জীবনের প্রয়োজনে আমাদের নিত্য ছুটে চলা। প্রিয়জনের থেকেও প্রয়োজনের প্রাধান্যটাই যেন সবার আগে। তাতে জীবনের ঝুলিতে হয়তো যুক্ত হয় একসমুদ্র অভিজ্ঞতা, সাফল্য। তবে দিন শেষে শুধু প্রয়োজনের তাগিদে ছুটে চলা এসব মানুষের প্রিয়জনের সঙ্গে দূরত্বটাও তৈরি হচ্ছে এক আকাশের। এক জীবনে সব প্রয়োজন পূরণ সম্ভব নয়, তবে সেই এক আকাশ দূরত্ব অতিক্রম করে প্রিয়জনকে আর পাওয়া হয় না। বিনিময়ে বয়সের ভারে কুঁচকে যাওয়া চামড়াগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয় জীবনে ফেলা আসা কিছু হাহাকারময় স্মৃতি। জীবনের কর্মব্যস্ততা একদিন ঠিকই ফুরায়, শুধু ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে প্রিয় মুখগুলোর কদর না করার আফসোসটাই আর ফুরায় না। শেষ বেলার অবসরের প্রার্থনাই তাই চোখের জলেই শেষ হয় হারানো প্রিয়জনের ভালো থাকার আকুতি।
কথায় আছে, বিজ্ঞান আমাদের দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ। কথাটির যথার্থতা বুঝতে আমাদের খুব গভীরে যাওয়ার প্রয়োজন হবে না। পরিসংখ্যান বলছে, গত এক বছরে সারা দেশে আত্মহত্যা করেছে ১৪ হাজার ৪৩৬ জন। বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ আত্মহত্যার কারণ বিষণ্নতা, হতাশা। করোনাকালীন এই সময়টিতে যখন পুরো পৃথিবী ঘরবন্দি অবস্থায় ছিল, অনেক খারাপের ভিড়েও শত ব্যস্ততাকে ছুটি দিয়ে জীবন যেন সুযোগ করে দিয়েছিল প্রিয়জনের সান্নিধ্য পাওয়ার। পারিবারিক সম্প্রীতিতে ভরে থাকা গৃহকোণগুলো যখন আনন্দ-উল্লাসে পরিপূর্ণ থাকার কথা, ঠিক সেই সময় ঘটনা ঘটেছে পুরোপুরি উলটো। প্রয়োজনের তাগিদে আমরা এতটাই ব্যস্ত, পাশের ঘরে আপনজনের হতাশার খোঁজ নেওয়ার ফুসরতটুকুও যেন নেই। যাদের নিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য আজ এত ব্যস্ততা, দিন শেষে তারা কতটা ভালো আছে, সে বিষয়েই যেন আমাদের যত উদাসীনতা। নিত্যসঙ্গী ইলেকট্রনিক ডিভাইস আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আটকে থাকা মানুষগুলো আজকাল খুব একটা প্রিয়জনের চোখে চোখ রাখে না। প্রিয়জনের চোখের সেই ভাসা ভাসা কথা, সেই না বলা আবেদন, সেই চাহনির অর্থ কোনোটাই আর খোঁজা হয় না ফেসবুকের হাজারো নোটিফিকেশনের ভিড়ে। বিপরীতে বাড়তে থাকে অদৃশ্য এক দূরত্ব।
শুধু আত্মহত্যা নয়, পারিবারিক কলহ কিংবা ডিভোর্সের হারও বেড়েছে চোখে পড়ার মতো। জীবন নিয়ে অতিব্যস্ত আমরা যেন ভুলতে বসেছি জীবনেরই অর্থ। দিন শেষে আপনজন পাশে না থাকলে হয়তো বিশাল ঐ ডিগ্রি কিংবা অ্যাকাউন্টের ৮-৯ ডিজিটের অঙ্কটাকেও অর্থহীন মনে হতে পারে। যাদের জন্য ভালো থাকার এই সংগ্রাম, এত ব্যস্ততা, তাদের ভূমিকাটাও জীবনে থাকুক সবার আগে। ব্যস্ততাকে ছুটি দিয়ে জীবনের তাগিদেই খুঁজে নিতে হবে প্রিয়জনের জন্য এক টুকরো অবসর। অনলাইনের ঐ নীল-সাদা দুনিয়ার বাইরে, অফলাইনে প্রিয়জনের উপস্থিতিটাও যে কতটা সস্তিদায়ক, তা জীবনকে উপলব্ধি করতে দেওয়া প্রয়োজন। তবেই জীবনের ঝুলিতে যুক্ত হবে মূল্যবান কিছু স্মৃতি। হোক না হয় একটা মিটিং ক্যানসেল কিংবা একটা ডেডলাইন পার, তবু প্রিয়জনের সঙ্গে চায়ের আড্ডায় জমে থাক প্রতিটি গৃহকোণ।
জীবনের বহমানতায় প্রয়োজন থেকে যাবে আমৃত্যু, কখনো বেশি কখনো কম। সময়ের ব্যবধানে দীর্ঘায়িত হতে থাকবে প্রয়োজনের তালিকা। বিপরীতে শুধু একে একে খালি হতে থাকবে প্রিয়জনের তালিকাটা। তাই প্রয়োজনের আগে না হয় প্রিয়জনকেই কদর করতে শিখি! তাদের থাকার পূর্ণতার থেকে না থাকার শূন্যতা অনেক বেশি পীড়াদায়ক। বাবা-মাসহ সব প্রিয়জনের সঙ্গে এক আকাশের দূরত্বটা ঘুচে যাক এক আকাশ ভালোবাসায়। প্রিয় মুখগুলোর হাসিতেই জীবন খুঁজে পাক প্রশান্তি। শত ব্যস্ততার ভিড়েও প্রিয়জনের জন্যই সাজানো থাকুক ক্ষুদ্র জীবনের সব আয়োজন।
n লেখক : শিক্ষার্থী, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা