দীন প্রচারের জিম্মাদারি

আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারীমের সূরা ইউসুফের ১০৮নং আয়াতে বলেন, ‘হে নবী! আপনি বলুন, এটা আমার পথ। আমি জেনে বুঝে আল্লাহর দিকে ডাকি এবং আমার অনুসারীরাও। আল্লাহ পবিত্র। আমি মুশরিকদের দলভুক্ত নই।’ তিনি আরো বলেন, ‘আর তোমরা আল্লাহর পথে জিহাদ কর, যেভাবে জিহাদ করা উচিত। তিনি তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন’ (সূরা হাজ- ৭৮)। ‘আর যারা আমার পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, আমি তাদেরকে অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করব’ (সূরা আনকাবুত- ৬৯)। এছাড়া রাসূল (স) বলেন- ‘তোমরা আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত হলেও পৌঁছে দাও’ (বুখারী শরীফ)। ‘যে ব্যক্তি আমার ব্যাপারে মিথ্যা বলল, সে যেন নিজের আবাস জাহান্নামে বানিয়ে নেয়’ (বুখারী ও মুসলিম শরীফ)।

মুহতারাম ভাই, দোস্ত ও বুযুর্গ! আল্লাহ তা’আলা অনেক দয়া করে আমাদেরকে মুসলিম বানিয়েছেন। ইসলাম নামক অফুরন্ত নেয়ামত আমাদের দান করেছেন। আমাদেরকে শেষ নবীর উম্মত বানিয়ে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। এ ব্যাপারে ইরশাদ হয়েছে- ‘তোমরাই হলে শ্রেষ্ঠ জাতি। তোমাদেরকে মানুষের কল্যাণে সৃষ্টি করা হয়েছে। তোমরা সত্ কাজের আদেশ করবে এবং অসত্ কাজ থেকে নিষেধ করবে।’

হযরত মুহাম্মাদ (স) সর্বশেষ নবী ও রাসূল। তিনি সকল নবী-রাসূলের সরদার। নবী-রাসূলগণের জিম্মাদারি ছিল- মানুষকে সত্ কাজের আদেশ করা এবং অসত্ কাজ থেকে নিষেধ করা। এটা আমাদের নবীরও জিম্মাদারি ছিল। আমাদের নবী যেহেতু খাতামুন নাবিয়্যিন, তার পর দুনিয়াতে আর কোনো নবী-রাসূলের আগমন ঘটবে না, তাই এই কাজের জিম্মাদারি এ উম্মতের উপর অর্পিত। এ কাজ আমাদের প্রধান দায়িত্বভুক্ত। এই জিম্মাদারির কারণেই আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে শ্রেষ্ঠ উম্মত স্বরূপ নির্বাচন করেছেন।

মুহতারাম দোস্ত ও বুযুর্গ! আল্লাহ তা’আলা দুনিয়াতে আমাদের পাঠিয়েছেন কেবলই তাঁর ইবাদত-বন্দিগী করার জন্য। কুরআনুল কারীমে বর্ণিত- ‘আমি মানুষ ও জিন জাতিকে একমাত্র আমার ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করেছি।’ তাই আমাদের দায়িত্ব হলো মহান আল্লাহর ইবাদত করা এবং মানুষকে তাঁর ইবাদতের দিকে ডাকা- দাওয়াত দেয়া। নবী কারীম (স) এর সময়কাল থেকেই যখন কোনো মানুষ ইসলাম গ্রহণ করত, তখন সাথে সাথেই তিনি একদিকে আল্লাহর ইবাদতে লেগে যেতেন এবং অন্যদিকে তিনি মানুষের চিরমুক্তির ফিকিরে লেগে যেতেন। রাসূল (স) সাহাবায়ে কেরামকে এমন একপর্যায়ে রেখে গেছেন যে, তাঁরা সদা-সর্বদা উম্মতের ফিকিরে লিপ্ত থাকতেন।

আমাদের মহানবী মুহাম্মাদ (স) নিজে দাওয়াতের মেহনত করেছেন এবং সাহাবাগণকে এ মেহনত শিক্ষা দিয়ে গেছেন। ইসলামের শুরুর দিকে যখন নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত ইত্যাদির বিধান নাযিল হয়নি, তখন থেকেই তিনি সাহাবায়ে কেরামকে এ মেহনত শিক্ষা দিয়েছেন। অনেক পরে আল্লাহ তায়ালা মেরাজের রজনীতে নামাজের হুকুম অবতীর্ণ করেন। তাই সাহাবায়ে কেরাম মানুষকে প্রথমে ঈমানের তারপর নামাজের দাওয়াত দিতেন। মানুষ যখন আল্লাহকে চিনবে, তাঁর পরিচয় লাভ করতে পারবে, তখন তার পক্ষে ইবাদত সঠিকভাবে করা সহজ হবে।

মুহতারাম ভাই ও বুযুর্গ! উম্মত যখন থেকে এ মেহনত নিয়ে অগ্রসর হতে শুরু করেছে, তখন থেকেই মানুষের মধ্যে দীন জিন্দা হতে শুরু করেছ। এটাই নিয়ম যে, মানুষ যখন দীনের কাজকে নিজের কাজের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেবে এবং নিজের কাজ মনে করবে, তখনই দুনিয়াতে দীন প্রতিষ্ঠা লাভ করবে। আর যখন উম্মত এ কাজ থেকে দূরে সরে থাকবে, নিজের কাজ মনে করবে না, তখন দীনের মধ্যে ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখা দেবে এবং পৃথিবীময় দীন প্রতিষ্ঠা সহজ হবে না। আস্তে আস্তে দুনিয়া থেকে দীন মিটে যাবে। এ জন্য আমাদের প্রত্যেকের জিম্মাদারি হলো- নিজে এ কাজের মেহনত করা এবং অপর ভাইকে এ কাজের সাথে জড়ানোর কোশেশ করা। আল্লাহ তা’আলা ওয়াদা করেছেন- যারা এ কাজ করবে, তাদেরকে তিনি সাহায্য করবেন।

এ মেহনত করার কারণে আল্লাহ তা’আলা সাহাবায়ে কেরামের জীবনকে সুন্দর করে দিয়েছিলেন। তাদের জীবনকে পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন। ইসলাম গ্রহণের আগে তাদের জীবন ছিল অসভ্যতা, পাপাচার ও নানান অপরাধে ভরপুর। আর ইসলাম গ্রহণের পর তারাই হয়ে গেলেন গোটা বিশ্বের মানুষের জন্য আদর্শ ও মডেল।

সাহাবায়ে কেরাম রাসূল (স) এর মাকসাদ-উদ্দেশ্যকে নিজেদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বানিয়ে নিয়ে ছিলেন। যার ফলে তাদের প্রতিটি কাজ তথা ইবাদত, আখলাক, মুয়ামেলাত ও মুয়াশেরাত সর্বক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন সাধন হয়েছিল। তারা এমন জিন্দিগী গঠন করেছিলেন যে, তাদের দেখেই মানুষ দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিত।

উম্মত যখন এ কাজ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে, তখনই তাদের জীবনে অপদস্ত, অপমান নেমে এসেছে। হযরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ) নতুন করে দীনের মেহনতের কাজ শুরু করেন। তারপর ক্রমে ক্রমে এ কাজ সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। ঐ মেহনতের কারণে অনেক মানুষ হেদায়াত পাচ্ছে। অনেক মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আসছে। অনেক মসজিদ আবাদ হচ্ছে। গোটা দুনিয়ায় এ মেহনতের কারণে ব্যাপক পরিবর্তন আসছে। আসছে হেদায়াতের আলো। দূর হচ্ছে নাফরমানী। এ কাজ যখন আমরা করতে থাকব, তখন আমাদের দিলে তাওহীদের ইয়াকীন পয়দা হবে। আল্লাহ তা’আলার সিফাতের ইয়াকীন পয়দা হবে। (গত বছর ১২/০১/১৮ তারিখে বাদজুমা প্রদত্ত বিশ্ব ইজতেমার বয়ান অবলম্বনে অনুবাদ: মাওলানা হারুনুর রশীদ খান)।n