ইউপি নির্বাচন হোক উৎসবমুখর

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সবচেয়ে ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হল ইউপি নির্বাচন। তৃণমূল পর্যায়ে সুষম উন্নয়ন আর গ্রামীণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সঠিক সেবাটি পৌঁছে দেওয়ার জন্য ইউপি নির্বাচন সবসময় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সঠিক প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে সত্যিকারের জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত না হলে সুষ্ঠু নির্বাচন ও উন্নয়ন প্রক্রিয়া পুরোপুরি বাধাগ্রস্ত হয়। 

এক সময়ে আমাদের দেশে ইউপি নির্বাচন মানুষের কাছে একটা বড় উৎসবের উপলক্ষ ছিল। একটা নির্বাচন শেষ হয়ে গেলে আরেকটা নির্বাচনের জন্য মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে দিন গুনত। বিশেষ করে নির্বাচনের পরের ৫ বছর যে খুব বড় একটা সময়, এমনটা আমি কাউকে কোনদিন বলতে শুনিনি। আমি আমার এলাকায় দেখেছি কিভাবে মানুষ  তার এলাকার বা সমর্থিত প্রার্থীর জন্য অপেক্ষা করেন, আর সেই অপেক্ষাটাও খুব বেশি কষ্টের ছিল না এমনই বুঝতে পেরেছি। ইউপি নির্বাচনে তখন দলীয় প্রভাব ছিল খুবই কম, এলাকা বা গ্রাম ভিত্তিক প্রভাব ছিল সুস্পষ্ট। এলাকার প্রতিনিধি নির্বাচন করতে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে দেখেছি, নির্বাচনে বা ভোটে মহিলাদের অংশগ্রহণ ছিল খুবই কম।

একটা ঘটনা দিয়ে বর্ণনা করি, তখন আমি তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী, কিন্তু এখনো মনে আছে শতশত লোক একসাথে উৎসবমুখর পরিবেশে মিছিল করত। তখনকার সময়ে এযুগের মত মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা ছিল না, তখনকার স্লোগানগুলোও ছিল খুব মজার, সেগুলো এখানে উল্লেখ করতে চাইছি না। মিছিলের একেবারে সামনে থাকতো প্রার্থী আর তার সাথে কিছু প্রবীণ ও গণ্যমান্য ব্যক্তি, আর তার ঠিক পিছনেই থাকত কিছু লোক, যারা মেয়ে সেজে নেচে গেয়ে মিছিলে এগিয়ে যেত, কখনো বা মুখে রঙ মেখে কপালে লালফিতা বেধে রাখত, কারোর কারোর কাছে থাকত বাঁশ বা বেতের তৈরি প্রতীক যা প্রদর্শন করত, কি যে আনন্দঘন পরিবেশ ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আমার সৌভাগ্য হয়েছে দু-একবার এরকম মিছিলে অংশ নেওয়ার, যদি কোনোদিন বাড়ি থেকে যেতে না দিত, সেদিন বাড়ির সামনে দিয়ে মিছিল অতিক্রম করার সময় আমরা ছোটরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে মিছিলের দৃশ্য দেখতাম। মেয়েরা বাড়ির পাশে আড়ালে থেকে মিছিল উপভোগ করত। মিছিল শেষে প্রার্থীর বাড়িতে গুড়-মুড়ি বা চা-বিস্কিট খেতে দিত, খুব ছোট বেলায় কোন এক প্রার্থীর বাড়িতে চা খাওয়ার সময় আমি আমার জিহ্বা পুড়িয়ে ফেলেছিলাম, সে ঘটনা আজ আর না বলি। নাস্তা খাওয়া শেষে বড়দের আর বয়স্কদের হাতে বিড়ির প্যাকেট তুলে দিত। তখন সিগারেটের প্রচলন খুব বেশি ছিল না, সারাদিন মিছিল করার পর তা পেয়েই গ্রামের মানুষজন খুশি থাকত। কখনো কখনো একটা বিড়ির প্যাকেট ২/৩ জন ভাগ করে নিত। প্রার্থীরা নির্বাচনের আগে ঘর বোঝাই করে বিড়ি, জর্দা, চিড়া-মুড়ি এসব কিনে রাখত, সেগুলোই ছিল নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যয়ের প্রধান খাত। আরও আগের গল্প যদি বলি, যদিও আমার শোনা গল্প - নির্বাচনের আগে নাকি ভোটাররা ঘরের দরজার সামনে ঝুড়ি বা খালই (মাছ রাখার টুকরি) বেধে রাখত, তাতেই কর্মীরা রাতের বেলায় ভোট চাইতে এসে প্রার্থীর নাম বলে বিড়ির প্যাকেট বা জর্দার কৌটা রেখে চলে যেত। এই বিড়ি বা জর্দা মানুষজন নির্বাচনের ৩/৪ মাস পরও ব্যবহার করত। প্রার্থীদের এসব কার্যকলাপ যে আমি বৈধ বলছি তা নয়, কিন্তু এসবের মধ্যে যে উৎসব লুকায়িত ছিল তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

অতীতের নির্বাচন উৎসবের সঙ্গে বর্তমান পরিবেশ পরিস্থিতির তুলনা করলে সম্পূর্ণ প্রতিকূল চিত্র দেখতে পাই, চায়ের দোকানে নির্বাচনী উত্তাপ আছে। একবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটা মজার পোস্ট দেখেছিলাম, ‘৫০০ টাকার লোভে আমরা ভোট দেই কোন শয়তানকে আর নির্বাচনের পর তার কাছে থেকে কাজ চাই ফেরেশতার মত’, এটি মজার ছলে লিখা হলেও ঘটনা কিন্তু অনেকাংশেই সঠিক। অনেক ক্ষেত্রেই অর্থ আর পেশীশক্তির কাছে সৎ, আদর্শবান ও যোগ্য প্রার্থীরা পিছিয়ে পড়ছেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মনোনয়ন বাণিজ্য আর আত্মীয়করণের ফলে যোগ্য  প্রার্থীরা চাপে পড়ে নির্বাচনেই আসতে পারে না। আমার মতে প্রতিনিধি বাছাইয়ের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার বাইরে থেকে ভোটারদের যে বিষয়গুলো বিবেচনা করা উচিত তা হলো মনের দিক থেকে তরুণ, সৎ, শিক্ষিত ও আধুনিক চিন্তা চেতনা বা মতাদর্শে বিশ্বাসী আদর্শ প্রার্থী যিনি তথ্য ও প্রযুক্তি নির্ভর জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে একনিষ্ঠভাবে কাজ করতে সক্ষম। তাহলেই সেই প্রার্থীরপক্ষে একজন সত্যিকারের উন্নয়নকর্মী হিসেবে কাজ করে দেশ ও সমাজের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। 

আমি ব্যক্তিগতভাবে ইউপি নির্বাচন দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হবার ঘোর বিরোধী, যদিও সরকার যখন আইন করেছে সেটা প্রয়োজন বিবেচনাতেই করেছে। কিন্তু একটি ইউনিয়নে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে স্বাভাবিকভাবেই একটি দলের একই পর্যায়ের একাধিক যোগ্য প্রার্থী থাকেন, এক্ষেত্রে একজনকে দলীয় মনোনয়ন প্রদান করে সমযোগ্যতার অন্যদের জোরকরে মনোনয়ন বঞ্চিত করা হয়, একই সাথে এটাও বিবেচ্য বিষয় এইযে, তৃণমূলের যেসকল নেতারা বড় বড় রাজনৈতিক দলের প্রতীক ব্যবহার করেন, সত্যিকার অর্থেই কি তারা সেই প্রতীকের ভার বহন করার যোগ্যতা রাখেন? দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের ফলে তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মীরা যেমন অবহেলিত হচ্ছেন, তেমনি সুবিধাবাদীদের কারণে দলীয় অসন্তোষ সৃষ্টির মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর বড় ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। ইউপি নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার না করে সত্যিকারের উৎসবমুখর পরিবেশে জনপ্রতিনিধি বাছাই হওয়া এখন সময়ের দাবি। আগামী নির্বাচনে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইন সংশোধন করে দলীয় প্রতীকের ব্যবহার ব্যতিরেখে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জোর দাবি জানাচ্ছি।


লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।