পূর্ব-পশ্চিমের ব্যাবসায়িক সেতুবন্ধ হবে বাংলাদেশ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভবিষ্যতে বাংলাদেশ প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের মধ্যে ব্যবসায়িক যোগাযোগের একটি সেতুবন্ধন হিসেবে গড়ে উঠবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, যেসব ব্যবসায়ী বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আসবেন তারা এখান থেকে দক্ষিণ এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর বাজার ধরারও একটা সুযোগ পাবেন। এ জন্য তার সরকার সড়কপথ, নৌপথ, রেলপথ এবং আকাশপথ—সবগুলো যাতে উন্নত হয় তার যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সপ্তাহব্যাপী ‘বাংলাদেশ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্মেলন-২০২১’ উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এ কথা বলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন উপলক্ষ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) এই আন্তর্জাতিক ভার্চুয়াল সম্মেলন আয়োজন করে। তিনি গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ভার্চুয়ালি সম্মেলনের উদ্বোধন করে বলেন, সাত দিনের এই সম্মেলন আমাদের দেশের জন্য সম্ভাবনাময় ৯টি খাত যেমন-অবকাঠামো, তথ্য-প্রযুক্তি ও ফিনটেক, চামড়া, ওষুধ, স্বয়ংক্রিয় ও ক্ষুদ্র প্রকৌশল, কৃষিপণ্য ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পাট-বস্ত্রশিল্পসহ অতি চাহিদা সম্পন্ন ভোগ্যপণ্য উত্পাদন এবং ক্ষুদ্রব্যবসাকে অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করেছে,         যা সময়োপযোগী। তিনি আরো বলেন, এর সাথে সাথে আমি এও বলব নতুন নতুন আর কী কী পণ্য আমরা উত্পাদন করতে পারি এবং রপ্তানি করতে পারি সেটাও গবেষণা করে বের করতে হবে। কোন কোন দেশে কী কী পণ্যের চাহিদা রয়েছে সেটা অনুধাবন করে সেই পণ্য বাংলাদেশে উত্পাদন করতে পারি কি-না, সেটাও বিবেচনা করতে হবে।

সরকার প্রধান বলেন, কাজেই আমাদের যারা ব্যবসায়ী বন্ধু রয়েছেন, বিশেষকরে বেসরকারি খাতে-তাদের প্রতি আমি অনুরোধ জানাব আপনারা এই বিষয়টার দিকে বিশেষভাবে নজর দিবেন। কারণ, আমাদের রপ্তানি পণ্যের সংখ্যা আরো বাড়ানো প্রয়োজন। আমি বিশ্বাস করি, এই সম্মেলনের মাধ্যমে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য দেশি-বিদেশি শিল্প উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীগণ বাংলাদেশের ব্যবসায়ী খাতের সম্ভাবনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবেন। ফলে, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পণ্যের নব নব দ্বার উন্মোচিত হবে। রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে এবং বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ আকর্ষণে সক্ষম হবে।

ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ কোন দেশের কতটা উন্নত তা বোঝাতে বিশ্বব্যাংকের ‘ইস অব ডুয়িং বিজনেস ইনডেক্স’ ব্যবহার করা হয়ে থাকে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৯ সালে উক্ত ইনডেক্স-এ বাংলাদেশের অবস্থান আগের বছরের ১৭৬ হতে ১৬৮ তে উন্নীত হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যবসার বিভিন্ন সূচক উন্নয়নে বিশ্বের সর্বোচ্চ ২০টি সংস্কারকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তিনি বলেন, উক্ত ইনডেক্স-এ বাংলাদেশের অবস্থান দুই অংকে অর্থাত্ ১০০ এর নিচে নামিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) কাজ করে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে বিশেষায়িত দল গঠন করে বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগ সংক্রান্ত সকল সেবা সমন্বিত করে একই প্ল্যাটফরম হতে প্রদানের জন্য ২০১৯ সাল হতে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ (ওএসএস) পোর্টাল ব্যবস্থার প্রচলন করা হয়। সেই থেকে বিভিন্ন সংস্থার বিনিয়োগ সংক্রান্ত সেবাসমূহ উক্ত পোর্টালে পর্যায়ক্রমে যুক্ত করা হয়েছে। সরকার বাণিজ্যিক কূটনীতি জোরদার করার জন্য আমাদের বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলোতে ২৩টি বাণিজ্যিক উইং খুলেছে।

শেখ হাসিনা বলেন, গত তেরো বছরে সরকার দেশের প্রতিটি খাতে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে ‘রোল মডেল’। দেশের অর্থনীতিকে শক্ত ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছি এবং উন্নয়নের ৯০ ভাগ কাজই নিজস্ব অর্থায়নে করছি। করোনা মহামারির প্রতিঘাত নিরসনে ১ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনাও দিয়েছি।

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের (বিআইসিসি) হল অব ফেমে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এবং বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষ। এছাড়া ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন ও ডিসিসিআই সভাপতি রিজওয়ান রহমান বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠানে সম্মেলনের ওপর একটি অডিও ভিজ্যুয়াল প্রেজেন্টেশন পরিবেশিত হয়।

উল্লেখ্য, সপ্তাহব্যাপী এই বিনিয়োগ সম্মেলনে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা ও সম্ভাবনার ভিত্তিতে বিশেষ করে অবকাঠামো (ভৌত অবকাঠোমো, লজিস্টিকস্ ও জ্বালানি), আইটি/আইটিইএস ও ফিনটেক, চামড়াজাত পণ্য, ফার্মাসিউটিক্যালস, অটোমোটিভ ও হালকা প্রকৌশল, প্লাস্টিক পণ্য, কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, পাট ও বস্ত্র এবং এফএমসিজি (ফাস্ট মুভিং ভোগ্যপণ্য) এবং খুচরা ব্যবসাসহ ৯টি খাত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বাংলাদেশসহ পাঁচটি মহাদেশের ৩৮টি দেশের ৫৫২টি কোম্পানি ৪৫০টি বিজনেস টু বিজনেস (বিটুবি) ম্যাচ মেকিং সেশনে অংশগ্রহণ করবে। যা বাংলাদেশে নতুন ব্যবসার সুযোগ অন্বেষণ করতে এবং এফডিআই আকৃষ্ট করতে সাহায্য করবে।