দুর্যোগ মোকাবিলায় দেশ আজ বিশ্বের কাছে আদর্শ :প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বাংলাদেশ সারা বিশ্বে আজকে দুর্যোগ ঝুঁকি মোকাবিলায় একটি আদর্শ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। আমাদের এই সম্মান যাতে বজায় থাকে সেজন্য ভবিষ্যতে সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে এবং এ ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে হবে। এই দেশটা আমাদের, কাজেই যত ঝুঁকি আসুক দেশের উন্নয়ন আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে। দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে হবে। দারিদ্র্য থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে হবে।’

গতকাল বুধবার ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) ৫০ বছর পদার্পণ ও আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস ২০২১ উদ্যাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এ কথাগুলো বলেন। তিনি গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত মূল অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ করেন।

১৯৯১ সালে ঘূর্ণিঝড়ে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার উক্তি ‘যত মানুষ মরার কথা ছিল তত মানুষ মারা যায় নাই’ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এই কথা জীবনে যেন আর শুনতে না হয় সেজন্য সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে চারটি ইউনিটেরও উদ্বোধন করেন। এগুলো হচ্ছে—দ্রুত সাড়াদান ইউনিট, পানি থেকে উদ্ধার ইউনিট, অতি জোয়ার মনিটরিং ও সাড়াদান ইউনিট এবং খেলায় খেলায় দুর্যোগ প্রস্তুতি ইউনিট (স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে জনসচেতনতামূলক)। এছাড়া, ‘দুর্যোগ সহনশীল বাংলাদেশ বিনির্মাণে শেখ হাসিনা’ শীর্ষক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক একটি গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করেন তিনি এবং দুর্যোগ প্রশমন বিষয়ক আওয়ামী লীগ সরকারের প্রচেষ্টা সম্পর্কিত ভিডিওচিত্র ‘দুর্যোগ প্রশমনের ৫০ বছর বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা’ শীর্ষক ভিডিওচিত্রও অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয়।

সিপিপির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠানে তিন জন সংগঠক এবং ছয় জন স্বেচ্ছাসেবক নারী-পুরুষকে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে ডা. এনামুর রহমান আজীবন সম্মাননা প্রদান করেন।

জাতির পিতা ১৯৭৩ সালের ১ জুলাই দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে ‘ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি)’ গ্রহণ করেন, যা আজ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু ঘূর্ণিঝড় থেকে জনগণের জানমাল রক্ষায় সেই সময় ১৭২টি উঁচু মাটির কিল্লা তৈরি করেন যা পরবর্তীকালে জনগণ ‘মুজিব কিল্লা’ নামকরণ করেন। তিনি বলেন, আমরা পূর্বের মুজিব কিল্লাসমূহ সংস্কারসহ নতুন করে আরো ৩৭৮টি মুজিব কিল্লা নির্মাণ করছি।

করোনাকালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আওয়ামী লীগ এবং তার সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মৃতদের দাফন-কাফন থেকে শুরু করে তাদের ঘরে খাবার পৌঁছে দেওয়ার কাজটা আমরা সরকারের পক্ষ থেকে যেমন করেছি তেমনি দলের পক্ষ থেকেও করেছি। তবে আর কাউকেই এভাবে এগিয়ে আসতে আমি দেখিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাউন্সিল গঠন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন প্রণয়ন করেছে এবং এই আইনের আওতায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর গঠন করেছে যা দুর্যোগ মোকাবিলা, ঝুঁকি হ্রাসকরণ ও ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। পাশাপাশি সরকার ২০২১-২০২৫ সাল মেয়াদের জন্য জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভ্যন্তরীণ বাস্তুহারা মানুষের দুর্দশার বিষয়গুলো আমলে নিয়ে সরকার ২০১৫ সালে একটি কৌশলপত্র প্রণয়ন করে এবং জাতীয় রিজিলিয়েন্স পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যা সেন্দাই ফ্রেমওয়ার্ক ও এসডিজির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।

ফায়ার সার্ভিস এবং সিভিল ডিফেন্সকে আরো শক্তিশালীকরণে তার সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন যেসব বহুতল ভবন হচ্ছে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা যেন সেসব ভবনে মজুত থাকে। বহুতল ভবন নির্মাণের সময় যেমন তা নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি আবার কোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে সেখান থেকে মানুষকে উদ্ধারের সরঞ্জামাদি ও ফায়ার সার্ভিসের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি সরকার সংগ্রহ করছে। তিনি বলেন, বিল্ডিং কোড মেনেই ভবন তৈরি করতে হবে।

‘পাটশিল্পে রাশিয়ার বিনিয়োগকে বাংলাদেশ স্বাগত জানাবে’

রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশ পাটশিল্পে রুশ বিনিয়োগকে স্বাগত জানাবে।  বুধবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার সরকারি বাসভবন গণভবনে বাংলাদেশে নবনিযুক্ত রাশিয়ান রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার ভিকেন্তিয়েভিচ ম্যান্টিটস্কি সাক্ষাত্ করতে এলে এ কথা বলেন তিনি।

 বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এম ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে এ কথা জানিয়ে বলেন, উভয়ে বিভিন্ন খাতে সহযোগিতার ক্ষেত্র বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্বারোপের পাশাপাশি কৃষি খাতের সুযোগসমূহ অন্বেষণে সম্মত হন। প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন খাতে বিশেষ করে রূপপুর পরমাণু বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণে রাশিয়ার সহযোগিতার ভূয়সী প্রশংসা করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থনের কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘যুদ্ধকালে যে দেশ আমাদের দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেছে তারা আমাদের হূদয়ের বিশেষ জায়গায় রয়েছে।’ তিনি বলেন, রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বাংলাদেশ সফরে এলে আমরা খুশি হব।

রাশিয়ান রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার ভিকেন্তিয়েভিচ ম্যান্টিটস্কি বলেন, তিনি ২০ বছর আগে ঢাকা এসেছিলেন। কিন্তু দেশের বর্তমান অগ্রগতি ও উন্নয়ন ‘ব্যাপক ও উল্লেখযোগ্য’। রাষ্ট্রদূত আরো বলেন, দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাপকভাবে বেড়েছে। রুশ দূত রূপপুর পরমাণু বিদ্যুেকন্দ্রের পর বাংলাদেশে দ্বিতীয় পরমাণু বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণে তার দেশের আগ্রহ ব্যক্ত করেন। দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন চুক্তির কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত এগুলোর হালনাগাদ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। এছাড়া তিনি প্রতিরক্ষা খাতে দুই দেশের সহযোগিতা জোরদারের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন অ্যাম্বাসেডর অ্যাট-লার্জ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস।