ভাসানচরে ২৪ ঘণ্টা টেলিমেডিসিন সেবা দিবে ‘বেস্ট এইড’

"ফ্রি ভার্চুয়াল মেডিকেল ক্যাম্প" শিরোনামে অনলাইনে বিনামূল্যে জরুরি চিকিৎসা পরামর্শ দিচ্ছে ‘বেস্ট এইড’। স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের স্বপ্নবাজ তিন তরুণ উদ্যোক্তার প্রচেষ্টায় ও নিরলস পরিশ্রমে ‘বেস্ট এইড’ থেকে স্বাস্থ্যসেবা নিচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ এবং সারাদেশের সুবিধাবঞ্চিত হাজারও মানুষ। সেবামূলক এই প্রতিষ্ঠানটি মূলত ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহার করে ঢাকার বাইরের সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের ভার্চুয়াললি স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া হিজড়া সম্প্রদায় ও পার্বত্য অঞ্চলের মানুষদের জন্য প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ ফ্রি সেবা দিয়ে যাচ্ছে। অল্প কিছুদিনের মধ্যে রোহিঙ্গাদের সেবায় কাজ করতে যাচ্ছে ‘বেস্ট এইড’ । 

গত ২০ মার্চ থেকে "ফ্রি ভার্চুয়াল মেডিকেল ক্যাম্প" চালু করে প্রতিষ্ঠানটি। যেখানে মানুষ স্বাস্থ্যগত যেকোনো সমস্যা নিয়ে বেস্ট এইডের ফেসবুক পেইজে মেসেজ পাঠালে ডাক্তাররা তার উত্তর দিচ্ছেন। সব ধরনের স্বাস্থ্যগত সমস্যায় আলোচনা করা যাবে এই প্লাটফর্মে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের সাথে। গুরুতর কোন কিছু হলে বেস্ট এইড থেকে ফোন করে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বর্তমানে বেস্ট এইডের এই কর্মযজ্ঞের সঙ্গে জড়িত আছেন ৫৮ জন জুনিয়র এবং ৫১ জন সিনিয়র ডাক্তার।

এছাড়াও স্বল্প খরচে অ্যাম্বুলেন্স বানিয়ে ইতোমধ্যে ‘ইমাজিন ইফ বাংলাদেশ’ ফাইনালে দ্বিতীয় রানার আপ হয়েছে স্বাস্থ্যবিষয়ক বাংলাদেশি এই স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানটি। গত ৬ জুন আন্তর্জাতিক ইনোভেশন ফোরাম আয়োজিত এক্সেলেটর প্রোগ্রাম ‘ইমাজিন ইফ বাংলাদেশ’র গ্র্যান্ড ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে ডিজিটাল স্বাস্থ্যখাত নিয়ে কাজ করা স্টার্টআপ ‘বেস্ট এইড’ দ্বিতীয় রানার আপ হয়। সেখানে প্রথম স্থানে ছিল ভারতের স্টার্টআপ ‘কসকই’ এবং দ্বিতীয় রানার আপ হয় বাংলাদেশি আরেক স্টার্টআপ ‘অক্সিজেট’।

জানা গেছে, খুব শীঘ্রই আইসিটি ডিভিশনের এটুআই এর সহযোগিতায় ৫০টি ডিজিটাল তথ্যসেবা কেন্দ্রে নভেম্বর থেকে টেলিমেডিসিনের পাইলটিং করবে বেস্ট এইড। পাইলটিং এ সফল হলে ৮০০০ ডিজিটাল তথ্যসেবা কেন্দ্রে এ সেবা পাওয়া যাবে। পাশাপাশি আগামী জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশে সকল মানুষের জন্য উন্মুক্ত ডিজিটাল হেলথ রেকর্ড প্লাটফর্ম শুরু করবে প্রতিষ্ঠানটি। যেখানে মানুষ তার নিজের স্বাস্থ্যগত সকল তথ্য(রিপোর্ট, শরীরের ক্ষতের ছবি) রাখতে পারবে এবং ফেসবুকের মত আইডি পাসওয়ার্ড দিয়ে সাইন ইন করে তার তথ্য ডাক্তারকে দেখাতে পারবে। সেক্ষেত্রে আগের মত আর কষ্ট করে রিপোর্ট হাতে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে না। এছাড়াও বাংলাদেশের প্রথম কোন স্টার্টআপ হিসেবে ‘বেস্ট এইড’ ভাসানচরে কাজ করার অনুমতি পেয়েছে ত্রাণ ও শরণার্থী প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয় থেকে। প্রায় ৩০হাজার জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মায়ানমার নাগরিকদের ২৪ঘন্টা টেলিমেডিসিন সেবা দিবে বেস্ট এইড।

এ বিষয়ে ‘বেস্ট এইড’ এর প্রধান নির্বাহী পরিচালক ও প্রতিষ্ঠাতা মীর হাসিব মাহমুদ বলেন, ভাসানচরে ৪টি টেলিমেডিসিন বুথ স্থাপন হবে যেখানে স্থানীয় এজেন্টের মাধ্যমে বেস্ট এইডের ঢাকার ডাক্তার পুলের মাধ্যমে ২৪ঘন্টা টেলিমেডিসিন সার্ভিস দেয়া হবে। রোহিঙ্গারা বুথে এসে সমস্যা বললে এজেন্ট সফটওয়্যারের মাধ্যমে ডাক্তারের সাথে কনসাল্টেন্সি নিয়ে দিবে এবং কনসালটেশন শেষ হলে অটোমেটিক প্রেসক্রিপশন এজেন্টের কাছে চলে আসবে এবং সেটা প্রিন্ট করে রোগীদের দিয়ে দেয়া হবে। এছাড়াও তাদের ডাটা বেস্ট এইডের ডাটা সেন্টারে এসে জমা হয়ে থাকবে।

মীর হাসিব মাহমুদ বলেন, টেলিমেডিসিন কিন্তু বাংলাদেশে একদম নতুন। বাহিরের দেশগুলোতে টেলিমেডিসিন সেবা অনেক জনপ্রিয়। ২০১৯ সালে যখন আমারা কাজ শুরু করি কিন্তু তখন আমরা কম সাড়া পেয়েছিলাম। করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়াতে সারাদেশে যখন লকডাউন শুরু হলো তখন টেলি মেডিসিন সবচেয়ে বড় ভুমিকা পালন করেছে। আমরা লকডাউনের সময় ১৭ হাজারের বেশি মানুষকে ফ্রি সার্ভিস দিয়েছি। 

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে প্রায় ২৮-৩০ টা টেলিমেডিসিন কোম্পানি আছে। আমরা যখন শুরু করেছি মানুষ তখন টেলিমেডিসিনের উপর আস্থা রাখতে পারছিল না। এই জায়গা থেকে এখন আমরা অনেকটাই উন্নতি করেছি। আইসিটি মন্ত্রণালয়ে প্রজেক্ট আছে। এটা সরকারের একটি উদ্যোগ যা আমাদের মত যারা নতুন আছেন তাদেরকে সরকার সাহায্য করেছে। সম্প্রতি আমরা রোহিঙ্গাদের সেবা সেবা নিশ্চিত করতে কাজ শুরু করেছি। রোহিঙ্গা ইস্যু অনেক বড় ইস্যু। গত মাসের শুরু দিকে আমরা ভাসাঞ্চরে গিয়েছিলাম। আগামী ১ নভেম্বর থেকে আসা করি আমরা শুরু করবো। ভাসানচরে আমরাই প্রথম কোনো প্রাইভেট কোম্পানি যারা কাজ করার অনুমতি পেয়েছি। আমরা যা করবো তা হলো যারা ঢাকায় চিকিৎসকের পরামর্শ পেতে চান আমরা ভিডিও কলের মাধ্যমে সেই ব্যবস্থা করে দিব। এই কাজে সার্বিক সহযোগিতার জন্য সেখানে আমাদের একজন এজেন্ট থাকবে।

এছাড়াও ইতোমধ্যে কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও রংপুর এই তিন জায়গায় বেস্ট এইড এর প্রজেক্ট চালু আছে। আমরা প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতেও অনলাইনে মাধ্যমে চিকিত্সা সেবা প্রদান করে আসছি এবং সামনে করবো। যে কেউ যেকোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যার জরুরি সমাধান পেতে হটলাইনে যোগাযোগ করতে পারেন এই +৮৮০১৯২৬২২৬৬৭৭ নম্বরে অথবা ফেসবুক পেইজ https://www.facebook.com/bestaidbd/ তে। 

বেস্ট এইড কিভাবে কাজ করছে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ও সহ- প্রতিষ্ঠাতা সাদেকুল ইসলাম শাওন বলেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় ডিজিটাল প্লাটফর্ম এই বেস্ট এইড। কোনো রোগী যদি প্রাথমিকভাবে কোনো ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ নিতে চান তাহলে আমাদের দেওয়া হটলাইন নম্বরে (+৮৮০১৯২৬২২৬৬৭৭) ফোন দিয়ে জানাবে। পরে আমাদের এখান থেকে কোনো একজন ডাক্তার রোগীকে ফোন দিয়ে তার পুরো সমস্যা শুনবেন। তিনি যদি কোনো সমাধান দিয়ে দিতে পারেন তাহলে রোগীকে টাকা খরচ করে আর বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ নিতে হবে না। আর যদি জুনিয়র ডাক্তার মনে করেন তার সমস্যাটি নিয়ে সিনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে কনসালটেন্সি করা প্রয়োজন তাহলে তিনি সিনিয়র ডাক্তারের কনসালটেন্সি সময়টা রোগীকে জানিয়ে দেবেন। পরবর্তীতে রোগী এবং ডাক্তার নির্দিষ্ট সময়ে অনলাইনে থাকবেন এবং রোগীকে সঠিক পরামর্শ নেবেন। কনসালটেন্সি শেষ হওয়ার পর কনসালটেন্সি প্রেসক্রিপশন আকারে রোগীর মোবাইলে কিংবা মেইলে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

তিনি জানান, বিশেষজ্ঞ ডাক্তার যদি কোনো পরীক্ষা করাতে পরামর্শ দেন তাহলে রোগী তার নিকটতম যেকোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে পরীক্ষা করিয়ে আমাদের মাধ্যমে ডাক্তারকে দেখাতে পারবেন এবং তৎক্ষণাৎ পরামর্শ পেয়ে যাবেন। পরবর্তীতে রোগীর নিয়মিত ফলোআপ করবেন আমাদের ডাক্তাররা। যাতে করে রোগী সঠিক সেবা পেয়ে সুস্থ থাকতে পারেন। আবার ডাক্তার যদি মনে করেন এই রোগীকে সরাসরি দেখার প্রয়োজন রয়েছে তাহলে আমাদের অফিসে নির্দিষ্ট সময়ে ডাক্তার এবং রোগী দুইজনই এসে প্রাইভেট কনসালটেন্সি নিয়ে চলে যেতে পারবেন।

বেস্ট এইড এর সহকারী পরিচালক আলামিন প্রান্ত বলেন, আমরা দেশব্যাপী সকল মানুষ এর ডিজিটাল স্বাস্থ্য সারণী তৈরিতে কাজ শুরু করেছি । এর মাধ্যমে আমাদের সকল গ্রাহকের সেবা প্রাপ্তি আরও দ্রুত হবে। রোগীর সকল তথ্য আমাদের কাছে সংরক্ষিত থাকবে । এই তথ্য সারণী মাধ্যমে পরবর্তীতে ডাক্তার এর কাছে গেলে তাদের নতুন করে পূর্ববর্তী রোগের বর্ণনা দিতে হবে না। আমাদের তথ্য সারণী ব্যাবহার করে যে কোন জায়গায় তারা যে কোন ডাক্তার এর কাছে তাদের পূর্ববর্তী রেকর্ড দেখতে পারবে। এবং ভবিষ্যতে আমরা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলজেন্স এর ব্যাবহার এর মাধ্যমে এই তথ্য সারণী থেকেই কোন অঞ্চলে কোন সময়ে কোন রোগের প্রকোপ বেশী হবে তা আগের থেকেই নির্ণয় করতে পারবো । প্রতিটি মানুষকে তার ব্যক্তিগত তথ্য পর্যালোচনা করে তার দৈনন্দিন জীবন অভ্যাস এর নির্দেশনা ও দিতে পারবে আমাদের বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা।

ইত্তেফাক/ইআ