বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও এর প্রভাবে সর্বত্রই বাড়ছে পণ্যমূল্য। বাড়ছে মূল্যস্ফীতির হার। সরবরাহজনিত সংকট না থাকলেও কাঁচামালের দামও ঊর্ধ্বমুখী। সব ধরনের শিল্পের কাঁচামাল এখনি নাগালের বাইরে। নির্মাণসামগ্রী, সংবাদপত্র, বস্ত্রশিল্প থেকে শুরু করে খাদ্যশস্য সব পণ্যের দাম রকেট গতিতে বৃদ্ধি পাওয়ায় বড় ধরনের সামাজিক অস্থিরতারও আভাস দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।
অন্য দিকে, দক্ষ কর্মী সংকটেও ভুগছে উত্পাদনমুখী খাত। করোনা-পরবর্তী অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করা মাত্রই জ্বালানির দাম বৃদ্ধিজনিত কারণে পরিবহন ব্যয়, পণ্যমূল্য ও কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি অর্থনীতিকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেছে। উন্নত, স্বল্পোন্নত কিংবা উন্নয়নশীল দেশ—কোনোটাই বাদ যাচ্ছে না দামের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা থেকে। এ থেকে উত্তরণের পথ কী—সে আলোচনাই এখন বিশ্বজুড়ে। বিশ্বব্যাংক বলেছে, মূল্যবৃদ্ধির হার মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। কোনো কোনো দেশ বিশেষত উন্নত দেশগুলো নতুন করে পুনরুদ্ধার প্যাকেজের চিন্তাও করছে।
মার্কিন প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকস্টোনের প্রধান নির্বাহী স্টিফেন সোয়ার্জম্যান সিএনএনকে বলেছেন, জ্বালানির উচ্চমূল্য সারা বিশ্বে সামাজিক অস্থিরতার সৃষ্টি করতে পারে। তার এই সতর্কবার্তা সত্ত্বেও চাহিদা এবং দাম উভয়ই বেড়ে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্রে গত সাত বছরের মধ্যে জ্বালানির দাম রেকর্ড বেড়ে ব্যারেল প্রতি ৮৫ ডলার অতিক্রম করেছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শিগিগরই মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়বে, যা রাজনীতির জন্যও বড় চ্যালেঞ্জের হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগের কমতি নেই। সহসাই কমবে না মূল্যস্ফীতি এমন আভাস দিয়ে ইউনিলিভারের প্রধান নির্বাহী এলেন জোপে বলেছেন, চলতি বছর ও আগামী বছরেও মূল্যস্ফীতির চাপে থাকতে হবে। যা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।
বিগত বছরগুলোতে কোভিডের অভিঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করার মুহূর্তে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। হঠাত্ করেই চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কাঁচামালের দাম বেড়ে গেছে। শ্রমিক সংকট মোকাবিলা করতে গিয়ে বেতনভাতা বাড়াতে হচ্ছে। বেড়ে গেছে পণ্যের পরিবহন খরচ। সর্বোপরি জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি উদীয়মান অর্থনীতিগুলোকে আরো বেশি সংকটে ফেলে দিচ্ছে। এ অবস্থায় একজন উত্পাদক পণ্যের দাম বাড়িয়েই খুচরা বাজারে ছাড়ছে। কিন্তু গ্রাহক পর্যায়ে তা সহনীয় কি না—সে বিষয়টি বিবেচনায় রাখার সুযোগ থাকছে না। যে কারণে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রাহকের নাগালের মধ্যে পণ্যমূল্য না থাকলে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টির শঙ্কা থাকেই।
পূর্বাভাস ছাড়িয়ে গেছে :বিশ্বব্যাংক
দ্রব্যমূল্যের দাম মাত্রা ছাড়িয়েছে জানিয়ে সম্প্রতি এক রিপোর্টে বিশ্বব্যাংক বলেছে, পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি হারে বেড়েছে জ্বালানিসহ নিত্যপণ্যের দাম। গত বছরের তুলনায় জ্বালানির দাম গড়ে ৮০ শতাংশ বেড়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে খাদ্যপণ্যের দাম গড়ে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরো সময় লাগবে।
প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ আয়হান কোস বলেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে শিগিগরই বিশ্বে মূল্যস্ফীতির উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি তৈরি হবে। যদি দাম বাড়তেই থাকে সেক্ষেত্রে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে চাপ আরো বাড়বে। দ্রব্যমূল্য অস্থিতিশীল থাকলে দেশগুলোর নীতি নির্ধারণে চাপ বাড়বে। প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত কমে আসা এবং সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে জ্বালানির দাম আরে বেড়ে যেতে পারে।
পুঁজি চলে যাওয়ার আশঙ্কা :আইএমএফ প্রধান অর্থনীতিবিদ
সম্প্রতি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাস প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদ গীতা গোপীনাথ বলেছেন, বর্তমান যে মূল্যস্ফীতি সেটি মূলত সরবরাহজনিত, চাহিদাজনিত নয়। সরবরাহসংকট তৈরি হওয়ার জন্য এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকলে পুঁজি চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাছাড়া মুদ্রার বিনিময় হারও কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। শ্রম আয়ের ওপর নির্ভরশীল নিম্ন আয়ের মানুষেরাও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন। এই মানুষদের ব্যয়ের বড় একটি অংশ চলে যায় খাদ্যের পেছনে।
উন্নত দেশগুলোতে রেকর্ড মূল্যস্ফীতি
উন্নত অনেক দেশেই এখন রেকর্ড মূল্যস্ফীতি লক্ষ্য করা গেছে। ১৮ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি হয়েছে কানাডায়। সেপ্টেম্বরে দেশটির ভোক্তা মূল্যসূচক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে বেড়েছে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। যা ২০০৩ সালের পর রেকর্ড বৃদ্ধি। যুক্তরাজ্যে আগস্টে মূল্যস্ফীতি গত বছরের একই সময়ের চেয়ে বেড়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশে উঠে যায়। যা ১৯৯৭ সালের পর সর্বোচ্চ। যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা মূলকসূচক গত ১৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৪ শতাংশে। যদিও এর মূল কারণ জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি।
বাংলাদেশেও বাড়ছে পণ্যমূল্য, কমছে টাকার মান
এদিকে বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়ছে। কনটেইনার সংকটের কারণে পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মাদার ভেসেল থেকে ফিডার ভেসেলে আমদানিকৃত পণ্য সরবরাহেও জটিলতা রয়েছে। পণ্য খালাসে বিলম্বের কারণে আমদানিকারককে ডেমারেজ গুনতে হয়। অভ্যন্তরীণভাবে এসব সমস্যা তো রয়েছেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী আগস্ট, সেপ্টেম্বর টানা বেড়েছে নিত্য পণ্যের দাম। সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৫৯ শতাংশে। আগস্টে ছিল ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ। জুলাইয়ে ছিল ৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ। দেশের বাজারে ভোজ্য তেলের দাম বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে। শিল্প খাতের কাঁচামাল থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের প্রায় প্রতিটিরই আন্তর্জাতিক বাজার এখন ঊর্ধ্বমুখী। বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় সার্বিকভাবে দেশের আমদানি খরচ বাড়ছে। সেই সঙ্গে ডলারের দরও হঠাত্ বেড়েছে। এতে কমছে টাকার মান। খোলা বাজারে ডলারের দাম ইতিমধ্যে ৯০ টাকা ছাড়িয়েছে।