রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে জনকল্যাণমূলক পরিবেশ

ইনস্টিটিউশনাল কালচার যা আমরা প্রচলিত ভাষায় সিস্টেম বলে থাকি তা একটি রাষ্ট্রের জনকল্যাণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটি প্রতিষ্ঠানে কেমন সিস্টেম বিদ্যমান তার ওপর নির্ভর করে ঐ প্রতিষ্ঠান থেকে একজন সাধারণ নাগরিক কেমন সুবিধা বা সার্ভিস পাবেন। এটি শুধু কতিপয় ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে না। ব্যক্তির মান-অভিমান আছে, সমাজ-পরিবার আছে, আবেগ আছে, রাজনৈতিক বিশ্বাস ও ধর্মীয় বিশ্বাসে ভিন্নতা থাকে। এই মান-অভিমান, আবেগ ও ব্যক্তিগত প্রভাবক অনেক সময় প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত ব্যক্তিকে তার দায়িত্ব পালনে প্রভাবিত করতে পারে। ব্যক্তির সেই সমস্ত নিয়ামক দ্বারা প্রভাবিত হয়ে জনগণ যেন কল্যাণ ও সেবাপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই কারণে প্রাতিষ্ঠানিক কালচার প্রয়োজন। আমি নিয়মনীতি বলছি না। নিয়মনীতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে যে বাস্তবিক নজির স্থাপন করা হয় সেটাই কালচার। প্রতিষ্ঠান সেটা সেবামূলক হোক, রাষ্ট্রীয় হোক কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠান হোক, তার নিজস্ব কালচার থাকতে হবে।

আইন, নিয়মনীতি থাকলে জনকল্যাণ নিশ্চিত হবে না। আইন অনুসারে সেবা দেওয়ার কালচার চর্চা করতে হবে। আইন এবং সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য আছে। সংস্কৃতি সেটাই যেটাতে মানুষ অভ্যস্ত এবং যা করতে সে ভালোবাসে ও চর্চা করে। ব্যক্তিগতভাবে অনেক ভালো ডাক্তার, আইনজীবী, পুলিশ, সাংবাদিক এবং সরকারি কর্মকর্তা পাবেন যাঁরা পেশাগত দায়িত্ব পালনে যত অপারগ তার চেয়েও বড় মনের মানুষ। ব্যক্তি হিসেবে তাঁরা অসাধারণ। কিন্তু তাঁদের এই অসাধারণত্ব তাঁরা অনেক সময় হয়তো প্রতিষ্ঠানে দেখাতে পারেন না, কিংবা দেখানোর সুযোগ নেই, অথবা দেখাতে পারলেও সেটা কম। কারণ প্রতিষ্ঠানে সেই কালচার নেই। প্রতিষ্ঠানকে তেমন কালচার চর্চা করার মতো অবস্থায় আমরা নিয়ে যেতে পারিনি। বিদ্যমান সামষ্টিক কালচারে ব্যক্তিগত কালচার চর্চা করা সম্ভব হয় না। এই কারণে মানুষ ঐ ভালো ব্যক্তি কী করছে তার চেয়েও বড় করে দেখে প্রতিষ্ঠান হিসেবে কী কালচার প্রচলিত সেটাকে এবং সেটা নিয়ে কথা বলে ও সমালোচনা করে।

প্রশ্ন হচ্ছে এই কালচার কীভাবে তৈরি হবে? কালচার তৈরির সঙ্গে আইন, পলিসি, রাজনৈতিক ইচ্ছা এবং জনগণের ইচ্ছা ও ব্যক্তিগত গুণাবলি জড়িত। সবগুলো ঠিকমতো কাজ করলে পজিটিভ কালচার তৈরি হয়। কালচার তৈরি করতে হয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। আইন করে কালচার তৈরি করা যায় না। আইন কালচার কী হবে সেটা বলে দেবে, কিন্তু এই কালচার  তৈরিতে লাগবে দৃষ্টান্ত। দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য প্রয়োজন মানসিকতা। এই মানসিকতা ভালোকে আপহোল্ড করার ও মন্দকে তিরস্কার করার মানসিকতা। সেই মানসিকতা তৈরি হয় অগ্রজদের অনুসরণ করে কিংবা প্রচলিত নিয়ম ভঙ্গের জন্য শাস্তির ভয় থেকে।

কালচার তৈরিতে সবার ত্যাগ লাগে, সব প্রতিষ্ঠানে সেরকম পলিসি লাগে এবং একইসঙ্গে সেই পলিসি যারা বানায় তাদের সততা লাগে। আপনি নিজে চুরি করে যদি আপনার অধীনস্থ কাউকে বলেন চুরি না করতে, সে হয়তো আপনার অধীনস্থতার স্বার্থে আপনার সামনে চুপ করে থাকবে। কিন্তু চুরি করা থামাবে না। সে না থামালে আপনি তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কালচারও তৈরি করতে পারবেন না। কারণ আপনি সেই কালচার নিজেই তৈরি করেননি। ভালো কালচারগুলো তৈরি করতে মানুষকে সব সময় বাধা দেয় তার ব্যক্তিগত স্বার্থ অথবা দলগত স্বার্থ অথবা স্বজনপ্রীতি। এইসব স্বার্থ থেকে বের হয়ে জনকল্যাণমূলক সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় পলিসি গ্রহণ করে তার বিস্তার ঘটানো এবং এমন সিস্টেম গড়ে তোলা যেখানে একজন খারাপ মানুষ বসালেও সে তার খারাপ দিক দেখানোর সুযোগ পাবে না। এটাই প্রাতিষ্ঠানিক কালচারের সৌন্দর্য।

ঢাকা