জী বনানন্দ দাশের কবিতার মধ্যে যে গভীরতা আমাদের অতলে ডুবিয়ে দেয়, তাতে মনে হতে পারে তাঁর মতো সিরিয়াস মানুষ সংসারে আর দ্বিতীয়টি নেই। কেউ বলেছেন, তিনি অন্তর্মুখী, আত্মসমাহিত। কেউ বলেছেন তিনি সংসার-পলাতক। আবার কেউ আরো এক কদম এগিয়ে বলেছেন তিনি অমিশুক, অসামাজিক। ‘নির্জনতার কবি’ উপমা দিয়ে তাঁকে আমরা নিঃসঙ্গও বানিয়ে ফেলেছি। এই কবি যেন হাসতেই জানতেন না, হাসানো তো দূরের কথা—তাঁকে কল্পনায় এমনই রাশভারী মনে করেন অনেকে। সত্যিই কি তিনি রামগরুড়ের ছানাদের মতো হাসতে জানতেন না? জীবনানন্দের রঙ্গ-রসিকতার নানা গল্প তাঁর কাছের মানুষেরা লিখে গিয়েছেন। সত্যি জীবনানন্দের হদিশ পেতে গেলে সেইসব গল্পে একটু কান পাততে হবে। কলকাতা থেকে প্রকাশিত গোপালচন্দ্র রায়-এর ‘জীবনানন্দ’ এবং দেবকুমার বসু সম্পাদিত ‘জীবনানন্দ স্মৃতি’ বই দুটি অন্য কথা বলে। সেখানকার অনেক কাহিনি বলে দেয়, জীবনানন্দ দাশ প্রকৃতপক্ষে ছিলেন অত্যন্ত সঙ্গপ্রিয় এবং আড্ডাবাজ মানুষ।
নিশ্চয়ই যে কারো সঙ্গ তিনি পছন্দ করতেন না। কিন্তু পছন্দের মানুষ পেলে তাঁর ভেতর থেকে রসের ফল্গুধারা প্রকাশ পেতে সময় লাগত না। আমরা জীবনানন্দের এসব ঘটনা পড়ে বুঝতে পারি, তিনি হাসাতে পারতেন, নিজেও হাসতে পারতেন প্রাণখুলে। এবং যে সে হাসি নয়। একেবারে লোককে চমকে দেবার মতো হাসি। যাঁরা তাঁর সঙ্গে অন্তরঙ্গভাবে মিশেছেন, তাঁরা দেখেছেন, তিনি সহজ, সরল, মিশুক, গল্পপ্রিয়, পরিহাসপটু এক সামাজিক মানুষ। পরিচিত মহলে তাঁর হাসি বিখ্যাত ছিল। তাঁর হাসিকে কেউ বলেছেন, ‘উত্কট হাসি’, কেউ বলেছেন ‘অট্টহাসি’, কেউ বলেছেন ‘মেজাজি হাসি’ ইত্যাদি। হাসির সময় জীবনানন্দ স্থানকাল ভুলে যেতেন। এই হাসির মধ্যেই ধরা পড়ত তাঁর সহজ সরল অন্তঃকরণ।
বোন সুচরিতা দাশ ‘কাছের জীবনানন্দ’-তেও লিখেছেন, কবিকে ঘিরে জনশ্রুতি কতটা ভুল। তিনি লিখেছেন, ‘জীবনানন্দ বাড়িতে এত মজার মজার কথা বলতেন যে সবাই হেসে কুটিপাটি হতো। সেসময় দাদাকে দেখলে কে বলবে, ইনিই এত গুরুগম্ভীর কবিতা লেখেন!’ মজার মজার কথা বলে অন্যকে হাসানোর স্বভাব জীবনানন্দের ছেলেবেলা থেকেই ছিল। জীবনানন্দের পথচলা ও আড্ডার সঙ্গী সুবোধ রায় লিখেছেন, কবি গল্প করতে এতটাই ভালোবাসতেন যে তাঁর বাড়িতে সন্ধেয় গল্প করতে গেলে অনেকদিনই রাত্রি একটা-দেড়টা হয়ে যেত।
জীবনানন্দের জীবনের (জন্ম ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৯, মৃত্যু ২২ অক্টোবর ১৯৫৪) শেষ চাকরি হাওড়া গার্লস কলেজে। এই কলেজেই প্রথম জীবনানন্দ পেয়েছিলেন অধ্যাপনার কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ। জীবনানন্দকে এই কলেজে ছাত্রী, শিক্ষক সবাই ভালোবেসেছিল। তিনিও কলেজকে ভালোবেসেছিলেন। পরিবেশ নিজের মনের মতো হলে তিনি নিজেকে মেলে ধরতেন। এই কলেজে জীবনানন্দের সহকর্মী অধ্যাপকরা জীবনানন্দকে বর্ণনা করেছেন ‘হাস্য-পরিহাসের অংশভাগী’ ও ‘বন্ধুবত্সল’ বলে। একদিন এক অধ্যাপকের বাড়িতে গেছেন সবার সঙ্গে। অধ্যাপক বন্ধুটি ছিলেন স্পষ্টবাদী এবং স্পষ্ট কথাটা বলতেন বেশ কড়াভাবে। সবার জন্য চা-জলখাবার এলো। জীবনানন্দ চায়ে কয়েকবার চুমুক দিয়ে বললেন, ‘চা-টা যদি আপনার কথার মতো কড়া হতো, তা হলেও উপভোগ্য হতো।’
জীবনানন্দের ছোটভাই অশোকানন্দ লিখেছেন, একদিন সকালবেলা বাইরে থেকে দৌড়ে ঘরে ঢুকে ভাইকে একজন ধনী, নামজাদা অধ্যাপকের নাম করে বললেন, ‘শিগগির আয়। দেখে যা হোস্টেলের সামনে দিয়ে কেমন সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছেন!’ নামজাদা, ধনী অধ্যাপক মশাই সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছেন শুনে অশোকানন্দ একটু অবাকই হলেন। দাদার সঙ্গে তাড়াতাড়ি বাইরে বেরিয়ে দেখেন, মলিন শার্ট পরে একজন ভদ্রলোক সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছেন, যাঁর সঙ্গে অধ্যাপক মশাইয়ের চেহারার দারুণ মিল।
জীবনানন্দের অন্তরঙ্গ বন্ধু সুবোধ রায় জানিয়েছেন, জীবনানন্দের মাথায় গজিয়ে ওঠা টাক নিয়ে কবি নিজেই মজা করতেন। জীবনানন্দের পরিচিত মূর্তির সঙ্গে এসব মিলবে না। যেমন মিলবে না, সংসারে শান্তি আনার জন্য তাঁর ভাড়াটেকে উত্খাত করার তত্পরতা। আর্থিক দুরবস্থা ঘোচাতে নিজের ফ্ল্যাটের একটা ঘরে এক মাঝবয়সি নারীকে সাবলেট হিসাবে বসিয়েছিলেন। কিন্তু অচিরেই প্রকাশ পেল ঐ নারীর স্বরূপ। তাঁর ঘরে অন্যধরনের লোকের সমাগম হতে লাগল। কবির মানসিক অশান্তি শুরু হলো। তিনি উঠেপড়ে লাগলেন নারীকে উত্খাত করতে। সাহায্যের জন্য অনেক হোমরাচোমরা ব্যক্তিরও শরণাপন্ন হলেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হলো না। একসময় গুন্ডা দিয়েও মহিলাকে উত্খাত করার কথা তিনি ভেবেছিলেন। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা কি এরপরেও জীবনানন্দকে ‘সংসার-পলাতক’ বলব? অনেকের মতে, বাড়ির এই দুশ্চিন্তাতেই ১৯৫৪ সালের সেই অভিশপ্ত ১৪ অক্টোবর ট্রামলাইন দিয়ে ডাব হাতে নিয়ে হাঁটার সময় তিনি অমন অন্যমনস্ক ছিলেন। চাপা পড়েছিলেন ট্রামের নিচে। তারপর অসহ্য শরীরীযন্ত্রণার অবসান ঘটিয়ে তাঁর মৃত্যু হয় ২২ অক্টোবর।
[কলকাতা থেকে]