শিল্প খাতের কাঁচামাল হইতে শুরু করিয়া নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সকল ভোগ্যপণ্যেরই আন্তর্জাতিক বাজার ঊর্ধ্বমুখী। ইহার ফলে সার্বিকভাবে দেশের আমদানি খরচ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধির পাশাপাশি ভোক্তাব্যয়ও বৃদ্ধি পাইবার আশঙ্কা দেখা দিয়াছে। করোনার আগে যেইখানে বিশ্ববাজারে তুলার মূল্য ছিল পাউন্ডপ্রতি প্রায় ৬৫ সেন্ট, সেইখানে তাহা বৃদ্ধি পাইয়া হইয়াছে ১ ডলার ১০ সেন্টেরও অধিক। অন্যদিকে সয়াবিন তেলের মূল্য টনপ্রতি ৭৭৩ হইতে বাড়িয়া ১৪০০ ডলারে দাঁড়াইয়াছে। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীলতার কারণে চলতি অর্থবত্সরের শুরুতেই দেশের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাইয়াছে প্রায় ৪৬ শতাংশ। শুধু তাহাই নহে, বৈশ্বিক জ্বালানি পণ্যের বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজার অস্থিতিশীল হইবার কারণে দেশের বিদ্যুত্ উত্পাদন, শিল্পোত্পাদন, পরিবহন, গৃহস্থালি ইত্যাদি প্রতিটি খাতেই চাপ সৃষ্টি হইবার আশঙ্কা করিতেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাহারা আরো আশঙ্কা করিতেছেন, বাজারের এই অস্থিরতা অব্যাহত থাকিলে তাহা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উপরও চাপ সৃষ্টি করিবে।
ইহা নিঃসন্দেহে বলা যায়, বিশ্ববাজারে জ্বালানিসহ ভোগ্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় তাহা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলির উদ্বেগের কারণ হইবে। অনেকে মনে করিতেছেন, বিশ্বের যেই গুটি কয়েক উন্নত দেশ বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাজারের কলকাঠি নাড়িয়া থাকে তাহারা হয়তো ভবিষ্যতে ভোগ্যপণ্যের নাজুক পরিস্থিতি আশঙ্কা করিয়া পণ্যের মজুত বাড়াইতেছে। ইহার ফলে বাড়িয়া যাইতেছে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্য। করোনা-পরবর্তী নূতন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই পরিস্থিতি উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য অশনিসংকেত। উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশই রহিয়াছে, যাহারা কলকারখানার জন্য শিল্পের কাঁচামাল, মেশিনারিজ হইতে শুরু করিয়া প্রায় প্রতিটি জিনিসই বিদেশ হইতে আমদানি করিয়া থাকে। যেহেতু তাহারা কাঁচামাল, কলকারাখানার মেশিন ইত্যাদি কোনো কিছুই উত্পাদন করেন না, সেহেতু তাহাদের বিদেশ হইতে অধিক মূল্যে জিনিসপত্র আমদানি করিলে অধিক মূল্যেই পণ্য বিক্রি করিতে হয়। ইহার পরিপ্রেক্ষিতে মনে প্রশ্ন আসাটাই স্বাভাবিক—যেহেতু দেশের অভ্যন্তরে কাঁচামাল, মেশিনপত্র কোনো কিছুই উত্পাদিত হয় না, সেহেতু দেশের কলকারখানাসমূহে উত্পাদনব্যবস্থায় ঝুঁকি তৈরি হইবার আশঙ্কা থাকে কি না। দেখা যাইতেছে, আমদানিনির্ভর হইলেও এবং কাঁচামাল, মেশিনপত্র উত্পাদন না করিলেও সস্তা শ্রমের কারণে উন্নয়নশীল বিশ্বের এই দেশগুলিতে কলকারখানা স্থাপিত হইতেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কিংবা লোকাল মার্কেটে পণ্যদ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পাইলে তাহার সরাসরি ভুক্তভোগী হইয়া থাকে সাধারণ জনগণ। যাহারা অধিক মূল্যে কাঁচামাল আমদানি করিয়া উত্পাদন করিয়া থাকেন, তাহারা অধিক মূল্যেই পণ্য বিক্রি কবিবেন, ইহাই স্বাভাবিক। অনেকে তাহাদের শোষক বলিয়া আখ্যায়িত করিয়া থাকেন অথচ যাহারা সেই সকল দেশের নীতিনির্ধারক, এই ক্ষেত্রে তাহাদেরই বড় ভূমিকা থাকে।
সুতরাং সমস্যা সমাধানে উন্নয়নশীল বিশ্বের নীতিনির্ধারক হইতে শুরু করিয়া উত্পাদনব্যবস্থার সঙ্গে যাহারা জড়িত, সকলকেই বসিয়া ভাবিতে হইবে। প্রসঙ্গক্রমে একটি গল্পের অবতারণা করা যাইতে পারে। জমিদার তাহার পুত্রকে বলিতেছেন, আমি তোমার জন্য যাহা রাখিয়া গেলাম তাহাতে প্রতি বেলা মাছের মুড়ো দিয়া আহার করিলেও ফুরাইবে না। অন্যদিকে দর্জি তাহার পুত্রকে বলিতেছেন, আমি তোমার জন্য কিছুই রাখিয়া যাইতে পারিলাম না, তুমি বুদ্ধি বেচিয়া খাইও। বিশ্বের ধনী দেশগুলির জমিদারের ন্যায় অগাধ মজুত থাকিলেও উন্নয়নশীল দেশগুলির বুদ্ধি বেচিয়াই চলিতে হইবে। ইহাই বাস্তবতা। সুতরাং সংকট মোকাবিলাই উন্নয়নশীল দেশগুলির ঠান্ডা মাথায় ধ্যান করিতে হইবে, বর্তমান সংকট হইতে উত্তরণের জন্য ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা ঠিক করিতে হইবে।