আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের ব্যবহার্য সামগ্রীর তালিকায় প্লাস্টিকের অবস্থান শীর্ষেই বলা চলে। ওজনে হালকা, ঝামেলাবিহীন ব্যবহার এবং দামে সস্তা হওয়ায় স্বল্প সময়ে এর জনপ্রিয়তা বেড়েছে বহুগুণে। বর্তমানে বিশ্ব জুড়ে ওয়ানটাইম বা একক ব্যবহার্য প্লাস্টিকের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখযোগ্যহারে। রেস্টুরেন্ট, আবাসিক হোটেল, এয়ারলাইনস, সুপারশপ, কাঁচাবাজার, দোকান, বিভিন্ন উৎসব-আয়োজনে খাবারের প্লেট থেকে শুরু করে চায়ের কাপ, জুসের স্ট্র, বিপণন থলে কিংবা বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যের মোড়ক সবকিছুতেই ব্যবহৃত হচ্ছে ওয়ানটাইম প্লাস্টিক।
বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান মতে, গত ১৫ বছরে তিন গুণের বেশি বেড়েছে প্লাস্টিকের ব্যবহার। আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ মনে হলেও, পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর প্লাস্টিকের রয়েছে মারাত্মক প্রভাব। যার মূল্য পরিশোধ করতে আমাদের ভুগতে হতে পারে শত-সহস্র বছর। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর ৩৮০ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক উৎপাদন করা হয় যার অর্ধেক একক ব্যবহার্য প্লাস্টিক। উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে একইহারে বাড়ছে তা থেকে সৃষ্ট বর্জ্যের পরিমাণ। বর্তমানে প্লাস্টিক বর্জ্য সমগ্র বিশ্বের গলার কাঁটা। ধারণা করা হয়, পৃথিবীর সব প্লাস্টিক বর্জ্য একত্র করলে উচ্চতায় তা মাউন্ট এভারেস্টকেও ছাড়িয়ে যাবে।
কার্বনের পলিমার যৌগ পলিইথিলিন, পলিস্টাইরিন, পলিপ্রপিলিন ইত্যাদি দ্বারা উৎপন্ন হয় ওয়ানটাইম প্লাস্টিক যা সাধারণত একবারের বেশি ব্যবহার করা যায় না। তবে কার্যকারিতায় একক ব্যবহার্য হলেও বৈশিষ্ট্যে এরা নন-বায়োডিগ্রেডেবল বা অপচ্য, ফলে বছরের পর বছর ধরে বর্জ্য হিসেবে অবস্থান করে পরিবেশে। সময়ের সঙ্গে পরিবেশের তাপ এবং চাপে ছোট টুকরো বা মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে মাটিতে, পানিতে, বাতাসে। এসব অপচনশীল বর্জ্য দীর্ঘদিন মাটিতে অবস্থান করায় ক্রমশ কমে আসছে মাটির জৈব উপাদানসমূহ, ফলে দূষিত হয়ে পড়ছে মাটি। যার প্রভাব পড়ছে জীবজগৎ ও পরিবেশের ওপর। নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশগত ভারসাম্য। অতিক্ষুদ্র এই কণাগুলো পানিতে মিশে পৌঁছে যাচ্ছে জলজ ও স্থলজ প্রাণীদের পরিপাকতন্ত্রে। খাদ্যচক্রের আবর্তে সেগুলো আবার প্রবেশ করছে মানব-শরীরে। প্লাস্টিকের অতিক্ষুদ্র এসব কণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ার ফলে দূষিত হচ্ছে বায়ু। শুধু পরিবেশ বিপর্যয়ই নয়, প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে ঝুঁকিতে রয়েছে জনস্বাস্থ্যও।
গবেষকরা বলছে, প্লাস্টিক কণা শরীরে প্রবেশ করার ফলে অ্যালার্জি, পাচনতন্ত্রের সমস্যা, ক্যানসার, অ্যাজমা, অটিজম, হরমোনজনিত সমস্যা, গর্ভপাত ইত্যাদি নানান রোগের সংক্রমণ বেড়েই চলেছে। এসব বর্জ্য পোড়ালে তা থেকে সৃষ্ট বিষাক্ত ধোঁয়া শরীরে প্রবেশ করে সৃষ্টি করছে ব্রংকিয়াল অ্যাজমা ও শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা। প্লাস্টিকের মধ্যে থাকে বিসফেনল নামের টক্সিক উপাদান, যা গরম খাবারের সঙ্গে মিশে নিয়মিত শরীরে ঢুকলে মহিলাদের ইস্ট্রোজেন হরমোনের কাজের স্বাভাবিকতা বিঘ্নিত হয়। এর ফলে শরীরের ক্লান্তি, মস্তিষ্কের ক্ষমতা কমে যাওয়াসহ একাধিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এছাড়া প্লাস্টিক নরম করতে ব্যবহৃত থ্যালেট ঝুঁকি বাড়ায় টাইপ-২ ডায়াবেটিসের। অস্ট্রেলিয়ার নিউ ক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা মতে—বছরে ৯ আউন্স ওজনের ১ লাখ ২০ হাজার প্লাস্টিক কণা অনবরত খাচ্ছে মানুষ। এসব প্লাস্টিক কণার উৎস পানি, চিংড়ি-কাঁকড়া-কাছিমজাতীয় মাছ ও লবণ।
আমাদের দেশে শহরাঞ্চলের বৃহত্সংখ্যক জনগোষ্ঠীই প্রতিনিয়ত অব্যবহৃত পলিথিন, শ্যাম্পু, পেস্ট, সসজাতীয় পণ্যের মিনিপ্যাক, স্ট্র, কটন বাড, বোতলের ক্যাপ, খাদ্যপণ্য মোড়ক ইত্যাদি যত্রতত্র ফেলে থাকে। এছাড়া খাদ্য ও প্রসাধনপণ্যের নানা ধরনের মিনিপ্যাক ব্যবহারের আধিক্যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে শহরের তুলনায় গ্রাম এলাকায় প্লাস্টিক বর্জ্য পাওয়া যায় বেশি। এনভায়রন্টমেন্ট সোশ্যাল ডেভলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)-এর জরিপ বলছে, বাংলাদেশে বছরে ওয়ান টাইম প্লাস্টিক থেকে সৃষ্ট বর্জ্য পরিমাণ ৮৬ হাজার ৭০৭ টন, যার ৬৩ শতাংশই আসে খাদ্যপণ্য মোড়ক থেকে। নালা বা নর্দমার মাধ্যমে এগুলো পৌঁছে যায় খাল-বিল, নদী কিংবা সমুদ্রে। বছরের পর বছর ধরে মুক্ত কিংবা বদ্ধ জলাশয়ে জমে থাকা এসব প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে হারাতে বসেছে প্রাণী-বৈচিত্র্য। হুমকির মুখে পড়ছে আমাদের মৎস্য শিল্প এবং সুনীল অর্থনীতি। ক্রমাগত পানি দূষণের ফলে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট বেড়েই চলেছে, পোড়ানো বর্জ্য থেকে উৎপন্ন গ্রিনহাউজ গ্যাস প্রতিনিয়ত বাড়াচ্ছে পরিবেশের তাপমাত্রা—যা জনস্বাস্থ্য এবং প্রাণীকুলের জন্য অশনিসংকেত।
অথচ প্লাস্টিক নির্ভরশীলতার ফলে বিশ্ব জুড়ে এর ব্যবহার বন্ধে দেখা যাচ্ছে অনীহা। ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ হওয়ার ফলে কারখানাগুলোতেও রয়েছে পুনঃ প্রক্রিয়াজাতকরণে অনাগ্রহ। বাংলাদেশে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (২০০২ সালের সংশোধিত)-এর মাধ্যমে প্লাস্টিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হলেও অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যে তা কার্যকর হয়ে ওঠেনি। অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং সৃষ্ট বর্জ্য প্লাস্টিককে পরিণত করেছে সভ্যতার অভিশাপে। প্লাস্টিক দূষণে ক্রমেই দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির দিকে এগিয়ে চলেছে মানবসভ্যতা। তাই অবিলম্বে এর ব্যবহার বন্ধে উদ্যোগী হতে হবে। প্লাস্টিক উৎপাদন, পরিবহন, বিপণনে নিষেধাজ্ঞা প্রণয়ন এবং প্লাস্টিকের বিকল্প ব্যবহারে জনগণকে উত্সাহ প্রদানের ব্যবহার অনেকাংশেই কমিয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং বৈশ্বিক সচেতনতা। পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষায় প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধে এখনই উদ্যোগী না হলে মানবসভ্যতার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
লেখক: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়