সেই কবে ঝিনাই নদীর পেটে গেছে সাত পুরুষের ভিটে। গুনে গুনে চল্লিশ বছর। দীর্ঘ সময়টা অটুলিই থেকেছে এবাড়ি-সেবাড়ি। এরই মধ্যে বিয়েথা। চালচুলোহীন সংসারে দুই সন্তান। হাভাত আর দুর্বিষহ অটুলি জীবন মেনে না নিয়ে স্ত্রী ভারতী একযুগ আগে সন্তানাদি নিয়ে পাড়ি জমান বাপের বাড়ি সিরাজগঞ্জে। এরপর জীবনের কঠিন লড়াইটা একাই চালাচ্ছেন চর্মকার মহেন্দ্র।
মহেন্দ্রর জন্ম গোপালপুর উপজেলার ভেঙ্গুলা চর্মকারপাড়ায়। বাবার নাম সুখচান। তবে জীবনেও সুখের নাগাল পাননি তিনি। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষে কলেরায় মারা যান সুখচান। রেখে যান এক বোঝা ঋণ, শত অনটন আর বঞ্চনা। সেই সব নিয়েই ৫৭ বছরের কঠিন জীবন পাড়ি দিচ্ছেন মহেন্দ্র। স্ত্রী চলে যাওয়ার পর মহেন্দ্রর ঠিকানা এখন স্কুলের বারান্দা বা হাটের শেড। খুব ভোরে ভেঙ্গুলা বাজারের বটতলায় জুতো সেলাই আর রং-কালির কাজ শুরু করেন। দিনে কামাই দুই-আড়াই শ টাকা। তা দিয়েই একার পেট চলে। গায়ে পুরোনো গেঞ্জি। পরণে মোটা লুঙ্গি। জীবনের একমাত্র সম্বল চামড়ার চাটাই, যেটি বিছিয়ে দিনে জুতো সেলাইয়ের কাজ করেন আর রাতে মাটিতে ছড়িয়ে ঘুমাতে যান। মহেন্দ্র জীবনভর অন্যের জুতো সেলাই ও রং-কালিতে ঝকমকে করেন, কিন্তু নিজের পা আজীবন পাদুকাশূন্যই থেকে গেছে। খালি পায়ে হাঁটাচলায় অভ্যস্ত মহেন্দ্র।
বাল্যে বাবার সঙ্গে কাঠের বাটামোয় শুকনো চামড়ার দুই ধার শক্ত করে টেনে ধরতেন। তারপর ধারালো চাকুতে চামড়া চিরে বানাতেন হাওয়াই চপ্পল, নাগরা অথবা নকশাদার বাহারি স্যান্ডেল। হাটে-বাজারে বেশ বিক্রি হতো। আগের দিনে মড়কে গৃহস্থের গরু মারা গেলে মাঠে ফেলা হতো। বাবার সঙ্গে ছুরিচাকু নিয়ে মৃত গরুর চামড়া বহুবার ছিলেছেন মহেন্দ্র। কাজটি সারতেন দ্রুত। কারণ, ছিলানোকালে অন্য চর্মকার ঐ জমিতে চাকু ঢিল দিলে অর্ধেক ভাগ দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। গরুর মড়ক নিয়ে বিড়ম্বনাও ছিল। চর্মকারের গোপন বিষে গরু মরে যায়—এমন গুজবে বহুবার আক্রান্ত হয়েছে চর্মকারপাড়া। আগুন দিয়েছে। মারধরও খেতে হয়েছে তাদের। এসব নিয়তি হিসেবেই মেনে নেন চর্মকাররা। মহেন্দ্রর বড় ছেলে সুমন ঢাকায় জুতো সেলাইয়ের কাজ করে। অপর ছেলে সুজন সিরাজগঞ্জ শহরে জুতোর কাজ রপ্ত করছে। সুমন জানায়, চর্মকারের সন্তানেরা স্কুলে পড়ালেখা করতে পারে না। তাদের অচ্ছুত্ ভাবা হয়। সামাজিকভাবে এখনো উদার পরিবেশ না গড়ায় পড়ালেখার সুযোগবঞ্চিত চর্মকারেরা নিরক্ষরই থেকে যায়। তাই জীবিকার তাগিদে চর্মকারের সন্তানেরা চর্মকার বা মুচির পেশা গ্রহণেই বাধ্য হয়। ছোট জাতের মানুষ বলে বিধির লিখন হিসেবে মেনে নেয়। মহেন্দ্রর স্ত্রী ভারতী জানান, অনটন ছাড়াও মুচিপাড়ায় পড়ালেখার কোনো পরিবেশ থাকে না। শিশুরা বাল্যেই শিক্ষা পায় তাদের জন্ম দুনিয়াকে শুচি করার জন্য। ভেঙ্গুলা চর্মকারপাড়ার রাধারাণী জানান, মুচিপাড়ায় দেশি মদ তৈরি হয়। সন্তান জন্মের পর মুখে মধুর আগে মদ দেওয়া হয়। বড় হওয়ার পর তারা মদকে পবিত্র ভাবে। পরে মদের নেশা কামাই রোজগার গ্রাস করে। সংসারে অশান্তি আনে। তবু শত শত বছর ধরে একই ধাঁচের পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক আবহ বয়ে চলেছে তারা। নৃতত্ত্ববিদ রেমন্ড ব্রুক গবেষণা থেকে জানান, চর্মকারদের পূর্বপুরুষ রবিদাস জাতপাত না মানায় বর্ণ হিন্দুদের হাতে নিহত হন। এরপর বংশধররা সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। পেশা নিয়ে উপাখ্যান, আদি যুগে ভগবান শ্রীনারায়ণ মানবসমাজকে পেশা বেছে নেওয়ার নির্দেশ দিলে সবাই বেছে নেন। কিন্তু রবিদাসরা সবার পরে এলে নির্দেশ হয় সুঁই-সুতো নিয়ে রাস্তায় চামড়া সেলাই করার। সেই থেকে তারা চর্মকার। বেসরকারি সংস্থা সেডের জরিপে সারা দেশে ৩১ হাজার ৫২৫ জন চর্মকার বাস করে। সবাই ভূমিহীন, ছিন্নমূল, বিত্তহীন। তাদের ভাষা নার্গী। কাশী, বিহার, মুঙ্গের থেকে বাংলায় আগমন। মহেন্দ্র জানান, একজন চর্মকার যখন জুতোর কাজ করেন, তখন কারো মুখে নয়, পায়ের দিকে দৃষ্টি ফেলেন। কারণ পদযুগল জুড়ে থাকা পাদুকা তাদের জন্য লক্ষ্মী। পাদুকার বরকতে আহার জোটে। তাই কেউ পা থেকে জুতো খুলে সামনে রাখলে জুতোর সদর মফস্বল ও শুকতলিতে মা লক্ষ্মীকে খুঁজে বেড়ান তারা। লক্ষ্মীর কৃপার জন্য রাতদিন জুতোয় রং পালিশে মনোনিবেশ করেন। মহেন্দ্র জানান, এ পর্যন্ত তিনি ৪০ হাজার টাকা সঞ্চয় করেছেন। আরো ৬০ হাজার টাকা দরকার। তা দিয়ে কিনবেন এক কাঠা জমি। তাতে উঠবে শণশোলার ঘর। তারপর অভিমানী স্ত্রী ভারতীকে ফিরিয়ে আনবেন সেই একচিলতে শণশোলার ঘরে। তাই রং-পালিশে সারা দিন সেই স্বপ্নের কূলকিনারা খোঁজেন চর্মকার মহেন্দ্র। গোপালপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার পারভেজ মল্লিক জানান, ঘটনা সত্যি হলে মহেন্দ্রকে প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর দেওয়া হবে।
n লেখক :কলেজ শিক্ষক ও সংবাদকর্মী।