আমরা জানি, ৬১০ খ্রিস্টাব্দের ২৭ রমজান রাতে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথম ওহী লাভ করেন। সেই রাতে তিনি গৃহে ফিরে এসে তার সম্মানিত স্ত্রী হযরত খাদিজা রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহার কাছে এ সম্পর্কে বললে সঙ্গে সঙ্গে ঈমান আনলেন। তারপর ঈমান আনলেন হযরত যায়দ ইবনে হারিছ (রা), তারপর ঈমান আনলেন হযরত আলী করমাল্লাহু ওয়াজহাহু। গৃহ থেকেই ঈমানের প্রচার কার্য সূচিত হলো। প্রথম ওহী নাযিলের প্রায় তিন বছর পর আল্লাহ জাল্লা শানুহু প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার করার নির্দেশ দিলেন। ইরশাদ হলো: (হে রসূল আপনি উঠুন এবং সতর্ক করুন আর আপনার রব-এর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করুন। (সূরা মুদাসসির, আয়াত ২-৩), (হে রাসূল) আপনার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করে দিন। (সূরা শু’আরা: আয়াত ২১৪)।
ইশআতে ইসলামের জন্য আল্লাহ জাল্লা শানহু যেসব নির্দেশ করেছেন, সেই মুতাবিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। ইশআতে ইসলাম বা ইসলাম প্রচার করা বলতে প্রধানত মহানবী (স) ইসলামের বাইরে লোকজনের মধ্যে প্রচার করাকে বোঝায়। আবার ইসলামের ভেতর থেকে যারা ইসলামের বিধি-নিষেধ অমান্য করে গোমারাহির মধ্য নিমজ্জিত হয়ে পথভ্রষ্টতার আবরণে নিজেদের আচ্ছন্ন করে ফেলে তাদের সংশোধন করার মধ্যেও ইশাআতে ইসলামের আবেদন অনুরণিত হয়। আর এসব কাজ যারা করবেন তাদের অবশ্যই ইসলাম সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান থাকা এবং সেই অনুযায়ী নিজের আমল আখলাক গড়ে তুলে মানুষ হতে হবে।
আমরা যদি ইসলামের ইতিহাসের দিকে নজর দেই তাহলে দেখতে পাবো প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (স) বিধর্মীদের ইসলামের দিকে আহবান করার জন্য বিভিন্ন দেশে যাদের পাঠিয়েছেন তাঁরা সবাই ছিলেন শিক্ষিত সাহাবী। বস্তুত ৬২৮ খ্রিস্টাব্দে হুদায়বিয়ার সন্ধি সম্পাদিত হলে একটি স্বস্তির হাওয়া প্রবাহিত হয় আরব ভূখণ্ডে। বহু লোক এসে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকেন। বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি দল আসতে থাকে মদীনা মনওয়ারায়। প্রিয় নবী (স) বিভিন্ন দেশের রাজা-বাদশাহেদর কাছে পত্র পাঠান। ইসলাম প্রচারের সাড়া দিকে দিকে পড়ে যায়। আরব ভূখণ্ড ছেড়ে অনেক উচ্চশিক্ষিত ও প্রিয় নবী (স)-এর নিকট থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সাহাবী সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ওপারের দেশগুলোতে যান। চীন-সুমাত্রাগামী বাণিজ্য নৌবহরে করে যাবার পথে কোনো কোনো সাহাবী বাংলাদেশের বন্দরে সাময়িক সফর বিরতি দিয়ে এখানে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেন, তাঁদের বেশ কয়েকজনের মাজার শরীফ চীনের ক্যান্টনের ম্যাসেঞ্জার মসজিদ আঙ্গিনায় আজও রয়েছে। ৬৪০ খ্রিস্টাব্দ থেকে বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে ইসলাম প্রচার শুরু হয়। এখানে ইসলাম প্রচারে ব্যাপক অবদান রাখেন পীর-আওলিয়াগণ, যাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন: হযরত বায়েজীদ বোস্তামী, হযরত শাহ্ সুলতান রুমী, হযরত শাহ সুলতান বল্খী, হযরত শাহ মখদুম রূপোশ, হযরত শাহ দৌলা হযরত বাবা আদম শহীদ, হযরত বাবা ফরীদ, হযরত আবূ তাওয়ামা, হযরত শাহ্জালাল ও তার ৩৬০ খলীফা, শাহ আলী বাগদাদী, শাহ আলাওল, নূর কুত্বুল আলম, আখি সিরাজ, মনসুর বাগদাদী, মুস্তাফা মাদানী, মুজাদ্দিদে যামান আবূ বকর সিদ্দীকী, আবদুল হামিদ বাঙ্গালী, শাহ্ নেছারুদদীন আহ্মদ, মওলানা শাহ্ আবদুল করিম, শাহ্ মোঃ আবু নঈম, শাহ্ মোঃ আবুল খায়ের, মওলানা কারামত আলী জৈনপুরী, মওলানা শাহ্ সূফী তোয়াজউদ্দীন আহমদ, মওলানা রুহুল আমীন, মওলানা আহমদ আলী ইনায়েতপুরী (যশোর), শাহ্ আবদুল মতিন (রহ) প্রমুখ। ইসলামের ব্যাপক প্রচার ও প্রসারে তাঁদের অবদান স্বীকৃত হয়েছে— যার ধারাবাহিকতা আজও রয়েছে।
ইসলাম সংসার-টংসার ছেড়ে বিবাগীর মতো ঘুরে বেড়াতে বলে না। যাঁরা ইসলাম প্রচারের জন্য যোগ্য তাঁরাই ইসলাম প্রচার করবেন— এই নিয়ম চলে আসছে প্রাথমিক কাল থেকেই। পীর-আওলিয়াদের পরিশ্রমের ফলে আজ বাংলাদেশের শতকরা ৯০ ভাগ জনগোষ্ঠী মুসলিম।