সরকারের বিভিন্ন নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রাধান্য দিয়ে আলোচনার মাধ্যমেই তা চূড়ান্ত করা হয়। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে উপেক্ষিত থাকছে স্টেকহোল্ডাররা। সাধারণত, যে কোনো আইনের খসড়া চূড়ান্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বিভাগ, সংশ্লিষ্ট সেক্টরের প্রতিষ্ঠান/অ্যাসোসিয়েশন, শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন, ইন্ডাস্ট্রি বিশেষজ্ঞ এবং অন্য অংশীজনের (স্টেকহোল্ডার) সঙ্গে আলোচনা করা হয়। সবার আলোচনার ভিত্তিতে সর্বসম্মতিক্রমে সেই খসড়া মন্ত্রিপরিষদ সভায় অনুমোদিত হয়ে সংসদীয় কমিটিতে যায়। কমিটি অনুমোদন হয়ে গেলে তা সংসদে পাশ হয়।
বিশ্বের অনেক দেশে দেখা যায় যে, নীতিমালা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই আইন প্রণয়নকারী ব্যক্তিগণ ছাড়াও সমাজের অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ যেমন ব্যবসায়ী মহল, শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ ইত্যাদি এদের মতামত গ্রহণ করা হয়। এ প্রক্রিয়া স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা ছাড়াও একটি বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ করার ক্ষেত্রে সাহায্য করে থাকে। বাংলাদেশেও আইনের খসড়া প্রণয়নের সময় শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন এফবিসিসিআই, ইন্ডাস্ট্রি বিশেষজ্ঞ, সংশ্লিষ্ট সেক্টরের অ্যাসোসিয়েশন, মুখপাত্রদের মতামত নেওয়া হয়। কেননা, তাদের মতামত ছাড়া কোনো আইন/নীতি/বিধি গৃহীত হলে, যেমন ঐসব প্রতিষ্ঠানের ব্যাবসায়িক কার্যক্রমে অসুবিধা হতে পারে। আবার সরকারও উক্ত আইন/নীতি/বিধির সম্ভাব্য সুফল থেকে বঞ্চিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। যে কারণে নীতিনির্ধারণে প্রতিটি খাতের বিশেষজ্ঞ এবং ব্যক্তিবর্গের মতামত নিয়েই বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ‘চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য উন্নয়ন নীতিমালা ২০১৯’ চূড়ান্তকরণের সময় শিল্প মন্ত্রণালয় অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের মতামত নেওয়ার পাশাপাশি চামড়া শিল্প সংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডার যেমন চামড়া গবেষণা ইনস্টিটিউট, চামড়া শিল্পনগরী—বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন ইত্যাদি ছাড়াও বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশন যেমন এফবিসিসিআই, এমসিসিআই, ডিসিসিআইর মতামত নিয়েই খসড়া প্রণয়ন এবং আইন চূড়ান্তকরণ করা হয়েছিল। একইভাবে মূসক ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ সালে জাতীয় সংসদে পাশ হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যাবসায়িক সংগঠন/সম্প্রদায়ের মতামত না নেওয়ায় সেটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীকালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট সব ব্যাবসায়িক সম্প্রদায়/সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে আইন চূড়ান্ত করে এবং তা ২০১৯ সালে বাস্তবায়িত হয়। স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইনের ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থা বা এনজিওগুলো স্টেকহোল্ডার থাকলেও তাদের প্রাধান্যও ছিল না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, জাতীয় রাজস্ব খাতে যেসব খাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে সেসব খাতের জন্য কোনো আইন, নীতি বা বিধি গ্রহণ করার জন্য একই পন্থা অবলম্বন করা উচিত, যাতে আইনগুলো বাস্তবসম্মত হয় এবং ব্যাবসায়িক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি না করে। এই খাতগুলোর মধ্যে তামাক খাত অন্যতম। কারণ এই খাত সরকারের অভ্যন্তরীণ রাজস্বের প্রায় ১১ শতাংশ অর্জনে অবদান রাখে। উপরন্তু, তামাক শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান জড়িত। গত অর্থবছরে তামাক খাত থেকে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পেয়েছে সরকার। তাই, তামাকজাত দ্রব্যসংক্রান্ত আইন/নীতি/বিধি অন্য যে কোনো আইন/নীতি/বিধির মতো আন্তঃমন্ত্রণালয়, নীতিনির্ধারক এবং শিল্পের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশন ও প্রতিনিধিদের সমন্বয়ের মাধ্যমে হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, তামাক আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন বা সংশ্লিষ্ট অংশীজনকে বাদ রেখেই নীতির খসড়া চূড়ান্তকরণ করা হয়, যা গত পাঁচ বছর ধরে পরিলক্ষিত হচ্ছে। ২০০৫ সালে যখন তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ২০১৩ সালে যখন আইন সংশোধিত হয় ও ২০১৫ সালে যখন বিধি চূড়ান্তকরণ করা হয় তখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই তামাক খাতের সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধি ও অ্যাসোসিয়েশনের গুরুত্বপূর্ণ মতামত নিয়ে তা প্রণয়ন করে এবং পরে বাস্তবায়ন করে। কিন্তু গত পাঁচ বছর ধরে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বা বিধি-সংক্রান্ত সব সভাতেই তামাক শিল্প প্রতিনিধিদের পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয় এবং তাদের মতামত আর নেওয়া হচ্ছে না। বরং বেসরকারি কয়েকটি সংস্থাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে যারা তামাক নিবারণ নিয়ে কাজ করে থাকে। ফলে বাস্তবতার আলোকে এই আইন, নীতি কিংবা বিধি তৈরি হচ্ছে না।