>> সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার
প্রথাগত ধারার বাইরে গিয়ে শিল্পকর্মের মাধ্যমে পুরোনো স্থাপনার ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরার কাজ করছে উড়ন্ত আর্টিস্ট কমিউনিটির রেসিডেন্সিয়াল আর্ট এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম। ‘দেশে না-জানা অসংখ্য পুরোনো স্থাপত্য নিদর্শন আছে, যেগুলো ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তার বেশিরভাগই ধ্বংসের সম্মুখীন। আমরা সেই স্থাপনাগুলোকে খুঁজে বের করি। সেখানে আটদিন অবস্থান করে তার পিছনের গল্প জানার চেষ্টা করি ও শিল্পকর্মের মাধ্যমে তার স্মৃতি ও ইতিহাসকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করি। পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পীদের সঙ্গে বিদেশি শিল্পীদেরও নান্দনিক ভাবনার আদানপ্রদান হচ্ছে ও যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে।’ এমনটাই বলছিলেন প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা সাদিয়া মিজান।
এরমধ্যেই দেশের বেশকিছু প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ভবন নিয়ে কাজ করেছেন তারা। এই তালিকায় রয়েছে কুষ্টিয়া, কিশোরগঞ্জ, সাতক্ষীরা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, সুনামগঞ্জ ও সিলেটের কয়েকটি জমিদারবাড়ি। জীবনানন্দ দাশের শহর থেকে শুরু করে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম পর্যন্ত ঘুরে বেড়িয়েছেন এই আর্টিস্ট কমিউনিটিতে যুক্ত শিল্পীরা।
প্রচলিত ধারায় শিল্পকর্মের প্রদর্শনী কেবল গ্যালারিকেন্দ্রিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে গ্রাফিক ডিজাইনে পড়াশোনা শেষ করা সাদিয়া ভিন্ন কিছু করার কথা ভাবছিলেন। আর্ট বা শিল্পকর্ম যে কেবল ছবির ক্যানভাসে সীমাবদ্ধ থাকবে, তা নয়; বরং তা হতে পারে মাল্টি-ডিসিপ্লিনারি বা বিভিন্ন আঙ্গিকের। সাদিয়া বললেন, ‘সাধারণত দেখা যায় ভিজ্যুয়াল আর্টের চেয়ে পারফর্মিং আর্টের দর্শকশ্রোতা ও গ্রহণযোগ্যতা বেশি। যদি নান্দনিক উপায়ে ভিজ্যুয়াল আর্টকে বিস্তৃত করা যায়, তবে তা আরও বড় পরিসরে দর্শকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করবে।’
কুষ্টিয়ায় সাদিয়ার দাদাবাড়িটিও একটি প্রাচীন জমিদার বাড়ি, সেটিই তাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছে শিল্পকর্মের মাধ্যমে স্থাপত্যের ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য কিছু করতে। সেই ভাবনা থেকেই ২০১২ সালে উড়ন্ত-এর যাত্রা শুরু হয় তার ব্যক্তিগত অর্থায়নে। শুরু থেকেই এর সঙ্গে কাজ করেছেন চিত্রশিল্পী, স্থাপতি, প্রকৌশলী, ভাস্কর, আলোকচিত্রী, লেখক, ইনস্টলেশন আর্টিস্ট, পারফরম্যান্স আর্টিস্ট, মিউজিশিয়ান, সাউন্ড আর্টিস্ট, ক্রাফটসম্যান, টেক্সটাইল ডিজাইনারসহ বিভিন্ন সৃজনশীল পেশার মানুষ। তাদের প্রত্যেকেই নিজেদের সৃজনশীলতাকে ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে কাজে লাগিয়ে পুরোনো স্থাপত্যগুলোর ইতিহাস সংরক্ষণে কাজ করছেন। উড়ন্ত-এর শিল্পীরা যখন বিভিন্ন জিনিসের মাধ্যমে সহজভাবে তাদের কাছে ইতিহাস তুলে ধরেছেন, স্থাপনাটির রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্বের কথা জানিয়েছেন, তখন স্থানীয়রাও এতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এই পর্যন্ত বারোটি দেশের আশিরও বেশি শিল্পী বাংলাদেশে এসে উড়ন্ত-এর সঙ্গে কাজ করেছেন।
এ পর্যন্ত তাদের করা কাজগুলো প্রদর্শন করা হয়েছিল ২০১৮ সালের ঢাকা আর্ট সামিটে। ওই প্রদর্শনীর পর বেশকিছু সুযোগ ও সম্ভাবনা আসে তাদের সামনে। ফাউন্ডেশন ফর আর্টস ইনিশিয়েটিভ উড়ন্ত-এর প্রতিষ্ঠাতা সাদিয়া মিজানকে মনোনীত করে রিসার্চ গ্র্যান্টের জন্য। সংস্থাটি থেকে দেশে এবারই প্রথম ব্যক্তিগত ক্যাটাগরিতে রিসার্চ গ্র্যান্ট মনোনয়ন দেওয়া হয়। গবেষণার উদ্দেশ্যে ১৩ ফেব্রুয়ারি সাদিয়া দক্ষিণ আফ্রিকা যাচ্ছেন।
সাদিয়া শিল্পজগতে একজন ইন্ডিপেন্ডেন্ট কিউরেটর হিসেবে পরিচিত থাকলেও পেশায় একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে কর্মরত আছেন। এছাড়া আর্ট গ্যালারি, ম্যাগাজিন ও নানা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। এশিয়া আর্ট আর্কাইভে কন্ট্রিবিউটিং রিসার্চার হিসেবে কাজ করেছেন এবং কিছুদিন আগেই আর্ট থিঙ্ক সাউথ এশিয়া থেকে তাকে ২০১৮ সালের দক্ষিণ এশিয়ার দেশের মধ্যে নির্বাচিত ১২ জন আর্টস ম্যানেজারের মধ্যে একজন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ‘আমরা আরও অনেক কাজ করতে চাই। রেসিডেনশিয়াল আর্ট এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের মাধ্যমে আমরা যে কাজটি করছি সেটিও অব্যাহত থাকবে।’ এমনটাই বললেন সাদিয়া।