জামিনে মুক্তি পেলো প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়া ৫ দিনমজুর

প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়ে করোনা প্রণোদনার টাকা আত্মসাৎ মামলায় কারাগারে যাওয়া কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার একই পরিবারের ৫ দিনমজুরকে জামিন দিয়েছেন চেম্বার জজ আদালত। ১৯ অক্টোবর চেম্বার জজ আদালতের বিচারপতি ওবায়দুল হাসান হাইকোর্টের দেয়া জামিন আদেশ বহাল রাখায় বৃহস্পতিবার (২৮ অক্টোবর)  বিকালে গাজীপুর কারাগার থাকা চার দিনমজুর মুক্তি পান। গত শুক্রবার (২৯ অক্টোবর) রাতে পরিবারের মাঝে ফেরেন জামিনে মুক্তি পাওয়া সেই দিনমজুররা। 

জামিন প্রাপ্তরা হলেন, প্রভাস চন্দ্র রায়, কমল চন্দ্র রায়,ফুলমনি রানী রায়, রণজিৎ কুমার ও নিখিল চন্দ্র রায়। কমল চন্দ্র রায় মামলাটিতে পলাতক ছিলেন। অন্য চারজনকে গ্রেপ্তারের পর গাজীপুর জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। তাদের সকলের বাড়ি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বড়ভিটা ইউনিয়নের নওদাসব শল্লীধরা গ্রামে। 

রবিবার (৩১ অক্টোবর) দুপুরে ঐ দিনমজুরের বাড়ীতে গিয়ে দেখা গেছে, পরিবারগুলোসহ ঐ এলাকায় এখন খুশির বন্যা বইছে। এ সময় তাদের জামিন দেওয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি মামলা নিষ্পত্তির জন্য সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন স্থানীয়রা। 

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের মাস্টাররোল কর্মচারী কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী তানভীর ইসলাম স্বপন করোনাকালীন সরকারি প্রণোদনা পাইয়ে দেয়ার কথা বলেন পাঁচ দিনমজুরকে। গত ১৬ জুন ৫ জনকে নিয়ে যান সোনালী ব্যাংকের নাগেশ্বরী শাখায়। সেখানে তাদের নামে ব্যাংক হিসাব চালু করেন। এসব দিনমজুরদের শ্রীপুরে নিয়ে গিয়ে ব্যাংকের চেক বই ও বিভিন্ন কাগজপত্রে সই ও টিপসই নেন। তাদের কাছ থেকে নিয়ে নেন ব্যাংকের সব কাগজপত্র ও চেক বই। ব্যাংক একাউন্টে প্রণোদনার টাকা পাঠানো হবে এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেন। পাঁচ দিনমজুরের নামে খোলা অ্যাকাউন্টে কিছুদিন পর ২ কোটি ৪৬ লাখ ৯ হাজার ৯৬০ টাকা চলে যায়। যার কিছুই জানতেন না তারা। কয়েকদিন পর অপরিচিত ৩-৪ জন লোক সেসব টাকা তুলে নিতে আসেন। সন্দেহ হলে শ্রীপুর হেডকোয়ার্টার শাখায় যোগাযোগ করে টাকা উত্তোলন বন্ধ করে দেয় ব্যাংকের ম্যানেজার। 

এনিয়ে চলতি বছরের ১ জুলাই শ্রীপুর থানায় ৫ দিনমজুরসহ ৯ জনের নামে একটি অর্থ আত্মসাতের মামলা করেন সোনালী ব্যাংকের শ্রীপুর প্রধান শাখার ব্যবস্থাপক রেজাউল হক। ওই মামলায় ফুলবাড়ী থানা পুলিশের সহযোগিতায় গাজীপুর পুলিশ গত ২ জুলাই চার দিনমজুরকে তাদের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে।  মামলায় পাঁচ দিনমজুরসহ আসামি করা হয় শ্রীপুর উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা বজলুর রশিদ, হিসাবরক্ষণ অফিসের অডিটর আরিফুর রহমান, মাস্টাররোল কর্মচারী তানভীর ইসলাম স্বপন ও ঢাকার উত্তরখান জামতলা এলাকার বাসিন্দা শাহেনা আক্তারকে।
 
এ নিয়ে একাধিক পত্র-পত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশিত হলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সাইফুল্লাহ আল-মামুনসহ অনেকেই অসহায় দিনমজুরদের আইনি সহায়তা দিতে এগিয়ে আসেন। তাদের জামিন আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ৬ অক্টোবর বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি মোহাম্মদ আলীর হাইকোর্ট বেঞ্চ তাদের জামিন দেয়। আদালতে জামিন আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাড. মোহাম্মদ শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত দাস গুপ্ত।

আইনী সহায়তা দেওয়া আইনজীবী অ্যাড. সাইফুল্লাহ আল মামুন জানান, ৫ দিনমজুরের জামিনের আদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করলে তাদের জামিন দেন চেম্বার জজ আদালত। গাজীপুর কারাগারে ইতোমধ্যে আদেশটি পাঠিয়ে দেয়া হলে ২৮ অক্টোবর বৃহস্পতিবার বিকালে মুক্তি পান। এই আইনজীবী আরও জানান প্রতারণার মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ঐ পাঁচ দিনমজুরের কোন টাকা-পয়সা লাগবে না। আমরা তাদেরকে সব ধরণের সহযোগিতা করবো। সেই সাথে মামলা নিষ্পত্তি জন্য মহামান্য হাইকোর্টসহ সরকারের সু-দৃষ্টি কামনা করছি।  

প্রভাষ চন্দ্র রায় ও কমল চন্দ্র রায়ের মা মালতি বেওয়া জানান, আমার দুই ছেলেসহ সবাইকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়ায় তিনি খুবেই খুশি হয়েছেন। তিনি তার ছেলেসহ সবাইকে মামলা থেকে নিষ্পত্তি চেয়ে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। 

ইত্তেফাক/ইআ