আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে যত নবী-রাসূল পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন তাঁদের সকলেরই মিশন ছিল পথভ্রষ্ট মানুষের কাছে সহজ, সরল ও প্রাঞ্জলভাবে তাদের মাতৃভাষায় ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেয়া। দাওয়াতে তাবলিগ ও ইকামাতে দীন হচ্ছে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের পথে বিশ্বমানবতাকে আহ্বান করা। দাওয়াতে তাবলিগ মানব জাতির ইহলৌকিক কল্যাণ সাধন ও পারলৌকিক সফলতার দ্বার উন্মুক্ত করে দিতে পারে। দীনি দাওয়াতি কাজ মানে শান্তির ধর্ম ইসলামের প্রকৃত মর্মবাণীর প্রচার ও প্রসারের প্রয়াস। দাওয়াতে তাবলিগের মাধ্যমেই বিশ্বব্যাপী ইসলামের ব্যাপক প্রসার ঘটে। ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তি যে হারে বেড়ে চলেছে এমন প্রেক্ষাপটে অধিক হারে দীনের দাওয়াত তথা তাওহিদ, রিসালাত, আখিরাতসহ পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধানের উপযোগী ও অপরিহার্যতা মানুষের সামনে তুলে ধরা খুব বেশি প্রয়োজন ও সময়ের দাবি। তাই দাওয়াতে তাবলিগ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত এবং এই দীনি দায়িত্ব পালন করা মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ কাজ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের প্রেরণ করা হয়েছে। তোমরা (মানুষকে) সত্কাজের আদেশ করবে এবং মন্দকাজ থেকে নিষেধ করবে।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১১০)
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে একটি ধর্মপ্রাণ জাতির সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রগতি নির্ভর করে সে জাতির ঐক্যের ওপর। অথচ মুসলিম উম্মাহ আজ অনৈক্যের বেড়াজালে শতধা বিভক্ত। এ চরম বিভক্তির সুযোগে ইসলামের প্রকাশ্য শত্রুরা মুসলমানদের ঐক্য বিনষ্ট করে ধ্বংস সাধনে অধিকতর তত্পর হয়ে উঠেছে। এই দুরাবস্থা থেকে মুক্তির জন্য দ্বীপ্ত ঈমানি চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে দীন প্রচারে মুসলিম উম্মাহর সাহসী প্রয়াস ও ইস্পাত কঠিন সুদৃঢ় ঐক্য থাকা একান্ত প্রয়োজন। এমনিভাবে নবী করিম (স)-এর সুমহান জীবনাদর্শ ও কর্মপদ্ধতির পরিপূর্ণ অনুসরণ ও অনুকরণের মাধ্যমে দীন প্রচারে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। সমাজে ইসলামী মূল্যবোধ ও নীতি-নৈতিকতার শিক্ষাগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করে তুলে ধরে সামাজিক বিশ্বাস ও মুসলিম সংস্কৃতিকে দৃঢ়তা দান করে ঐক্যের ভিত্তিকে মজবুত করতে হবে। মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে যদি পারস্পরিক ঐক্য গড়ে ওঠে তাহলে কোনো দেশ বা কোনো অপশক্তির কাছেই মুসলমানদের ধর্না দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স)-এর নিরলস প্রচেষ্টায় তাঁর সমকালীন আরবীয় সমাজ মানবতার ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব, সাম্য ও সহমর্মিতার স্বাদ লাভ করেছিল। আল্লাহ তা’আলা নবী করিম (স) কে নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘আপনি আপনার প্রভুর পথে প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে দাওয়াত দিন এবং সর্বোত্তম পন্থায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করুন।’ (সূরা আন-নাহল, আয়াত: ১২৫) মহানবী (স) তাঁর সাহাবায়ে কিরামকে উদ্দেশ্য করে ইসলাম প্রচার করার জন্য উদাত্ত কণ্ঠে আহ্বান জানিয়ে ঘোষণা করেন, ‘আমার একটি কথা হলেও তোমরা অন্যের কাছে পৌঁছাও।’ (বুুখারী)
নবী করিম (স)-এর ওফাতের পর তাঁর সুযোগ্য সাহাবিরা ইসলামের দাওয়াত মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর দীনি দাওয়াতের কর্মপদ্ধতির পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ ও অনুকরণের বড়ই অভাব বর্তমান মুসলিম সমাজে উম্মতে মুহাম্মদীর মাঝে পরিলক্ষিত হচ্ছে। এটিই মুসলমানদের অনৈক্যের অন্যতম মূল কারণ। পৃথিবীর বিভিন্ন ভূখণ্ডের বিভিন্ন পরিবেশে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্য-সংহতি না থাকার কারণে স্বভাবতই তাদের দীন প্রচারে অনুকূল-প্রতিকূল বিভিন্ন সমস্যা ও পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তাই মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার নির্দেশ প্রদান করে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে (দীন ইসলামকে) একত্র হয়ে (সুদৃঢ়ভাবে) আঁকড়ে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৩)। যেহেতু পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে মুসলমানদের ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তাই দীন প্রচারে মুসলমানদের ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ইসলামী শরিয়াহর দুটি প্রধান উত্স পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহকে সুদৃঢ়ভাবে আঁকড়িয়ে ধরা। মহানবী (স) মুসলমানদের পরস্পরের ভাই বলে উল্লেখ করে পরস্পরের মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন অটুট রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘একজন মুমিন অপর মুমিনের জন্য অট্টালিকা স্বরূপ, যার এক অংশ অন্য অংশকে সুদৃঢ় করে রাখে এবং তিনি আঙ্গুলগুলো একত্রে মিলিত করলেন।’ (বুখারী)। বর্তমানে বিরাজমান অনৈক্যের প্রেক্ষাপটে আলেম সমাজের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে আজ হাক্কানি ওলামা-মাশায়েখের দীন প্রচারে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে। তথ্য ও প্রযুক্তিতে সক্রিয় হয়ে বৈজ্ঞানিক কর্মপন্থা গ্রহণ করে দীন প্রচারে চালিয়ে যেতে হবে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা। এখনই পৃথিবীর সকল মুসলমান পারস্পরিক ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উপযুক্ত সময়। সারাবিশ্বের মুসলমান যদি এই দীন প্রচারের কাজটিকে ঐক্যবদ্ধভাবে বেছে নিয়ে ভূপৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড়েন তাহলে খেদমতে দীনের নামে যে অনৈক্য সৃষ্টি হয়েছে তা ধীরে ধীরে বিদূরিত হয়ে যাবে। পরিশেষে এটা বলা বাহুল্য যে, দীন প্রচারে মুসলমানদের ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।