হৃদয়ের খুব কাছে যাঁরা

শিক্ষা যদি জাতির হয় মেরুদণ্ড, তবে তো শিক্ষকরাই সেই মেরুদণ্ডের নির্মাতা। জাদুর কাঠির স্পর্শে যেমন মূল্যহীন বস্তুও মহামূল্যবান হয়ে যায়, তেমনি একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রভাবও একজন শিক্ষার্থীর জীবনে পরশ পাথরের মতোই। শিক্ষার্থীর মননের উৎকর্ষতা, মানবীয় গুণাবলির বিকাশ সাধন, জ্ঞানার্জনের স্পৃহা জাগানো এবং মানুষ হিসেবে পূর্ণতা প্রাপ্তির রূপকারই হচ্ছেন শিক্ষকগণ। জগতে যত রথী-মহারথী নিজ গুণের জ্যোতির্ময়তায় জগতকে উদ্ভাসিত করেছেন, প্রত্যেকেই তাঁদের শিক্ষকের অবদানকে নির্দ্বিধায় শিকার করে নেন।

সোনার মানুষের রূপকার সকল শিক্ষকদের সম্মানার্থে প্রতিবছর ৫ অক্টোবরে তাই ঘটা করেই ‘শিক্ষক দিবস’ উদযাপন করা হয়। শিক্ষা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৯৫ সাল থেকেই ইউনেস্কো কর্তৃক প্রতিবছর এই দিনটিকে ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ হিসেবে উদযাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়। সেই থেকেই বিশ্বের শতাধিক দেশে দিবসটি যথাযথ আয়োজনে পালিত হয়ে আসছে। এবারের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য ‘শিক্ষা পুনরুদ্ধারের কেন্দ্রবিন্দুতে শিক্ষক’।

জ্ঞান অর্জনীয়, আর শিক্ষা আচরণীয়। অর্জিত জ্ঞানের যথেচ্ছ প্রয়োগ আর সদ্বিবেচক আচরণই সুশিক্ষা। জ্ঞান, প্রজ্ঞা, নীতি-নৈতিকতা, সততা, সময়ানুবর্তিতা, মহানুভবতা, ব্যক্তিত্বের বলিষ্ঠতা ও সকল প্রকার অনুকরণীয় মানবীয় গুণাবলির ধারক ও বাহক যেই শিক্ষক, তাঁর ছাত্ররাও যে মানুষ হিসেবে সফলতার শিখরে আরোহন করবে, এটাই তো স্বাভাবিক। আর এখানেই একজন আদর্শ শিক্ষকের চূড়ান্ত সিদ্ধি।

যে শিশু চারাগাছের মতো অপরিণত ও অপ্রস্তুত হয়ে তার শিক্ষালয়ে প্রবেশ করলো, তাকে সুশিক্ষার অবলম্বনে পরিণত এক মহীরুহের মতোই সুপ্রতিষ্ঠিত করার কৃতিত্ব একজন শিক্ষকেরই।

শিক্ষার্থীর অন্তরে জ্ঞান-তপস্যার অভিপ্রায় জাগানো, তার মেধার স্ফূরণ ঘটানো, মননের বিকাশ সাধন, উৎকৃষ্ট চারিত্রিক গুণাবলির দীক্ষা প্রদান, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটানো, অন্তরের মরীচিকা ঘুচানো, নিরহংকার, নির্লোভ, ব্যক্তিত্ববান, সৎ, যোগ্য, পরোপকারী ও মহানুভবতার আদর্শের অনুঘটক তো একজন শিক্ষকই। এমনই ছাঁচে গড়া যেই শিষ্য, সেই তো সুশিক্ষার ধারক ও বাহক।

বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের নিয়ে আমরা খুব বেশি নিরাশ হয়ে যাই। উচ্ছন্নে যাওয়া এক প্রজন্ম হিসেবে রায় দিয়ে তাদের একরাশ গালমন্দও করে ফেলি হয়তো। কিন্তু কিছু তরুণেরা স্রোতে গাঁ ভাসায়নি। অধঃপতন তাদের গ্রাস করেনি। শৈশব-কৈশোরের শিক্ষাগুরুর শিক্ষা আর আদর্শকে ধারন করে এবং তার যথাসম্ভব চর্চা করেই তারা তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

অকৃত্রিম ভালোবাসা, বিনম্র শ্রদ্ধা আর আকাশসম কৃতজ্ঞতায় তারা স্মরণ করেন তাদের সেই সকল শিক্ষকদের। নিজেদের জীবনে সেই শিক্ষকদের অবদান, তাঁদের থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা আর আদর্শের মাহাত্ম্য অনুধাবন করে আজ শ্রদ্ধায় তাদের মাথা অবনত, চোখে কৃতজ্ঞতার অশ্রু। শিক্ষকদের নিয়ে অনেক গল্প আছে, যে গল্পগুলো যে কাউকেই নিজেদের শৈশব-কৈশোরের শিক্ষাগুরুর স্মৃতির অনুচিন্তন ঘটাবে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী সোহাগ আকন্দ কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেছেন তার স্কুল-শিক্ষক জনাব মোঃ আকবর হোসেন এবং মোঃ সাহাবুদ্দিন হোসেনের কথা। গাজীপুর কৃষি গবেষণা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াকালীন বাবা মারা যাবার পর একেবারে ন্যূনতম সম্মানিতে আকবর স্যার তাকে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞান পড়িয়েছেন। আর সাহাবুদ্দিন স্যার পড়াতেন গণিত। তাদের এই সহযোগিতা এবং সার্বিক দিকনির্দেশনার ফলেই তিনি পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন।

রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী লাবণী আক্তার জিরাবো ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল (বর্তমানে সেনা পাবলিক স্কুল, সাভার) থেকে জেএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে জিপিএ-পাঁচ পেতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তখন স্কুলের নিয়ম অনুযায়ী প্রথমে তাকে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হতে দেয়া হয়নি। পরবর্তীকালে তার স্কুলের বাংলা বিভাগের শিক্ষিকা লিপি রাণী দাস এবং জীববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষিকা সাহেরা পান্না ম্যামের অনুপ্রেরণা, তাঁদের উৎসাহ, অনুপ্রেরণা এবং নিবিড় তত্বাবধানেই লাবণী এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে গোল্ডেন জিপিএ-পাঁচ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। পরবর্তীতে উচ্চমাধ্যমিকের গন্ডি পেড়িয়ে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেয়ে যান। আইয়ুব স্যার, তারেক স্যার এবং তার শৈশবের শিক্ষক পরিমল স্যারের কথাও তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী মোঃ সাইফুল ইসলামও তার শৈশবের শিক্ষিকা শিপ্রা রাণী ঘোষকে সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করেছেন। তিনি বলেন ‘ম্যাম আমাকে নিজের সন্তানের মতোই আদর করতেন এবং আমার জীবনে যা কিছু অর্জন সব কিছুতেই ম্যামের ভূমিকা অনস্বীকার্য।’ ম্যাম ছিলেন তার জন্য অনন্য অনুপ্রেরণাদায়ী। তার সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে ম্যামের ভূমিকাই ছিল প্রধান। জীবনের গতিময়তা, চলার পথে পরিশ্রমের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন, বিনয়, সময়ানুবর্তিতা এবং নিয়মানুবর্তিতার দীক্ষা প্রাপ্তি ও নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জনের কৃতিত্বও তিনি শিপ্রা ম্যামকে দিয়েছেন।

নিজ গৃহের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই একজন শিক্ষার্থী দিনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় করে। শিক্ষকদের সংস্পর্শেই তার ভবিষ্যতের বুনিয়াদ গড়ে ওঠে। শুধু জ্ঞান দানই নয়, শিক্ষার্থীর চারিত্রিক-মানসিক সৌকুমার্য ও প্রেষণা সৃষ্টি, ব্যক্তিত্ব গঠন, মানবীয় গুণাবলির শিক্ষণ ও বাস্তবায়ন, সর্বোপরি আদর্শ মানুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশের জন্য 'শিক্ষক' নামক জীবন-কারিগরের ভূমিকা কতটা, তা এই শিক্ষক দিবসে অনুধাবন করা এবং বিনম্র চিত্তে ও কৃতজ্ঞতাভরে নিজ-নিজ শিক্ষকের অবদান স্মরণ করা এবং তাঁদের শারীরিক ও মানসিক পরিপূর্ণ সুস্থতা এবং সর্বাঙ্গীণ উন্নতি কামনা করাই হোক সকল বিদ্যার্থীর করণীয়। ভালো থাকুন সকল মানুষ গড়ার কারিগরেরা। চির অম্লান হউক তাঁদের স্মৃতি। আঁধার কেঁটে আপন আলোয় জগৎ উদ্ভাসিত করুক তাঁদের শিষ্যরা।

ইত্তেফাক/এসটিএম