‘অসুস্থ চিন্তাশক্তি অভিনয় থেকে দূরে সরিয়ে দেয়’

 

মামুন চৌধুরী রিপন দেশ নাটকের অন্যতম অভিনেতা। দেশ নাটকের চলমান প্রযোজনা মাসুম রেজার ‘নিত্যপুরাণ’ ও ‘সরগাঁও’ নাটকের প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসিত হয়েছেন। মঞ্চের পাশাপাশি অভিনয় করছেন টিভি নাটক, চলচ্চিত্র ও বিজ্ঞাপনে। কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে পড়াকালীন কলেজ থিয়েটারের মাধ্যমে নাটকে জড়িয়ে পড়লেও তার থিয়েটারের হাতেখড়ি বোধন থিয়েটার, কুষ্টিয়াতে। বোধন থিয়েটারের প্রাণপুরুষ আসলাম আলীর কাছ থেকেই অভিনেতা হওয়ার সকল দীক্ষা পেয়েছেন। তার এই পথচলা পূর্ণতা পেয়েছে নাট্যকার মাসুম রেজা ও নির্দেশক ইশরাত নিশাতের সান্নিধ্যে। মামুন চৌধুরী রিপনের সঙ্গে কথা বলেছেন মাহবুব আলম

অভিনেতা হিসেবে কোন কোন বিষয়ে যত্নশীল হওয়া দরকার?

যেকোনো কর্ম করতে গেলে যেমন সুস্থ শরীর প্রয়োজন, তেমনি অভিনয় কর্ম করতে গেলেও সুস্থ শরীর প্রয়োজন। সুস্থ শরীর বলতে কিন্তু আমি খুব বলবান বা ব্যায়ামবীর হওয়ার কথা বলছি না। শরীরের যত্ন বা সঠিক পরিচর্যার কথা বলছি। শরীরের জন্য যা কিছু ক্ষতিকর তা এড়িয়ে চলতে বলছি। একজন অভিনেতার প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো নিজেকে ভালোবাসা। আপনি যখন নিজেকে ভালোবাসবেন, তখনই কেবল নিজের শরীর, মন সবকিছুর প্রতি যত্নশীল হবেন এবং সঠিক পরিচর্যা করবেন। অভিনয় করতে গেলে সুস্থ শরীর, সুস্থ মন, সুস্থ মস্তিষ্কের গুরুত্ব অপরিসীম। শরীরের যেকোনো অঙ্গ যদি সুস্থ না থাকে বা স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে অক্ষম হয় তবে আর যাই হোক অভিনয় কর্মটি সঠিকভাবে করা সম্ভব বলে আমি মনে করি না। তেমনি ভাবে বিক্ষিপ্ত মন, অসুস্থ চিন্তাশক্তি অভিনয় থেকে দূরে সরিয়ে দেবে। 

চরিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে নাটকের কোন বিষয়গুলো লক্ষণীয়?

একেকজন একেকভাবে চরিত্র নির্মাণ করেন। প্রত্যেকের একটা স্বতন্ত্র স্টাইল আছে। তবে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম তো মানতেই হয়। যেমন পাণ্ডুলিপির স্থান, কাল, পাত্র। গল্পটি রাতে না দিনে ঘটছে, কোন কালে ঘটছে, কোন স্থানে ঘটছে, চরিত্র বা চরিত্রগুলো কে কী করছে। সুস্থ চিন্তাশক্তি দিয়ে আপনি এ বিষয়গুলো যত ভাববেন, চরিত্রের চলা-বলা, আচার-আচরণ তত পরিষ্কার হবে। এগুলোর পাশাপাশি আমি আরেকটি ব্যাপার লক্ষ্য করি, সেটা হলো, অনেক সময় কোনো একটি দৃশ্য বা দৃশ্যের সংলাপ। যেকোনো একটি সংলাপও আপনার চরিত্র নির্মাণের সহায়ক হতে পারে, সমস্ত নাটকের যেকোনো একটি দৃশ্যও আপনার চরিত্রের মেরুদণ্ড তৈরি করে দিতে পারে।

অভিনেতার নির্দেশকের ওপরে কতখানি নির্ভরশীল হওয়া প্রয়োজন? কেন?

আমি মনে করি, পুরোপুরি, আবার পুরোপুরি নয়। পুরোপুরি এই জন্য যে, একমাত্র নির্দেশকই জানেন তিনি কিভাবে নাটকটি নির্মাণ করতে চান, চরিত্রগুলোকে সজীব, প্রাণবন্ত করতে চান; কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে যে, নির্দেশক কিন্তু অভিনেতা নন বা অভিনয় করে উনি দেখিয়েও দেবেন না। নির্দেশক কেবল উনার চাহিদাগুলো বলবেন, অভিনেতা সেটা পূরণ করবেন। সুতরাং নির্দেশক যা চান, তার চাওয়াটাকে গুরুত্ব দিয়ে নিজের মেধা খাটিয়ে চরিত্র নির্মাণ করে অভিনয় করাটাকেই আমি বেস্ট মনে করি।  

মঞ্চে অভিনয়ের পূর্বে কেমন প্রস্তুতি দরকার?  

মনোযোগ, মনোযোগ আর মনোযোগ। অভিনয়ের পূর্বে পৃথিবীর যাবতীয় কিছু মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে শুধু একটু পর আপনি মঞ্চে যা করতে যাচ্ছেন সেদিকে মনকে স্থির করুন। নাটকটির শুরু থেকে শেষ অবধি চোখটা বন্ধ করে ভাবতে থাকুন।

ভালো অভিনেতা হতে কী কী করা প্রয়োজন বলে মনে করেন?

প্রতিটি ব্যক্তি যেমন ভিন্ন, প্রতিটি চরিত্রও তেমন ভিন্ন। অর্থাত্ ভিন্ন ভিন্ন সত্তা। একজন অভিনেতার এই ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র বা সত্তা নির্মাণ করতে পড়াশোনা ও দেখার গুরুত্ব অপরিসীম। আমরা যখন একটা গল্পের বই পড়ি বা কোনো গান শুনি, সেখানে কিন্তু কোনো ছবি থাকে না। থাকে স্থান, কাল, ভাব, পাত্রের বর্ণনা বা কথোপকথন। কিন্তু পড়ার সময় ঠিকই আমাদের মনে সেই স্থানের ছবি ভেসে ওঠে বা যে পাত্রপাত্রীর উল্লেখ আছে তাদের একটি অবয়ব ভেসে ওঠে। ভালো ভালো পেইন্টিংস দেখলেও একটা অনুভূতি তৈরি হয়, বিভিন্ন ভাবনার সৃষ্টি হয়। সবগুলোই অভিনেতা হিসেবে গড়ে উঠতে অসম্ভব সহযোগিতা করে। এই অভ্যাসগুলো যত বেশি চর্চা করা যাবে, একজন সুঅভিনেতা হওয়া ততটাই সহজ হবে আমি বিশ্বাস করি।