করোনা মহামারিতে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের অপরিচিত স্থানে ভ্রমণ, আবাসনের অনিশ্চয়তা ও যাত্রাকালে যানবাহনের সমস্যাসহ সব দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিতে গুচ্ছ পদ্ধতিতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী ছিল বলে মনে করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শুধু শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দুশ্চিন্তামুক্ত করার লক্ষ্যেই নয়, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ভর্তিব্যবস্থাকে সুষ্ঠু, বৈজ্ঞানিক এবং স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করতে একটি স্থায়ী গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি চালু করার স্বার্থে সমন্বিত ভর্তিব্যবস্থার বিকল্প নেই। তবে এত ইতিবাচক দিক নিয়ে চালু হওয়া গুচ্ছ পদ্ধতিতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা রীতিমতো নানা বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে। গুচ্ছ পদ্ধতির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের অভিযোগের ঝুলি দিনের পর দিন ভারী হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের এসব অভিযোগের দায় নেবে কে?
শিক্ষাবিদেরা বলেছিলেন, করোনা ভাইরাসের আতঙ্কের মধ্যে দীর্ঘ পথের ক্লান্তি, পাশাপাশি যানজটের সমস্যা থেকে শিক্ষার্থীদের মুক্তি দিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করা দরকার। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের পাশাপাশি শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট সবাই উপকৃত হবেন। অভিভাবকেরাও ‘কোচিং ছাড়া কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায় না’—এমন প্রচলিত ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন। এছাড়া কোচিং সেন্টারগুলোর বাণিজ্য বন্ধ করা সম্ভব হবে এবং আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে কোনো শিক্ষার্থীকে পিছিয়ে পড়তে হবে না। মেধা অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা কোনো এক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাবেন।
কিন্তু সম্পতি প্রকাশিত গুচ্ছ পদ্ধতিতে সমন্বিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার ‘এ’ ও ‘বি’ ইউনিটের ফল নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, গুচ্ছ পদ্ধতিতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষায় তাদের মেধার মূল্যায়ন করা হয়নি। একাধিক শিক্ষার্থী একটি প্রশ্নের উত্তর না করেও নম্বর পেয়েছেন। আবার কোনো শিক্ষার্থী ৭৫টি প্রশ্নের উত্তর করলেও দেখাচ্ছে পুরো ১০০টি প্রশ্নের উত্তর করেছেন। এদিকে ‘বি’ ইউনিটে ইংরেজিতে ৩৫টি প্রশ্ন থাকলেও কোনো কোনো শিক্ষার্থীর ফলাফলে দেখাচ্ছে তিনি ইংরেজিতে ৩৮টি উত্তর করেছেন। এছাড়া প্রত্যাশা অনুযায়ী নম্বর পাননি বলেও অভিযোগ করেছেন একাধিক শিক্ষার্থী। এর বাইরে পরীক্ষাকেন্দ্রে ঘড়ি না থাকা এবং ওএমআর শিটে দায়িত্বরত শিক্ষকের স্বাক্ষর না করার মতো অভিযোগও উঠেছে।
পরে শিক্ষার্থীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ‘বি’ ইউনিটের ফলাফল ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে নেন গুচ্ছ পদ্ধতিতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা আয়োজক কমিটির সদস্যরা এবং ভুল ফলাফল ঠিক করে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করলেও অভিযোগের সুরাহা মেলেনি বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগের বিষয়ে আয়োজক কমিটির সদস্যরা বলেছেন, অনেক শিক্ষার্থী ওএমআর পূরণ করতে ভুল করেন। অর্ধেক ভরাট বা অস্পষ্ট হলে কম্পিউটারে সেটা রিড করে না। এখানে ওএমআর সম্পূর্ণ কম্পিউটারের মাধ্যমে রিড হয়। তাই ফলাফল ভুল হওয়ার প্রশ্নই আসে না। এর পরও যারা চ্যালেঞ্জ করতে চান, বাণিজ্য অনুষদের পরীক্ষার পর একটা নোটিশ দেওয়া হবে। নির্ধারিত ফি (অফেরতযোগ্য) দিয়ে শিক্ষার্থীরা পুনরায় ফলাফল যাচাই করতে পারবেন।
করোনা মহামারিতে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গুচ্ছ পদ্ধতিতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা ছিল সময়োপযোগী পদক্ষেপ। তবে এ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নিতে সম্মতি দেয়নি দেশের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। পরে দেশের ২০টি সাধারণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একসঙ্গে গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে মত দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে করোনাকালীন শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার কথা ভেবে ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছ পদ্ধতিতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা শুরু হয়। নানা ইতিবাচক দিক নিয়ে চালু হওয়া গুচ্ছ পদ্ধতিতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষায় সৃষ্ট সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। আয়োজক কমিটির উচিত ছিল আরো সময় নিয়ে ফলাফল প্রকাশ করা। আয়োজক কমিটির অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, এ পদ্ধতি যেন কোনো শিক্ষার্থীর জীবন ধ্বংসের কারণ না হয়।
n লেখক : শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।