দুধে-ভাতে থাকার দিন কি শেষ?

 ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে’ ভারতচন্দ্র রায় গুণাকরের বিখ্যাত এই উক্তি পৃথিবীর সব বাবা-মায়ের অব্যক্ত প্রার্থনা। ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি সন্তানের কল্যাণ সাধন হোক—এমনটাই চাওয়া সব বাবা-মায়ের। ভারতচন্দ্র বিখ্যাত উক্তিটি দিয়ে বুঝিয়েছেনও তা-ই। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে উলটো চিত্র। দেড় বছরের করোনার ধকল সামলে ওঠার আগেই নতুন করে বিপাকে পড়ছে সমাজের স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষ। বিগত কয়েক মাস ধরেই বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্রের দাম, যা ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে সমাজের অধিকাংশ মানুষের নাগালের বাইরে। স্বল্প আয়ের বাবা-মা চাইলেও এখন সন্তানকে দুধে-ভাতে রাখতে পারছেন না। ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণ যেন চলে যাচ্ছে সাধ্যের বাইরে। মৌলিক চাহিদা পূরণে তৈরি হচ্ছে নানা বাধা, সেখানে জীবন ধারণের বাকি চাহিদা পূরণ তো দুঃস্বপ্নের নাম।

বর্তমান বাজারে এমন কোনো পণ্য পাওয়া যাবে না, যাতে মূল্য বৃদ্ধি পায়নি। বিশেষ করে মধ্য ও নিম্ন আয়ের মানুষের তালিকায় থাকা খাদ্যদ্রব্যের দামে দেখা দিয়েছে বিরাট পরিবর্তন। স্বল্প আয়ের মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণের অন্যতম উপাদান ব্রয়লার মুরগি। যাতে বছরের ব্যবধানে দাম হয়েছে দ্বিগুণ। এছাড়া তেল-পেঁয়াজ-লবণ থেকে শুরু করে সব পণ্যের দামে এসেছে বিশাল পার্থক্য। অস্বাভাবিক এ মূল্য বৃদ্ধিতে মানিয়ে নিতে তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের অসংগতি। সমাজে বৃদ্ধি পাচ্ছে অপরাধপ্রবণতা হার। কেননা, জীবন ধারণের জন্য পর্যাপ্ত আয় না থাকার ফলে স্বল্প আয়ের বহু লোক জড়িয়ে পড়ছে নানা ধরনের অন্যায় কাজের সঙ্গে। ফলে সমাজে তৈরি হচ্ছে বিশৃৃঙ্খলা। একই সঙ্গে সমাজে প্রকট আকার ধারণ করছে বৈষম্য। এমন পরিস্থিতিতে সমাজের কিছু মানুষের সম্পদ বৃদ্ধি পাচ্ছে অস্বাভাবিক গতিতে। আবার কিছু মানুষ ডুকরে মরছে মৌলিক চাহিদা পূরণ না করতে পেরে। এমনকি  অভাব-অনটনে আত্মহত্যার পথও বেছে নিয়েছেন  কেউ কেউ।

যদিও দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার থেকে গ্রহণ করা হয়েছে কিছু পদক্ষেপ। সারা দেশে অল্প দামে টিসিবির পণ্য সরবরাহের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কিছু পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশে অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি রোধ এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বেশ কিছু আইন। যেমন—  কন্টোল অব অ্যাসেনশিয়াল কমোডিটি অ্যাক্ট ১৯৭৬, দ্য অ্যাসেনশিয়াল আর্টিকেলস অ্যাক্ট, ১৯৫৩, অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্যাদি নিয়ন্ত্রণ আদেশ ১৯৮১, অত্যাবশ্যকীয় পণ্য বিপণন ও পরিবেশক নিয়োগ আদেশ ২০১১। একই সঙ্গে ভোক্তাদের জন্য রয়েছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯। এছাড়াও বাজারের বিভিন্ন অসংগতি রোধে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। কিন্তু  কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এতকিছুর পরও অধিক মুনাফা লাভের আশায় বাজারে তৈরি করছে কৃত্রিম সংকট। ফলে দাম বেড়ে যাচ্ছে রাতারাতি। দাম নিয়ন্ত্রণে এত আইন থাকার পরও বাজারে মূল্যবৃদ্ধির জোয়ার যেন থামছেই না। এমন পরিস্থিতিতে সঠিক দাম নির্ধারণে প্রয়োজন সরকারের যথাযথ আইনের প্রয়োগের।  অন্যথায় প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাবে এবং অনাহারে মৃতপ্রায় অবস্থায় বেঁচে থাকতে হবে দেশের মধ্য ও স্বল্পআয়ের জনগণদের, যা দেশের উন্নয়নের অন্তরায়। সরকারের পাশাপাশি দাম নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন ব্যবসায়ীগোষ্ঠী পালন করতে পারে কান্ডারির ভূমিকা। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে বাজারের অস্থির অবস্থা। প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম জনগণের নাগালে এলে তবেই পূরণ সম্ভব দেশের সব নাগরিকের মৌলিক চাহিদা।

n লেখক : শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়