিষয়টি এখন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারভুক্ত। ফলে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা সমীচীন নয়। কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. দেলদার হোসেন জানান, অবকাঠামোর অভাবে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখনো অস্থায়ী ক্যাম্পাসেই চলছে মেডিক্যাল কলেজের কার্যক্রম। মূল ক্যাম্পাসে ফিরতে পারলে বিরাজমান অসুবিধা দূর হবে। একই সঙ্গে চিকিত্সাসেবায় অগ্রগতি ও পরিধি বাড়বে।