ইউপি নির্বাচন ও সহিংসতা

বর্তমানে দেশে চলিতেছে ইউপি নির্বাচনের হাওয়া। ২০ সেপ্টেম্বর প্রথম ধাপে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবার পর আগামী ১১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হইবে দ্বিতীয় ধাপের ৮৪৮টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন। স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচনের মাধ্যমে তৃণমূলে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিকাশ ঘটিবে। কিন্তু এই নির্বাচনও সহিংসার উত্তাপ ছড়াইতেছে। স্থানীয় পর্যায়ে ভোটের রাজনীতিকে ঘিরিয়া বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা যেমন বাড়িতেছে, তেমন বাড়িতেছে সংঘাত-সংঘর্ষও। নরসিংদীর রায়পুরায় ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া ক্ষমতাসীন দলের দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পালটাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটিয়াছে গত সোমবার। ইহাতে গুলিবিদ্ধসহ আহত হইয়াছেন ২০ জন। সম্প্রতি কুষ্টিয়ায় নির্বাচনি প্রচারণায় হামলা চালানো হইয়াছে। ইতিপূর্বে প্রথম দফার যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাহা সহিংসতামুক্ত ছিল না। ইহাতে ছয় জন নিহত হইয়াছে। বর্তমানে মনোনয়ন বাণিজ্য, বিদ্রোহী প্রার্থীর ছড়াছড়ি ইত্যাদি কারণে তৃণমূল পর্যায়ে যে ক্ষোভ বিরাজমান, তাহাতে আসন্ন দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচন সহিংসতা ছাড়া সম্পন্ন করা হইবে চ্যালেঞ্জস্বরূপ।

বড় সকল দল অংশ নেওয়া না সত্ত্বেও এবার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে সহিংস ঘটনা ঘটিবার বিষয়টি বিস্ময়কর ও অনাকাঙ্ক্ষিত। বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ, গোলাগুলি, কেন্দ্র দখল, জাল ভোট প্রদান ইত্যাদি যেন নির্বাচনের অনুষঙ্গে পরিণত হইয়াছে। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও উত্সবমুখর হউক ইহাই সকলের নিকট প্রত্যাশিত। কিন্তু উপমহাদেশের নির্বাচনি সংস্কৃতি উত্তাপবিহীন নহে। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি আমাদের তুলনায় ভালো বলিবার কোনো উপায় নাই। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হইলে তাহাতে গণতান্ত্রিক সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। কিন্তু নিম্নমানের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে ইহা আমাদের দেশে অরণ্যে রোদনে পরিণত হইয়াছে। স্থানীয় সরকার হইতে শুরু করিয়া জাতীয় নির্বাচন সর্বত্র শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা আবশ্যক। ইসিকে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের নজির তৈরি করিতে হইবে। প্রার্থী ও কর্মীদের মানিয়া চলিতে হইবে নির্বাচনি আচরণবিধি। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জাগরণ সৃষ্টিতে আমাদের সবাইকে সচেতনতার পরিচয় দিতে হইবে। দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনের আগে সিলেট শহরতলিতে নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া এক জন নিহত হইয়াছেন। তবে ২০১৬ সালে যে ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাহাতে বেসরকারি একটি সংস্থার মতে, শতাধিক মানুষ নিহত হয়। এই নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচাইতে সহিংস নির্বাচন। দলভিত্তিক নির্বাচনের কারণে তৃণমূল পর্যায়ে এমনটি ঘটিতেছে বলিয়া অনেকে মনে করেন।

আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি বিদায়ের আগে দেশব্যাপী বাকি প্রায় ৪ হাজার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন, জেলা পরিষদ, ২০ পৌরসভা ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ভোট করিতে হইবে নির্বাচন কমিশনকে। দ্বিতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হইল বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যাধিক্য। ইত্তেফাকের এক খবর অনুযায়ী, দ্বিতীয় ধাপের ৮৪৬টি ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী রহিয়াছেন আড়াই হাজারেরও অধিক। তাহাদের অধিকাংশই আসলে বিদ্রোহী প্রার্থী। দলের মনোনয়ন না পাইয়া স্বতন্ত্র হিসাবে দাঁড়াইয়াছেন। মনোনয়ন নিয়া বাণিজ্যের অভিযোগও নূতন নহে। অনেকে নৌকা প্রতীক না পাইয়া ক্ষুব্ধ। সহিংসতা বৃদ্ধির ইহা অন্যতম কারণ। ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রার্থী নির্ধারণ না করিতে পারিয়া প্রার্থিতা উন্মুক্ত রাখা হইতেছে।

প্রকৃতপক্ষে শুধু নির্বাচন নহে, অন্যান্য কারণেও বলিতে গেলে সমাজের সকল জায়গায় অসহিষ্ণুতা বিরাজমান। সবচাইতে উদ্বেগের বিষয় হইল, যাহারা সহিংসতা ছড়াইতেছে, তাহাদের মধ্যে দেখা দিতেছে ড্যাম কেয়ার মনোভাব। তাহারা দলীয় নির্দেশনা ও নির্বাচনি আচরণবিধির তোয়াক্কা করিতেছেন না। বলা হইতেছে, নির্বাচনে কেহ বিদ্রোহী প্রার্থী হইলে তাহাকে দল হইতে বহিষ্কার করা হইবে। কিন্তু বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা এত অধিক হওয়ার পরও তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হইতেছে না। যখন আমরা কোনো পদেক্ষপ নিতেই পারি না, তখন এই সকল কথাবার্তা বলিয়া আমরা হাসির পাত্র হই কেন? প্রশাসনও অনেক ক্ষেত্রে নির্দেশনা মানিতেছে না। ফলে নির্বাচন সহিংসতা ও বিতর্কমুক্ত হইতে পারিতেছে না। বিষয়টি আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়া দেখিতে হইবে।