ক্ষমতাবান ও সারমেয়-কথা

কথিত আছে, যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে ধর্মরাজ কুকুররূপে স্বর্গের দুর্গম রাস্তায় সঙ্গ দিয়েছিলেন। কলিযুগে মানুষের সব থেকে কাছের চতুষ্পদটিও কুকুর। গৃহপালিত ছাড়াও স্ট্রিট ডগ কম উপকারী নয়। তবে বর্তমানে আমরা কুকুরের প্রতি নির্দয় হয়ে উঠছি। বিবিসির এক প্রতিবেদন জানাচ্ছে, করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ভিয়েতনামের ফাম মিনহ হুং ও নাগুয়েন থি চি এম দম্পতি। তাদের সঙ্গী ছিল ১২টি পোষা কুকুর। তাদের কাছ থেকে কুকুরের শরীরে করোনা ছড়াবে, পরে তা আশপাশের পশুপাখির মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে, এমন আশঙ্কা থেকে কুকুরগুলোকে মেরে ফেলেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় শোকে মুষড়ে পড়েছেন ঐ দম্পতি। নিন্দার ঝড় উঠেছে ভিয়েতনাম জুড়ে। কুকুরের অধিকার নিয়ে সরব হয়েছেন অনেক প্রাণী-অধিকারকর্মী। তাদের কথা :কোনো যুক্তিতেই কুকুরগুলোকে মেরে ফেলা ঠিক হয়নি।

উল্লিখিত খবরটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যে কোনো পশুপাখিকেই মেরে ফেলা অনুচিত। কুকুর হত্যার ঘটনাটি মানুষের শক্তি ও ক্ষমতা প্রয়োগের একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত। এই ঘটনার মূলে বলবানের কদর্য ক্ষমতা ও শক্তি প্রদর্শন। তোমার শক্তি আছে, অতএব আরেকজনকে পিটিয়ে থেঁতলে মারো। যেমন দুর্বল ইহুদিদের মারা হতো নািস জার্মানিতে, ভারতবর্ষে বন্দি বিপ্লবীদের মারত ব্রিটিশ। এখানে-ওখানে এখনো যেমন মারা হচ্ছে সংখ্যালঘু মানুষদের।

উন্নত বিশ্বে কুকুরসহ সব ধরনের প্রাণীর পক্ষে রয়েছে জোরদার আইন। ইচ্ছে করলেই কোনো প্রাণী হত্যা কিংবা তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনকে বাধাগ্রস্ত করা যায় না। আমরা অবশ্য পশুপাখির প্রতি খুব একটা সংবেদনশীল নই। কুকুরের প্রতিও নই। আমাদের দেশে অনেক মানুষ এখনো কুকুর দেখলেই ধাওয়া করে। কুকুরকে আঘাত করা, ঢিল ছোড়া, লেজে পলিথিন বেঁধে দেওয়া, এমনকি লেজে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনা হামেশাই ঘটে। পশুপাখি বা জন্তু-জানোয়ারকে আঘাত করে বা ভয় দেখিয়ে অনেকে মজা পান। ফলে আমাদের দেশের শিশুরাও অসংবেদনশীলতার পাঠ গ্রহণ করে। আঘাত করা বা ভয় দেখানোর বিদ্যাটা তারা সমাজ থেকে শেখে। এই বিদ্যা তখন কেবল আর পশুপাখির ওপরই প্রয়োগ হয় না। মানুষের প্রতিও হয়। ভিন্ন ধর্ম ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষগুলোকে কীভাবে আঘাত করা যায়, ভয় দেখানো যায়, সেই চেষ্টা চলে। একশ্রেণির মানুষের মধ্যে এই প্রবণতা প্রকটভাবে দেখা যায়। এমনকি আমাদের দেশের রাজা-উজির ও ক্ষমতাবানদের মধ্যেও এই প্রবণতা রয়েছে।

কুকুর বা সারমেয় প্রজাতির সঙ্গে আমাদের সমাজ-রাজনীতির অনেক মিল আছে। আমরা জানি, সারমেয় যতই ঘেউ ঘেউ করুক, তাকে ডেকে খাবার দিলেই সে চুপ করে যাবে। ঠিক যে সময়ে তাকে প্রতিদিন খাবার দেওয়া হবে, সে সময় এসে লেজ নেড়ে প্রভুভক্তি দেখাবে। এবার ঐ সময়েই অন্য কোনো ব্যক্তি যদি আরো ভালো খাবারের ব্যবস্থা করে, তখন সে নতুন জনের কাছেই যাবে। বাঁচার জন্য এটাই তাদের চরিত্র। আর যে সারমেয়র কোনো প্রভু নেই, তারা নিজের বাঁচার তাগিদেই রাস্তা থেকে খাবার জোগাড় করে। এর জন্য তাদের মুখোমুখি হতে হয় নিজেদের মধ্যেই সংগ্রামে, আবার কখনো বা আপসে।

এদিকে দেশের ক্ষমতাবানরা অন্য সবাইকে সারমেয় ভাবা শুরু করেছে। একটু রুটি-বিস্কুট ছুড়ে দিয়ে তারা কেবল আনুগত্য চায়, লেজ-নাড়ার বিদ্যার প্রয়োগ চায়। পক্ষে ঘেউ ঘেউ চায়। বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, তারা তা পেয়েও যায়! এক কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে আমরা যাচ্ছি। হয় ক্ষমতাকে, দম্ভকে মেনে নাও, না হলে সারমেয়র অস্তিত্ব নিয়ে বেঁচে থাকো। আমরা বর্তমানে সেভাবেই যেন বেঁচে আছি। আর নিজেদের সারমেয় মনে করা, সারমেয় হয়ে বেঁচে থাকাকেও এখন অনেকেই অনিবার্য নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়েছেন। আসলে ‘আফিম খাওয়া’ মানুষগুলো নিজেদের আর মানুষ বলে মনে করেন না। তারা নিজেদের ক্রীতদাস ভেবে নিয়েছেন। কাজেই রাজা-উজির ও ক্ষমতাবানদের যে কোনো কাজের তাঁবেদারি করতেই তারা ব্যস্ত। এতে বেঁচে থাকার রসদ মেলে। এর জন্য আমাদের সামন্ত দাস মনোভাব দায়ী। আমাদের হর্তাকর্তাবিধাতারূপী কিছু মানুষ আমাদের সারমেয়র মতো ব্যবহার করবেন, আর আমরা বশংবদ হয়ে থাকব, সেটা নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা তলানিতে নিয়ে গিয়ে আমরাই প্রমাণ করে দিচ্ছি। আমরা লেজ-নাড়া বিদ্যায় সীমাহীন দক্ষতা অর্জন করেছি।

উল্লেখ্য, কুকুরের লেজ নাড়া প্রভুভক্তির লক্ষণ। সারমেয় সমাজে লেজের আরো তাত্পর্য আছে। একদল কুকুর যখন কোনো আগন্তুকের মুখোমুখি হয়, তখন লেজের অবস্থান থেকে তারা বুঝে নেয় কে তাদের মধ্যে দলপতি। যেমন—হুমকির মুখে লেজ যদি খাড়া ওপরে তোলা থাকে, এর মানে সে ঐ দলের নেতা। আর যার লেজ নিচের দিকে থাকে, ধরে নিতে হবে সে অন্যদের বশ্যতা মেনে নেওয়ার সংকেত দিচ্ছে। আমরা যে বলি ‘লেজ গুটিয়ে পালিয়েছে’, সেটা হয়তো এখান থেকেই এসেছে। সাধারণভাবে লেজ নাড়ার মধ্য দিয়ে কুকুরের আবেগের প্রকাশ ঘটে। অনেক সময় একে উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও দেখা চলে।

যাহোক, কথায় কথায় অনেক কথা বলা হলো। ‘ঘেউ ঘেউ’ শব্দবন্ধ নিয়ে কয়েকটি কথা বলা যেতে পারে। সারমেয় সমাজে ‘ঘেউ ঘেউ’ হচ্ছে প্রতিবাদের ভাষা। এর মানে হচ্ছে, ‘মানি না মানব না!’ অপরিচিত কাউকে দেখলে সাধারণত সারমেয়রা ‘ঘেউ ঘেউ’ করে। এ ব্যাপারে একটি গল্প প্রচলিত আছে। একবার এক বাড়িতে নতুন মানুষ বেড়াতে এসেছেন। সেই বাড়ির পোষা কুকুর ‘বাঘা’ আগন্তুককে দেখে ঘেউ ঘেউ করে ওঠে। এদিকে ঐ ঘেউ ঘেউ শুনে আগত ব্যক্তি ভীষণ ঘাবড়ে গিয়ে বাঁচাও বাঁচাও বলে দৌড় শুরু করে। এ সময় গৃহকর্তা দ্রুত এগিয়ে এসে বাঘাকে ধমক দিয়ে শান্ত করে আগন্তুককে বললেন, ‘ভয় পাবেন না। জানেন তো, যে কুকুর বেশি ঘেউ ঘেউ করে সে কামড়ায় না।’ এ কথা শুনে সন্ত্রস্ত ভদ্রলোক হাঁপাতে হাঁপাতে বলেছিলেন, ‘সে তো আপনিও জানেন, আমিও জানি। সবাই জানে। কিন্তু সমস্যাটি হচ্ছে, আপনাদের এ কুকুরটা কি তা জানে?’ পরিশেষে আরেকটি গল্প। এক রাজার ১০টি পোষা হিংস্র কুকুর ছিল। কোনো মন্ত্রী যদি ঠিকঠাকমতো কাজ করতে না পারত, তাহলে রাজা সেই মন্ত্রীকে ঐ ১০টি কুকুরের মধ্যে ছেড়ে দিতেন। কুকুরদের আঁচড়ে-কামড়ে মন্ত্রীর প্রাণ যেত। একদিন এক প্রবীণ মন্ত্রীর উপদেশ রাজার মনঃপূত না হওয়ায়, তিনি ঐ মন্ত্রীকে কুকুরদের মধ্যে ছেড়ে দেওয়ার আদেশ দিলেন। মন্ত্রী অনেক কাকুতিমিনতি করলেন, কিন্তু রাজার মন নরম হলো না। মন্ত্রী বললেন, ‘মহারাজ, আমি গত ১০ বছর ধরে আপনার সেবা করছি, আজ আমার একটা সিদ্ধান্ত আপনার পছন্দ হলো না বলে, আমায় এই কঠোর শাস্তি দিলেন? দয়া করে আমায় এই শাস্তি দেবেন না।’

কিন্তু রাজা তার সিদ্ধান্তে অটল রইলেন। নিরুপায় হয়ে মন্ত্রী বললেন, ‘মহারাজ আপনি আমায় মাত্র ১০ দিন সময় দিন। তারপর আপনি আমায় যে শাস্তি দেবেন, আমি মাথা পেতে নেব।’

রাজা এতে সম্মতি দিলেন।

মন্ত্রী তখন কুকুর পালকের কাছে গিয়ে তাকে ১০ দিনের ছুটি দিলেন এবং এই ১০ দিন নিজের হাতে কুকুরদের যত্ন করলেন। তাদের গোসল করালেন, খাওয়ালেন, তাদের সঙ্গেই খেলাধুলা করলেন। ১০ দিন পর মন্ত্রী রাজসভায় প্রবেশ করা মাত্র, রাজার আদেশে তাকে কুকুরদের মধ্যে নিক্ষেপ করা হলো। কিন্তু রাজা আশ্চর্য হয়ে দেখলেন, কুকুরগুলো মন্ত্রীকে আক্রমণ করার বদলে তার পা চেটে দিচ্ছে, লেজ নেড়ে আদর খাচ্ছে, পায়ের কাছে গড়াগড়ি খাচ্ছে।

রাজা মন্ত্রীকে ডেকে, অবাক চোখে এর কারণ জানতে চাইলেন। মন্ত্রী বললেন, ‘মহারাজ আমি মাত্র ১০ দিন এই কুকুরদের সেবা করেছি। তারা আমাকে মনে রেখেছে। আর আমি আপনাকে ১০ বছর ধরে সেবা করেছি, কিন্তু আমার একটা ভুলে আপনি সেই সেবা ভুলে গেলেন!’

এ কথা শুনে, রাজা তার ভুল বুঝতে পারলেন এবং কুকুরের জায়গায় ১০টি কুমির রেখে দিলেন। আর বললেন, ‘আপনাকে এবার ৩০ দিন সময় দিলাম, তারপর কুমিরের খাঁচায় ছেড়ে দেব। কিছু কাজ থাকলে মিটিয়ে নিন।’ মরাল অব দি স্টোরি :শাসক, প্রশাসক, ক্ষমতাবান ব্যক্তি, মালিকপক্ষ বা ঊর্ধ্বতন কেউ যদি মনে করেন যে আপনাকে বাঁশ দেবে, তাহলে তা দেবেই!

n লেখক :রম্যরচয়িতা