এক.
‘আকরাম তোমার ব্লেডটা দাও। আগের ব্যাচের পোলাপান বেঞ্চে একটা বর্ণ লেখার জায়গাও রাখেনি।’ আকরামের কাছ থেকে ব্লেড নিয়ে বেঞ্চ চেষে পরিষ্কার করতে করতে হুমায়ুন বলল, ‘পরিসংখ্যান পড়তে এসে আলতাফ স্যারের জন্য জীবনের পরিসংখ্যান গড়মিল হয়ে যাচ্ছে।’
‘স্যার কী আর আমাদের কষ্ট বুঝবেন। দেখা গেল এত কষ্ট করে যে বেঞ্চে লিখলাম, সেখানেই বসতে দিলেন না। পরীক্ষায় ভালো-মন্দ এখন ভাগ্য নয়, বেঞ্চের ওপর নির্ভর করে।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল আকরাম।
হুমায়ুন বলল, ‘গতবার আমার পরীক্ষা খারাপ হয়েছিল বেঞ্চের উত্তর কমন না পড়ায়। তাই এবার বেঞ্চের উপরে নিচে সবখানেই লিখে রেখেছি।’
হুমায়ুন ও আকরামের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রেজা বলল, ‘বেঞ্চ কমন পড়লে উত্তর কমন পড়ে না। আবার উত্তর কমন পড়লে বেঞ্চ কমন পড়ে না। সবই পরিসংখ্যানের গেমব্লিং থিউরির মতো বন্ধু। তারপরও লিখে রাখছি। একটু প্র্যাকটিস তো হলো।’
বেঞ্চে লেখালেখির পর্ব শেষ হওয়ার পর আলতাফ স্যার প্রশ্ন আর খাতা নিয়ে হলে ঢুকলেন। সঙ্গে একজন অফিস সহায়কও আছেন। স্যার বরাবরের মতো সবাইকে সাবধান করে বললেন, ‘ঘাড় ফেরালেই খাতা নাই হয়ে যাবে। কোনো প্রকার শব্দ করলেও খাতা নাই হয়ে যাবে।’
পরীক্ষা শেষ হতে আর মিনিট দশেক বাকি। সবাই মনোযোগ দিয়ে লিখে যাচ্ছে। কেউ কারও দিকে ঘাড় ফেরাচ্ছে না। শিক্ষার্থীদের উন্নতি হয়েছে ভেবে স্যারও বেশ খুশি। কিন্তু সমস্যা হলো শেষের দিকে। হুমায়ুন বেঞ্চের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যখন উত্তর খোঁজাখুজি করছিল, তখন তেড়ে এলেন আলতাফ স্যার।
—এই ছেলে বেঞ্চে কী খোঁজ?
—কিছু না স্যার।
—খাতা সরাও তো দেখি।
—প্লিজ স্যার। কিছু নাই।
স্যার নিজেই খাতা সরিয়ে দেখলেন বেঞ্চে লেখা।
—তুমি নকল করেছ। বেঞ্চের লেখার সাথে তোমার খাতার লেখা মিলে গেছে। গেট আউট।
হুমায়ুন কথা না বাড়িয়ে হল থেকে বের হয়ে গেল।
এই ঘটনায় আলতাফ স্যারের মনে সন্দেহ হলো। তাই অন্য বেঞ্চেও তিনি তল্লাশি চালালেন। এতে দেখতে পেলেন প্রতিটি বেঞ্চেই কোনো না কোনো প্রশ্নের উত্তর লেখা আছে। উত্তেজিত হয়ে স্যার পরীক্ষা শেষ হওয়ার পাঁচ মিনিট আগেই সবার খাতা নিয়ে নিলেন।
দুই.
‘আজ পরীক্ষা এক ঘণ্টা পরে হবে। সবাই হল থেকে বের হয়ে বাইরে অপেক্ষা কর। সময় হলে আমি ডাকব,’ আলতাফ স্যার পরীক্ষার দ্বিতীয় দিন হলে ঢুকেই শিক্ষার্থীদের বললেন।
স্যারের সঙ্গে অন্যান্য দিন একজন অফিস সহায়ক থাকলেও আজ এসেছেন দুই জন কাঠমিস্ত্রি নিয়ে।
হাসান কৌতূহল নিয়ে বলল, ‘স্যার কাঠমিস্ত্রি কেন?’
একটু পরেই বুঝতে পারবে। এখন বাইরে যাও।
সবাই হল থেকে বের হলে স্যার দরজা বন্ধ করে দিলেন। তারপর প্রায় ৪০ মিনিটের মতো বেঞ্চে ঘষামাজার শব্দ শোনা গেল। স্যার দরজা খুলে ঝাড়ুদারকে ডাকলেন। কাঠমিস্ত্রি ও ঝাড়ুদার চলে গেলে স্যার সবাইকে হলে ঢোকার অনুমতি দিলেন।
স্যার বললেন, ‘সব বেঞ্চ নতুনের মতো করা হয়েছে। কারও বেঞ্চে কলমের একটা দাগ পাওয়া গেলেই তার পরীক্ষা বাতিল।’
ওই দিন পিনপতন নীরবতার মধ্য দিয়ে পরীক্ষা সম্পন্ন হলো।
তিন.
‘তোমাদের মানা করার পরও লিখবে আমি জানতাম। তাই আজও মিস্ত্রি নিয়ে এসেছি।’ দ্বিতীয় দিনের পরীক্ষার নেওয়ার জন্য হলে ঢুকেই আলতাফ স্যার এ কথা বলে সবাইকে বের করে দিলেন।
কাঠমিস্ত্রি দুজন বেঞ্চ পরিষ্কার করে বলল, ‘স্যার আজকের পর বেঞ্চ আর চেষে পরিষ্কার করা যাবে না, কাঠ একেবারে পাতলা হয়ে গেছে।’
‘অন্য কোন ব্যবস্থা করা যায় না?’ স্যার জানতে চাইলেন।
—সব বেঞ্চে কালো রং করে দিতে পারেন। কলমের কালি আর বেঞ্চের কালি এক হয়ে যাবে।
—কিন্তু তাও তো ব্লেড দিয়ে চেষে তুলে ফেলবে ফাজিলের দলগুলো।
—তাহলে লোহার বেঞ্চ লাগবে।
মিস্ত্রিদের এ কথা শুনে স্যার বললেন, ‘গুড আইডিয়া। পরের পরীক্ষা সাত দিন পর। এরমধ্যে ব্যবস্থা করে নেব।’
আগের দিনের মতো হল পরিষ্কার শেষ হলে স্যার পরীক্ষা শুরু করলেন।
চার.
এক সপ্তাহ বিরতির পর তৃতীয় পরীক্ষা। এই সময়ের মধ্যে আলতাফ স্যার পরীক্ষা হলে আলকাতরা দেওয়া লোহার বেঞ্চের ব্যবস্থা করলেন।
হুমায়ুন হলে ঢুকে এই পরিবেশ দেখে বলল, ‘এখন কী হবে আকরাম? স্যার তো আমাদের কপালে আলকাতরা মেখে দিয়েছেন। কপালে আর পাশ জুটবে না।’
—বুদ্ধি থাকলে উপায় হয় বন্ধু। এখন থেকে দেয়ালে লিখে রাখব। তাই বসতে হবে দেয়ালের পাশের বেঞ্চে।
হুমায়ুূন বলল, ‘তাহলে আমি ডান পাশের দেয়ালের দিকে বসলাম।’
‘আমি পিছনে দেয়াল ঘেঁষা বেঞ্চে বসব,’ বলে চলে গেল আকরাম।
এই দুজনের দেখাদেখি অনেকেই পেন্সিল ও কলম দিয়ে দেয়ালে গুরুত্বপূর্ণ টপিক লিখে রাখল।
পরীক্ষা শুরু হলো। আলতাফ স্যার অনেকটা নিশ্চিন্তে গার্ড দিচ্ছিলেন। হঠাত্ তিনি খেয়াল করলেন আকরাম দেয়ালের দিকে বারবার তাকাচ্ছে।
স্যার ‘নো নো’ বলে ছুটে গেলেন।
দেয়ালের লেখা দেখে বললেন, ‘বেঞ্চের পরিবর্তে দেয়ালে লিখেছ। ইডিয়ট গেট আউট।’
আকরাম মাথা নিচু করে চলে গেল।
তারপর স্যার দেয়াল ঘেষা বেঞ্চের সবাইকে সরিয়ে অন্যত্র বসিয়ে পরীক্ষা নিলেন।
এই ঘটনার পর আলতাফ স্যার পরীক্ষা হলের দেয়াল থেকে শুরু করে ছাদ পর্যন্ত আলকাতরা লাগিয়ে দিলেন।
কার্টুন জ্যোতি