এক জন মুক্তিযোদ্ধা স্লোগান দিচ্ছেন। তাকে ঘিরে গোল হয়ে আরো অনেক মুক্তিযোদ্ধা। কাঁধে রাইফেল। ছবিটি মনে করিয়ে দিচ্ছে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের বজ্রশপথের কথা। অন্য ছবিতে দুই জন মুক্তিযোদ্ধা মোনাজাতরত। আর এক পাশে পড়ে আছে রাইফেলটি। আরেকটি ছবিতে এক জন দর্জি বাংলাদেশের পতাকা সেলাই করছেন। বাংলাদশের পতাকা। তাকে ঘিরে হাসিমুখে বাংলার সাধারণ জনতা। বিশ্বখ্যাত ম্যাগনাম আলোকচিত্রশিল্পী মাখ রিবুর ‘বাংলাদেশ ১৯৭১ : শোক ও সকাল’ শীর্ষক একক আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে শোভা পেয়েছে ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরল কিছু আলোকচিত্র।
ফরাসি আলোকচিত্রী মাখ রিবুর তোলা মুক্তিযুদ্ধের অপ্রকাশিত ছবির প্রদর্শনী শুরু হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। প্রদর্শনীটি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এবং আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দো ঢাকার উদ্যোগে আর ’লা’সেসিও লেসামি দ্য মাখ রিবু’ এবং গিমে মিউজিয়ামের সহযোগিতায় আয়োজিত হয়েছে। প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে ইতিপূর্বে অপ্রকাশিত একগুচ্ছ আলোকচিত্র। প্রদর্শনীতে ৫০টি আলোকচিত্র প্রদর্শিত হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০তম বর্ষপূর্তি উদ্যাপন উপলক্ষ্যে উক্ত প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। প্রদর্শনীটি যৌথভাবে কিউরেটিং করেছেন মফিদুল হক এবং লরেন ড্রুরে।
মাখ রিবু স্বল্প কয়েক জন আলোকচিত্রীর মধ্যে অন্যতম, যারা যুগপত্ উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনামে ছবি তোলার অনুমতি পেয়েছিলেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রতিবাদে পেন্টাগনের সামনে আন্দোলন চলাকালীন তার তোলা ‘ফুল হাতে একজন তরুণী’র ছবি শান্তির আন্তর্জাতিক প্রতীকে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম মাখ রিবুর দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং তিনি ১৯৭১ সালের নভেম্বরের শেষদিকে কলকাতায় আসেন। তিনি শরণার্থী শিবির এবং মুক্তাঞ্চলে ঘুরে দেখেন। ৩ ডিসেম্বরে যখন ভারত-পাকিস্তান সর্বতোভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সমর্থিত অগ্রসরমান ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। তার অভিযাত্রা শুরু হয় জামালপুর-শেরপুর হতে, আর তারপর প্রমত্ত ব্রহ্মপুত্র নদ পার হয়ে, তিনি প্রত্যক্ষ করেন জামালপুরের বিজয়সূচক যুদ্ধ, যা তিনি বিস্তৃতভাবে ক্যামেরাবন্দি করেন। তিনি ছিলেন প্রথম সাংবাদিকদের অন্যতম, যারা ঢাকায় প্রবেশ করে এই নগরীর মুক্তিকে ক্যামেরায় ধারণ করেছেন। এসব ছবির অধিকাংশই আজ পর্যন্ত অপ্রকাশিত ছিল।
শনিবার বিকালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, সম্মানিত অতিথি ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যঁ মারা সু, আলিয়ঁস ফ্রসেজের পরিচালক ফসোয়া গুজে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ডা. সারোয়ার আলী, মফিদুল হক ও সারা যাকের।
প্রদর্শনীটি চলবে ১৬ নভেম্বর ২০২১ পর্যন্ত। সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত প্রদর্শনী খোলা থাকবে। রবিবার সাপ্তাহিক বন্ধ। প্রদর্শনীটি দ্বিতীয় বারের মতো আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দো ঢাকার লা গ্যালারিতে আগামী বছরের জানুয়ারি মাসে প্রদর্শিত হবে।
এক নজরে মাখ রিবু: ফরাসি আলোকচিত্রী মাখ রিবু প্রথম প্রজন্মের ম্যাগনাম আলোকচিত্রীদের অন্যতম, ফরাসি বিদগ্ধ আলোকচিত্রশিল্পী মার্ক রিব্যো ১৯৫৩ সালে তার তোলা আইফেল টাওয়ারের ওপর কাজে ব্যস্ত একজন রঙমিস্ত্রির ছবি লাইফ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। ২০১১ সালে মার্ক রিবু ১৯৫৩ হতে ১৯৭৭ সালের ভেতর তার ধারণ করা ১৯২টি আলোকচিত্রের মূলপ্রিন্ট প্যারিসের ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ মডার্ন আর্ট (সেন্টার জর্জ পম্পেদু)-কে দান করেন। তার আলোকচিত্র অনেক মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা অর্জন করেছে এবং অন্যান্য অনেক জায়গার মতোই প্যারিস, নিউ ইয়র্ক, সাংহাই এবং টোকিওর জাদুঘর ও গ্যালারিগুলোতে প্রদর্শিত হয়েছে। মার্ক রিবু ২০১৬ সালে প্যারিসে ৯৩ বছর বয়সে মারা যান।