চট্টগ্রামে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চলছে বক্ষব্যাধি হাসপাতালের চিকিত্সা। প্রায় ৫৫ বছর আগে নির্মিত হাসপাতাল ভবন তিন বছর আগে ব্যবহার অনুপযোগী ঘোষণা করে গণপূর্ত বিভাগ। কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে না উঠায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে এখনো যক্ষ্মা রোগীর চিকিত্সা সেবা দেওয়া হচ্ছে। চিকিত্সকরা জানান, গত কয়েক বছর ধরে যক্ষ্মা রোগীদের মধ্যে এমডিআর ও এক্সডিআরের প্রাদুর্ভাব বেশি। আক্রান্ত এসব রোগীর জন্য বিশেষ চিকিত্সা পদ্ধতির প্রয়োজন। যক্ষ্মার সাধারণ ওষুধে এসব রোগী সুস্থ হয় না। হাসপাতালে রেখে রোগীদের চিকিত্সা সেবা দিতে হয়।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে ফৌজদারহাট এলাকায় চট্টগ্রাম বিভাগীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালটি অবস্থিত। স্বাধীনতার আগে ১৯৬৫ সালে অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে হাসপাতালটি চালু করা হয়। দ্বিতল বিশিষ্ট ভবনে আন্তঃবিভাগ ও বহির্বিভাগে যক্ষ্মা রোগীদের চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালের ভবন জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় গত ২০১৮ সালে গণপূর্ত বিভাগ ব্যবহার অনুপযোগী ঘোষণা করে। গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতালটির বিভিন্ন অবকাঠামো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়লেও নতুন স্থাপনা নির্মাণে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। ফলে ভূমিকম্প হলে স্থাপনা ধসে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।
সরেজমিন দেখা গেছে, ১০০ শয্যার এই হাসপাতালে আন্তঃবিভাগে প্রচুর রোগী ভর্তি রয়েছে। দ্বিতল বিশিষ্ট ভবনের নিচতলায় পুরুষ ও দ্বিতীয় তলায় নারী রোগীদের চিকিত্সা সেবা দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে ৭০ জন যক্ষ্মা রোগী ভর্তি রয়েছে। হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিত্সক, নার্স ও অন্যান্য জনবল কর্মরত রয়েছে। কিন্তু রোগ নির্ণয়ে পরীক্ষার উপকরণের স্বল্পতা রয়েছে। যক্ষ্মা রোগীদের কফ পরীক্ষা অতি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই হাসপাতালে কফ পরীক্ষার মেশিন নেই। জিন এক্সপার্ট নামের মেশিনটি কফ পরীক্ষার একটি আধুনিক মেশিন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে এই মেশিন বসানোর জন্য একটি আলাদা কক্ষ প্রস্তুত করা হয়েছে। কিন্তু এখনো মেশিনটি বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। বর্তমানে পার্শ্ববর্তী বিআইটিআইডি ল্যাবে কফ পরীক্ষা করা হচ্ছে। এছাড়া হাসপাতালে ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন ও অডিও মেট্রিক মেশিন রয়েছে। কিন্তু এসব মেশিন পরিচালনার জন্য রেডিওগ্রাফারসহ জনবল নেই। তাই রোগীরা মেশিনের সুফল পাচ্ছে না।
চিকিত্সকরা জানান, যেসব রোগী ছয় মাসেও চিকিত্সায় ভালো হয় না, তাদের হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিত্সা নিতে হয়। যক্ষ্মার শত ভাগ নিরাময়যোগ্য রোগ। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, ২০২১ সালে ১০১ জন, ২০ সালে ১০৬ জন, ১৯ সালে ১৫৭ জন, ১৮ সালে ১২৪ জন, ১৭ সালে ১১৪ জন ও ১৬ সালে ১১৪ জন যক্ষ্মা রোগীকে হাসপাতালে চিকিত্সা দেওয়া হয়েছে। এসব রোগী এমডিআর ও এক্সডিআরে আক্রান্ত। তাদের হাসপাতালে রেখে চিকিত্সা দিতে হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে রোগীরা হাসপাতালে এসে চিকিত্সা নিচ্ছে। প্রতিদিন ৫০-৬০ জন রোগী বহির্বিভাগে চিকিত্সা নিচ্ছে বলে চিকিত্সকরা জানান।
গত কয়েক বছর ধরে হাসপাতাল এলাকাটি সরকারি বিভিন্ন সংস্থার স্থাপনা নির্মাণের কারণে গিঞ্জিতে পরিণত হয়েছে। বেড়েছে ব্যাপক জনসমাগম। যক্ষ্মা রোগীদের জন্য নিরাপদ ও খোলামেলা পরিবেশ প্রয়োজন। ছোঁয়াচে রোগ হওয়ায় আক্রান্তরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশতে পারো না। সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রায় ২৮ দশমিক ২৯ একর জায়গার ওপর বক্ষব্যাধি হাসপাতালটি নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে হাসপাতালের অধীনে আছে সাত একর ও খালি জায়গা আছে ৯ একর। বাকি জায়গা বন্দর এক্সেস রোড, নার্সিং কলেজ, ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি, বিআইটিআইডি অধীনে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে আবার এখন পুরো এলাকাটি চট্টগ্রাম মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। ফলে বক্ষব্যাধি হাসপাতালটির অস্তিত্ব টিকে থাকবে কি না তা নিয়ে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
এ ব্যাপারে বক্ষব্যাধি হাসপাতালের চিকিত্সা তত্ত্বাবধায়ক ডা. এস এম নুরুল করিম ইত্তেফাককে বলেন, ‘যক্ষ্মা ছোঁয়াচে রোগ। বর্তমানে যক্ষ্মা রোগীদের মধ্যে এমডিআর ও এক্সডিআরের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। এসব রোগীর যক্ষ্মা সাধারণ ওষুধে ভালো হয় না। হাসপাতালে ভর্তি রেখে বিশেষ পদ্ধতিতে চিকিত্সা দিতে হয়। কারো কফ ও কাশি থাকলে পরীক্ষা করা উচিত।’