অ্যাপসভিত্তিক ডিজিটাল মাইক্রোফাইন্যান্সের নামে অবৈধ সুদের ব্যবসা পরিচালনাকারী প্রতারক চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ। গ্রেফতারকৃতরা হলো—ইমানুয়্যাল এডওয়ার্ড গোমেজ, আরিফুজ্জামান, শাহিনূর আলম ওরফে রাজীব, শুভ গোমেজ ও মো. আকরাম। ৫ ও ৬ অক্টোবর ধারাবাহিক অভিযানে ঢাকা মহানগরীর ধানমন্ডি, বনানী এবং মিরপুর এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করে গোয়েন্দা ওয়েববেজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম। এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি এলিয়ন গাড়ি, ৯টি মোবাইল ফোনসেট, ৯টি সিমকার্ড, চারটি ল্যাপটপ ও চারটি বিভিন্ন ব্যাংকের চেকবই জব্দ করা হয়। গতকাল ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানান ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার।
তিনি বলেন, গ্রেফতারকৃতরা সরকারি অনুমোদন ছাড়াই থান্ডার লাইট টেকনোলজি লিমিটেড, নিউ ভিশন ফিনটেক লিমিটেড ও বেসিক ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির নামে আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে। আইনগত অনুমোদন ছাড়া তারা গ্রাহকের তথ্য সংগ্রহ করছে। গ্রাহকরা উক্ত অ্যাপ ইন্সটল করার মাধ্যমে অ্যাপে গ্রাহকের অজান্তে ক্যালেন্ডারের ইভেন্ট পড়া, গ্রাহকের অনুমতি ছাড়া দূর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে গ্রাহকের মোবাইল ক্যামেরা ব্যবহার করে ছবি ও ভিডিও ধারণ, মোবাইলের কন্টাক্টস পড়াসহ মোবাইলের প্রকৃত লাইভ লোকেশন নির্ণয়, ফোনের স্ট্যাটাস এবং তথ্য সংগ্রহ, ফোনে সংরক্ষিত মেসেজ পড়া ও পরিবর্তন করার অনুমতি নিয়ে নেয়। এক্ষেত্রে গ্রাহকের পারসোনাল ডাটা সিকিউরিটির চরম হুমকিতে পড়ে।
তিনি আরো বলেন, গ্রেফতারকৃতরা অনলাইন অ্যাপসের মাধ্যমে জামানতবিহীন ঋণ দেওয়ার নামে চলে মাত্রাতিরিক্ত সুদের কারবার। এসব অ্যাপস সার্ভার চীনে অবস্থিত এবং যেগুলো মূলত সেখান থেকে পরিচালিত হয়। কিছু চাইনিজ নাগরিক বাংলাদেশি নাগরিকের সহায়তায় বর্ণিত অ্যাপসগুলোর মাধ্যমে জামানতবিহীন স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার নামে চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে গ্রাহক আকৃষ্ট করে। গ্রাহকরা ঋণ নেওয়ার পর স্বল্প হারের পরিবর্তে উচ্চহারে সুদ দেওয়ার মাধ্যমে প্রতারিত হচ্ছে। এক ভুক্তভোগীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ধানমন্ডি থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি মামলা রুজু হয়। এ মামলা তদন্ত শুরু করে গোয়েন্দা সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ।
অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, চাহিদা অনুযায়ী আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মাত্রাতিরিক্ত প্রসেসিং ফি নিয়ে এবং উচ্চ হারে সুদ নির্ধারণ করে স্বল্প সময়ের জন্য তিন থেকে সাত দিনের জন্য ঋণ দেয়। গ্রাহক ৩ হাজার টাকার জন্য আবেদন করলে অনুমোদনের পর প্রসেসিং ফি বাবদ ৮১০ টাকা রেখে গ্রাহককে দেওয়া হয় ২ হাজার ১৯০ টাকা। সাত দিন শেষে গ্রাহককে পরিশোধ করতে হয় ৩ হাজার ১৮ টাকা। মেয়াদ শেষে অনাদায়ে প্রতিদিন হিসাবে গ্রাহককে উচ্চহারে সুদ প্রদান করতে হয়। এছাড়াও অ্যাপ্লিকেশন ফি বাবদ ১২০ টাকা, ডাটা অ্যানালাইসিস ফি ১৮০ টাকা, মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট ১৫ টাকা এবং সুদ বাবদ ৫ টাকা কেটে রাখার যুক্তি দেখায়। এ ঋণের টাকা গ্রাহককে বিকাশ অথবা নগদ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়। অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই। প্রতারকদের এ লোভনীয় অফারের ফাঁদে পড়ে অনেকে সর্বস্ব হারায়। যে কোনো অ্যাপস ইন্সটল করার পর অথবা কোনো লিংকে প্রবেশ করার পর ব্যক্তিগত কোনো তথ্যাদি দেওয়ার আগে নিরাপত্তার বিষয়টি ভালোভাবে নিশ্চিত হতে হবে। ব্যক্তিগত তথ্য যত্রতত্র শেয়ার না করার অনুরোধ জানান পুলিশের এ গোয়েন্দা কর্মকর্তা।
গোয়েন্দা সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ শরীফুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার ফজলুর রহমানের সার্বিক তদারকিতে ওয়েববেজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার আশরাফ উল্লাহর নেতৃত্বে অভিযানটি পরিচালিত হয়।