টার্নিং ইয়ার্ড :যানজট নিরসনে নয়া প্রযুক্তি

যানজট নিরসনে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুততম ও কার্যকর পদ্ধতি টার্নিং ইয়ার্ডের সফল পরীক্ষা চালিয়েছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে পরিচালিত হয়েছে পরীক্ষাটি। বিশ্বের যে কোনো স্থানে এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করে অতি অল্প সময়ে থামিয়ে দেওয়া যায় যানজটের চোখ রাঙানিকে। দুর্লভ ও বিরল এ প্রযুক্তি করায়ত্তের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে তার সক্ষমতার প্রমাণ দিল।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে উত্তরায় যানজটের সবচেয়ে ভয়াবহতম স্থান জসীমউদ্দীন মোড়কে টার্গেট করে পরীক্ষা পরিচালনা করা হয়। প্রথম পরীক্ষাতেই জসীমউদ্দীন মোড়টি যানজটশূন্য হয়ে পড়ে। এরপর টার্নিং ইয়ার্ডের অন্য একটি প্রকরণ তৈরি করা হয় বিমানবন্দর সড়কের দক্ষিণ পাশে কাওলা পয়েন্টে। এখানেও আসে নিরঙ্কুশ সফলতা। এরপর প্রায় তিন বছর ধরে পর্যবেক্ষণে রাখা হয় টার্নিং ইয়ার্ডগুলোকে। এই দীর্ঘ সময়েও দেখা যায় যে, এগুলোর কার্যকারিতা অক্ষুণ্ন রয়েছে। এতে এই পদ্ধতির কার্যকারিতা ও স্থায়িত্ব সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ভবিষ্যতে নির্মিতব্য টার্নিং ইয়ার্ডগুলোকে আরো দৃষ্টিনন্দন ও গতিশীল করা যাবে। এ পদ্ধতিতে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে ঢাকা শহরের বেশির ভাগ অঞ্চলকে যানজটমুক্ত করা সম্ভব। 

টার্নিং ইয়ার্ড কী? টার্নিং ইয়ার্ড হলো অতি দ্রুততম সময়ে যানজট নিরসনের এক অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। রাস্তার ওপরে নির্মিত এই টার্নিং ইয়ার্ডের মধ্য দিয়ে যখন কোনো গাড়ি ঘোরে তখন অন্য কোনো গাড়ির চলাচল বিঘ্নিত হয় না। টার্নিং ইয়ার্ডের বেশ কয়েকটি প্রকরণ রয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো এল ইয়ার্ড, মডারেট টার্নিং ইয়ার্ড, টারশিয়ারি টার্নিং ইয়ার্ড, ফোরথ জেনারেশন টার্নিং ইয়ার্ড, ফিফথ জেনারেশন টার্নিং ইয়ার্ড ইত্যাদি। প্রত্যেকটি প্রকরণ আবার কতগুলো উপবিভাগে বিভক্ত। বিভিন্ন বিষয়াদি বিবেচনায় নিয়ে যেখানে যে প্রকরণ উপযুক্ত সেখানে সেটা তৈরি করা হয়।

যানজটের সমস্যা নতুন কোনো বিষয় নয়। বিজ্ঞানীগণ বিষয়টি টের পেয়েছিলেন আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগেই। ১৮২৫ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ডে যখন বাষ্পচালিত রেলগাড়ির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় তখন থেকেই একটা বিষয় বিজ্ঞানীদের নজরে আসে। তারা লক্ষ করলেন যে, যন্ত্রচালিত একটি বাহনকে চলার সুযোগ দিতে গিয়ে অন্য একটি বাহনকে থামিয়ে রাখতে হয়। মূলত তখন থেকেই যানজটের উত্পত্তি। সেই সময়ের প্রখর মেধাবী ও দূরদর্শী বিজ্ঞানীগণ শঙ্কিত ছিলেন এটা ভেবে যে, তারা এই সমস্যার সঠিক সমাধানে পৌঁছাতে পারবেন কি না। আর যদি এর সঠিক সমাধান করা না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে এটা মানব সভ্যতাকে খুব ভোগাবে। তখন থেকেই তারা সচেষ্ট ছিলেন যে, কীভাবে এ সমস্যার সমাধান করা যায়। তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এই দীর্ঘ সময়ে এসেছে অনেক পদ্ধতিও। কিন্তু কোন পদ্ধতি কতটা কার্যকর কিংবা আদৌ কার্যকর কি না, সে প্রশ্ন রয়ে গেছে আজও।

সড়কপথের যানজট নিরসনের জন্য সারা বিশ্বে বেশ কয়েকটি গতানুগতিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো একমুখী রাস্তা, রিং রোড বা চক্রাকার পথ, গোলচত্বর, উড়ালপথ, পাতালপথ বা সুড়ঙ্গপথ ইত্যাদি। একমুখী রাস্তা, রিং রোড বা চক্রাকার পথ, গোল চত্বর—এসব তৈরি করা হয় ভূপৃষ্ঠে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব থেকে কিছুটা উপকার পাওয়া গেলেও যানজট থেকে পুরোপুরি মুক্তি লাভ করা যায় নাই। আর এগুলো সব জায়গায় সব সময় তৈরির বাস্তব অবস্থাও থাকে না। ফলে যানজটের সমস্যাও দূর হয় না।

মাটিতে থেকে যখন সমস্যার কোনো সমাধান করা যায় না তখন চিন্তা করা হয় মাটির নিচ দিয়ে এবং মাটি থেকে উপরের দিকে বিকল্প রাস্তা তৈরি করা যায় কি না। এমন চিন্তা থেকেই চলে এসেছে উড়ালপথ, পাতালপথ কিংবা সুড়ঙ্গপথ। যদিও রেললাইনের ক্ষেত্রে  উড়ালপথ ও পাতালপথ অনেক আগে থেকেই ছিল। উড়াল কিংবা পাতালপথ এ দেশের মানুষের কাছে নতুন মনে হলেও উন্নত দেশ এগুলো তৈরি করেছে প্রায় ২০০ বছর আগেই। অধিকাংশ ঐতিহাসিকদের মতে, ইংল্যান্ডের লিভারপুলের নিকটবর্তী রেইনহিলে অবস্থিত বার্নস টানেলটি হলো পৃথিবীর প্রথম সুড়ঙ্গপথ বা পাতালপথ। এটা নির্মিত হয়েছিল ১৮২৮/২৯ খ্রিষ্টাব্দে রেলপথের নিচ দিয়ে। এই সুড়ঙ্গপথটি নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল এটাকে ট্রামলাইন হিসাবে ব্যবহার করা। যদিও পরবর্তী সময়ে ১৮৪৪ খ্রিষ্টাব্দে এই ট্রামলাইনটি পরিত্যক্ত ঘোষিত হয় এবং ভেঙে ফেলা হয়। আর ১৮৪৩ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত হয়েছিল প্রথম রেলওয়ে ফ্লাইওভার বা উড়ালপথ। এটা ছিল ইংল্যান্ডের নরউড জংশন রেল স্টেশনের কাছে।

পৃথিবীর ক্ষমতাবান ও সামর্থ্যবান রাষ্ট্রগুলো রেলপথের দেখাদেখি সড়কপথেও নির্মাণ করল বহুতলবিশিষ্ট উড়ালপথ, পাতালপথ বা সুড়ঙ্গপথ। তাদের দেখাদেখি অন্যান্য দেশেও উড়ালপথ, পাতালপথ তৈরির হিড়িক পড়ে যায়। এত বিশাল স্থাপনা তৈরির মতো যেসব দেশের সামর্থ্য নাই তারা অন্যদের কাছ থেকে ধারদেনা এবং সুদে ঋণ নিয়েও তৈরি করল এসব স্থাপনা। তারপর এখান দিয়ে চালাল মোটরগাড়ি, রেলগাড়িসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন। এবার বুঝি মুক্তি মিলবে যানজট থেকে। কিন্তু না। মুক্তি মেলে নাই। মাটির  নিচে কিংবা ভূপৃষ্ঠ থেকে ওপরের দিকে তৈরি এ সমস্ত রাস্তা থেকে মানুষকে একসময় ভূপৃষ্ঠে চলে আসতে হয়। আর ভূপৃষ্ঠে এলেই তৈরি হয় যানজট। কাজেই ভূপৃষ্ঠের রাস্তাকে যানজটমুক্ত করতে পারলেই যানজট থেকে প্রকৃতপক্ষে মুক্তি মিলবে। বিষয়টি বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীগণ হাড়ে হাড়ে টের পেয়ে যান। 

গতানুগতিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে যানজটকে যখন কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছিল না তখন খোঁজ করা হচ্ছিল নতুন কোনো পদ্ধতির, যা দিয়ে প্রকৃতপক্ষেই যানজট থেকে মুক্তি মিলবে। খোঁজাখুঁজির এ মিশন থেকে বাদ যায় নাই বাংলাদেশও। সে সময় যানজটের স্থায়ী ও দ্রুততম সমাধান নিয়ে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন খ্যাতনামা জার্নালে এ সংক্রান্ত কিছু লেখা প্রকাশিত হয়। যা ‘কামরুল মডেল’ নামে পরিচিতি লাভ করে। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে সেপ্টেম্বর, ২০১৫ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় উক্ত মডেলকে (কারিগরি নাম ‘টার্নিং ইয়ার্ড’) পরীক্ষামূলকভাবে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। উত্তরা বিমানবন্দর এলাকায় এটা বাস্তবায়নের জন্য বলা হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে মাঠ পর্যায়ে উক্ত পরীক্ষাটি সুসম্পন্ন করা হয় এবং এতে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া যায়। 

পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো বিজ্ঞানচর্চায় এগিয়ে। প্রযুক্তি বিশ্বে নেতৃত্বদানকারী এসব দেশের বিজ্ঞানীরা ব্যাপক বিধ্বংসী মারণাস্ত্র পারমাণবিক বোমা যেমন বানিয়েছেন, তেমনি বানিয়েছেন বহু উপকারী বস্তুও। কিন্তু তারা যুগের পর যুগ চেষ্টা করেও একটি সমস্যার সঠিক সমাধানে পৌঁছাতে পারছিলেন না। সেটি হলো যানজট। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে বিশাল বিশাল স্থাপনা নির্মাণ করেও তারা যানজট থেকে পুরোপুরি মুক্ত হওয়ার কোনো বাস্তবসম্মত পন্থায় পৌঁছাতে পারেননি। বিশ্বের প্রায় সব শহরই এখন যানজটে আক্রান্ত। আর এমন সময়ে বাংলাদেশ চালাল টার্নিং ইয়ার্ডের এক সফল পরীক্ষা। এখন সর্বত্র এর বাস্তবায়ন জরুরি।

বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে, বিশেষ করে ঢাকা শহরে যানজটের তীব্রতা খুব বেশি। এখানে রাস্তার প্রতিটি মোড়ে মোড়ে মানুষ যানজটের কাছে জিম্মি হয়ে আছে। যানজটের বহুবিধ ক্ষতির মধ্যে একটি হলো বায়ুদূষণ। থেমে থাকা গাড়ির ধোঁয়া অবিরত বাতাসকে বিষিয়ে তুলছে। আর এই বিষাক্ত ও দূষিত বাতাস মানুষ শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করছে। এতে দেহযন্ত্রের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। অর্থাত্ যানজট প্রতিটি নিশ্বাসে মানুষের ক্ষতি করে যাচ্ছে। কাজেই আর এক মুহূর্ত সময় অপচয় না করে এক্ষুনি টার্নিং ইয়ার্ডের মাধ্যমে যানজটকে বিদায় করা উচিত। অকার্যকর কিংবা পরিত্যক্তপ্রায় কোনো প্রযুক্তির পেছনে বছরের পর বছর সময় নষ্ট করা ঠিক নয়।

n লেখক :যানজট গবেষক, টার্নিং ইয়ার্ডের প্রবর্তক ও বিশেষজ্ঞ