অনাগত সন্তানের লিঙ্গপরিচয় শনাক্তে কেন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে না—সেই মর্মে রুল জারি করেছিল হাইকোর্ট। কিন্তু গত দেড় বছরেও সেই রুলের জবাব দেয়নি বিবাদীরা। রুলের জবাব না দেওয়ায় শুনানির জন্য প্রস্তুত হচ্ছে না জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট এই মামলাটি। এদিকে হাইকোর্টের রুল বিচারাধীন থাকাবস্থায় এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি অনাগত সন্তানের লিঙ্গপরিচয় প্রকাশ। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন গর্ভবতী মা ও তার গর্ভের সন্তান। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলছেন, গর্ভের শিশুর লিঙ্গপরিচয় জানানোর পর যদি গর্ভবতী মা দেখেন যে তার প্রত্যাশা পূরণ হয়নি তখন সে মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন। আর সেই চাপ তার পরিবারের কাছ থেকেও আসে কখনো কখনো। চিকিত্সকরা বলেন, গর্ভবতী মায়ের এ ধরনের মানসিক চাপের ফলে অপরিণত শিশুর জন্ম হয়।
এ প্রসঙ্গে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব সায়েদুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, অনাগত শিশুসন্তানের পরিচয় প্রকাশ না করার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নির্দেশনা দিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নেটারনেল অ্যান্ড নিউনেটাল চাইল্ড অ্যান্ড এডোলেসন হেলথ ডিরেক্টর ড. মো. শামসুল হক বলেন, বিষয়টি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনী সব প্রতিষ্ঠানে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
অনাগত সন্তানের লিঙ্গপরিচয় প্রকাশ বন্ধে হাইকোর্টে রিট করেন অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, দেশের বেশির ভাগ মানুষের ছেলে সন্তানই কাম্য। তারা মনে করেন ছেলেরা বংশের ধারক। তারা বেশি শক্তিশালী এবং আয়ও বেশি করে। এমনকি অনেক নারী মনে করেন ছেলে সন্তান তাদের ভবিষ্যতে সুরক্ষা দেবে। এ অবস্থায় গর্ভে থাকা সন্তানের লিঙ্গপরিচয় জানানো হয় এবং সেটা যদি কাঙ্ক্ষিত না হয় তাহলে গর্ভবতী মায়ের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর তা বিরূপ প্রভাব ফেলে। তিনি বলেন, হাইকোর্ট লিঙ্গপরিচয় প্রকাশের প্রশ্নে রুল জারির পর অনেক নামিদামি হাসপাতাল সন্তানের লিঙ্গপরিচয় প্রকাশ বন্ধ করে দিয়েছে। তবে অনেক হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার এটা মানছে না।
পেছনের গল্পটা ছাি ভিন্ন
রিটকারী আইনজীবী ইশরাত হাসান একটি নামি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আলট্রাসনোগ্রাম করাতে যান। সেখানে গিয়ে দেখেন অন্য এক জন প্রসূতি আলট্রাসনোগ্রাম করানোর আগে বারবার করে চিকিত্সকের কাছে জানতে চাইছেন তার ছেলে না মেয়ে হবে। মহিলা যখন জানতে পারেন যে তার গর্ভের সন্তান মেয়ে, তখন তিনি হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেন, আর বলতে থাকেন ‘কেন আবার আমার মেয়ে হলো আল্লাহ, আমাকে রক্ষা কর, আমাকে রক্ষা কর।’
ইসরাত জানতে পারেন যে ঐ গৃহবধূর আরো দুটি মেয়ে সন্তান আছে। স্বামী আর শ্বশুরবাড়ির সবাই শুরু থেকেই ছেলে আশা করে আছে। প্রথম মেয়ে হওয়ার পর থেকেই শ্বশুরবাড়ির লোকজনের তরফ থেকে ঐ নারীর ওপর নানা রকম মানসিক চাপ আসতে শুরু করে। দ্বিতীয় মেয়ে হওয়ার সময় শুধু শাশুড়ি তাকে হাসপাতালে দেখতে আসেন। অনেকদিন স্বামী তার সঙ্গে কথা পর্যন্ত বলেননি। আর তৃতীয় মেয়ে হবে শুনলে তারা কী করবেন তাই ভেবেই তিনি কাঁদছেন। এরপরই গত বছরের জানুয়ারি মাসে হাইকোর্টে এ বিষয়ে রিট করা হয়। ঐ রিটের ওপর রুল জারি করে আদালত।
অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি) এর প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক সামিনা চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, গর্ভের সন্তান অপ্রত্যাশিতভাবে মেয়ে হওয়ায় অনেক শিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত পরিবারেও নানা রকম অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। কিন্তু গর্ভবতী মায়ের সঙ্গে বিরূপ ব্যবহার মা ও গর্ভের শিশু—উভয়ের স্বাস্থ্যের জন্যই মারাত্মক ক্ষতিকর। উল্লেখ্য, বিশ্বে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক নবজাতকের মৃত্যু হওয়া দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় ২৩০টি মৃত সন্তান প্রসব হয়।
হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের অনারারি অধ্যাপক ডা. রওশন আরা বেগম ইত্তেফাককে বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশনার বিষয়টি আমরা সবাইকে অবগত করি। আমরা এখন গর্ভের সন্তানের লিঙ্গপরিচয় বলি না। আমরা এখন রোগী, তার অভিভাবক বা স্বামীকে এসব বিষয় কাউন্সিলিং করি। পরিবর্তন কিছুটা হচ্ছে তবে এখনো অনেক পরিবর্তন আনতে হবে।
সমাজবিজ্ঞানি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, এর দুটি দিক আছে—একদিকে নারীর ক্ষমতায়নে নারীর শরীরের ওপর নারীর অধিকার। সে নিজের ইচ্ছায় যা করতে চায় তা করতে দিতে হবে। আবার তার অপ্রত্যাশিত কন্যাশিশুর জন্য বৈষম্যও কাম্য নয়। তাই একটি মানবিক দিক নির্ধারণ করা জরুরি। রাষ্ট্রকেই নারীর ক্ষমতায়ন ও নারীর স্বাস্থ্য রক্ষা করতে হবে।