সংবাদ সম্মেলনে পূজা উদ্যাপন পরিষদের অভিযোগ

কোনো সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সুষ্ঠু বিচার এ দেশে হয়নি

দুর্গাপূজার সময় বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করে আসন্ন শ্যামাপূজায় দীপাবলি উত্সব বর্জনের ডাক দিয়েছেন পূজা উদ্যাপন পরিষদ। গতকাল শুক্রবার সকালে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান নেতারা। নেতাদের অভিযোগ, হামলা ঠেকাতে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যর্থ হয়েছে।

পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নির্মল কুমার চ্যাটার্জি বলেন, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে যত সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, তার একটিরও সুষ্ঠু বিচার হয়েছে বলে তাদের জানা নেই। কোনো ঘটনা ঘটার পর দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর পালটাপালটি দোষারোপের সংস্কৃতি পরিস্থিতি আরো নাজুক করে তুলেছে। তিনি আরো বলেন, বিচারহীনতা বা বিচার না হওয়ার সংস্কৃতি দুষ্কৃতকারীদের উত্সাহিত করছে এবং প্রায়ই তারা সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে।

পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা নিয়ে পরে আওয়ামী লীগের সময়ে তদন্ত কমিশন গঠনের কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, সেই রিপোর্টের আলোকে এক জনেরও বিচার হয়েছে কি না, তা দৃশ্যমান নয়।

সাম্প্রদায়িক সহিংসতার শিকার হয়ে গত ৫০ বছরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হিন্দু ধর্মাবলম্বী দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন মন্তব্য করে তিনি বলেন, যারা এখনো দেশকে ভালোবেসে মাতৃভূমিতে থাকতে চাইছেন বা আছেন, তারাও পর্যায়ক্রমে সহিংসতার শিকার হয়ে যে আস্থার সংকটে পড়েছেন, তাতে ভবিষ্যত্ বলে দেবে তারা কতদিন দেশে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারেন।

নির্মল কুমার চ্যাটা?র্জি জানান, আগামী ৪ নভেম্বর শ্যামাপূজায় দীপাবলির উত্সব বর্জন করা হবে, তবে প্রতিমা পূজার কর্মসূচি পালিত হবে। সেদিন কালো কাপড়ে মুখ ঢেকে মন্দিরে নীরবতা পালন করা হবে।

শারদীয় দুর্গাপূজার সময় সারা দেশের পূজামণ্ডপে সাম্প্রদায়িক শক্তির হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও হত্যার বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে নির্মল কুমার চ্যাটার্জি কিছু প্রশ্ন তুলে ধরেন।

লিখিত বক্তব্যে নির্মল চ্যাটা?র্জি বলেন, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন স্থানে হামলা ও হামলা পরবর্তী সময়ে স্থানীয় প্রশাসন সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। দুর্গাপূজার মধ্যে গত ১৩ অক্টোবর ভোরে নানুয়া দীঘির পাড়ে দর্পণ সংঘের পূজামণ্ডপে হনুমানের মূর্তির কোলে মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন রাখা দেখে এলাকায় উত্তেজনা ছড়ায়। হামলা, ভাঙচুর চালানো হয় অন্তত আটটি মন্দিরে। তার জের ধরে সেদিনই চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে মন্দিরে হামলা হয়, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয় পাঁচ জন। এর পরের কয়েক দিনে নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ কয়েকটি জেলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হয়। তাতে নোয়াখালীতে নিহত হয় দুই জন।

নির্মল চ্যাটার্জি বলেন, কুমিল্লা নানুয়া দীঘিরপাড়ের মণ্ডপটি অস্থায়ী। ঘটনার রাতে মণ্ডপে মাত্র এক জন পাহারায় ছিলেন। ১৩ অক্টোবর রাত ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে কিছু সময়ের জন্য কুমিল্লার নানুয়া দীঘিপাড়ের মণ্ডপ এলাকায় বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কী কারণে ঐ সময় এমন হলো, তা তদন্তের আওতায় আনতে হবে। তিনি আরো বলেন, কোতোয়ালি থানার ওসি আনওয়ারুল আজিম হনুমান মূর্তির কোলের ওপর রাখা পবিত্র কোরআন শরিফটি সরিয়ে নেওয়ার পরও কেন ভিডিও করার সুযোগ দিলেন, যা পরে ভাইরাল হয়েছে।

নির্মল চ্যাটার্জি বলেন, নোয়াখালীর চৌমুহনীতে বেলা ১১টার মধ্যে সব পূজামণ্ডপের প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন হওয়ার পরও যখন হামলা শুরু হয়, তখন পুলিশ ও প্রশাসনের কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি মর্মে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। এক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের কোনো পর্যায়ের দায়িত্ব পালনে গাফলতি আছে কি না তা অবিলম্বে চিহ্নিত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে মনে করি আমরা।

সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ পূজা উদ্?যাপন পরিষদের সভাপতি মিলন কান্তি  দত্ত। অন্যদের মধ্যে বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাবেক সভাপতি কাজল দেবনাথ, পূজা উদ্যাপন পরিষদের উপদেষ্টা জয়ন্ত সেন, মহানগরের উদ্যাপন পরিষদের মহানগর কমিটির সভাপতি শৈলেন মজুমদার, সাধারণ সম্পাদক কিশোর মণ্ডলসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

দাবিসমূহ: ক্ষতিগ্রস্ত সব মন্দির, বাড়িঘর সরকারি খরচে পুনর্নির্মাণ করে দেওয়া, গৃহহীনদের দ্রুত পুনর্বাসন করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও আহতদের চিকিত্সার ব্যবস্থা করা। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ করা। দলমতের ঊর্ধ্বে থেকে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে প্রকৃত দোষীদের বিচারের পদক্ষেপ নিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো ক্ষেত্রেই নিরীহ মানুষকে হয়রানি করা যাবে না। সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটনের জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে এবং তদন্ত কমিশনের প্রকাশিত রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। হিন্দুধর্মীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে, তা প্রতিবিধানে সরকারের স্পষ্ট বক্তব্য ও পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি করা হয়েছে। ২০০১ সালের সাম্প্রদায়িক ঘটনাসমূহের ওপর তদন্ত সম্পর্কিত সাহাবউদ্দিন কমিশন রিপোর্টের পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত সংখ্যালঘু ও ধর্মীয় নৃ-গোষ্ঠীর বিষয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতি, সংখ্যালঘু বিশেষ সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন, অর্পিত সম্পত্তি প্রকৃত স্বত্বাধিকারীর কাছে ফেরত দেওয়া, সংখ্যালঘু ও ধর্মীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্যমূলক আইনের অবসানসহ ইশতেহারের ৩.২৯ নম্বর অনুচ্ছেদে ঘোষিত অন্যান্য প্রতিশ্রুতিও সরকারের এই মেয়াদে বাস্তবায়ন করতে হবে। সংবিধানে বিরাজমান অসংগতি দূর করে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ১৯৭২-এর সংবিধান পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে।