শিফারুল শেখ
ভারত শাসিত কাশ্মিরের পুলওয়ামায় গত বৃহস্পতিবারের জঙ্গি হামলায় ৪০ জনেরও বেশি কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা রক্ষী নিহত হয়েছে। এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। সামরিক হামলা তথা যুদ্ধের আশঙ্কাও করা হচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক বিরোধ খুব একটা না থাকলেও জঙ্গি ইস্যুই সংকটের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সময়কে বেছে নেয় জঙ্গিরা: পাকিস্তানভিত্তিক নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জয়শ-ই-মোহাম্মদ (জেইএম) সময় বুঝে হামলা চালায়। বিশেষ করে পাকিস্তানের পক্ষে তারা বার্তা দেয়। আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তালেবানকে আলোচনায় বসাতে পাকিস্তানের ওপর একরকম চাপ প্রয়োগ করছে ওয়াশিংটন। চলতি সপ্তাহে ইসলামাবাদে তালেবান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার আয়োজন করেছে পাকিস্তান সরকার। চলতি মাসের শেষদিকে কাতারে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা। পুলওয়ামার হামলা পাকিস্তানও বৈঠকে উত্থাপন করতে পারে। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে তাদের পদক্ষেপের কথা জানাতে পারে।
জেইএম কাশ্মিরে ভারতের নিয়ন্ত্রণ খর্ব করতে চায়। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ারে হামলার দুইমাস পর নয়াদিল্লির পার্লামেন্টে হামলা চালিয়েছিল জেইএম। ওই সময় ভারত সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বাধায় সেটা সম্ভব হয়নি। ওই সময় আফগানিস্তানে হামলার জন্য পাকিস্তানে সামরিক অবস্থান নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ভারত হামলা চালালে আফগানিস্তানে মার্কিন পদক্ষেপ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল ওয়াশিংটনের। পাকিস্তান এখন যুক্তরাষ্ট্রকে বলতে পারে, কাশ্মিরে জনগণের অসন্তুষ্টি রয়েছে ভারতের প্রতি। এটা রাজ্যের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। আর গাড়ি বোমা হামলাকারী স্থানীয় আদিল আহমেদ দার। তবে ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে গাড়ি বোমা হামলা চালিয়ে মানুষ হত্যার ঘটনা আফগানিস্তান ও ইরাকে তালেবান এবং আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির হামলার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে এমনিতে সম্পর্ক খারাপ। এর সুযোগ নিয়ে জেইএম চায় ভারত-পাকিস্তানকে যুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে। উল্লেখ্য, তালেবানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক জেইএম’র। ২০০১ সালে পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ জঙ্গি-বিরোধী অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন দেওয়ায় জেইএম পাকিস্তানের অভ্যন্তরে হামলা শুরু করে। পারভেজ মোশাররফের ওপর দুইবার হামলার ব্যর্থ চেষ্টা চালায় জেইএম। অভিযোগ আছে, এরপর পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে জেইএমকে সমর্থন দেওয়া শুরু করে।
ভারত যা করতে পারে: ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, হামলার জন্য দায়ীদের চড়া মাসুল দিতে হবে। ভারত সরকার ঐ হামলার জন্য সরাসরি পাকিস্তানকে দায়ী করছে। পাকিস্তানকে কীভাবে জবাব দেওয়া যেতে পারে তা নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে। সেই সাথে আছে জনমতের চাপ আর রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা। কিন্তু ভারতের সামনে জবাব দেওয়ার মতো বিকল্প কী কী রয়েছে? একসাথে কূটনৈতিক, সামরিক এবং অর্থনৈতিক প্রত্যাঘাতের কথা বলছেন অনেকে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যে সব বিকল্প আছে, তার কোনোটাই খুব সহজ হবে না ভারতের পক্ষে।
রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক সব্যসাচী বসু রায় চৌধুরীর মতে, পাকিস্তানের মতো পারমাণবিক শক্তিধর কোনো দেশের বিরুদ্ধে চরম কোনো পথ নেওয়া কঠিন সিদ্ধান্ত। শাসক পক্ষের ওপরে যথেষ্ট চাপ আছে বিরোধী পক্ষর থেকে যেমন, তেমনই জনমতও তৈরি হয়েছে যে এই হামলার প্রত্যাঘাত করা দরকার। সেদিক থেকে মনে হয় সামরিক বিকল্পের দিকেই ভারত ঝুঁকবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সেরকম প্রত্যাঘাত আবারও পাল্টা আঘাত টেনে আনবে কিনা! কারণ দুটোই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ।
অবসরপ্রাপ্ত সেনা প্রধান জেনারেল শঙ্কর রায় চৌধুরী মনে করেন, যেভাবে আত্মঘাতী হামলা হয়েছে, সেই একই পথে প্রত্যাঘাত করা যায় কিনা, তা গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিত ভারত সরকারের। কূটনৈতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক আর সামরিক-এই চারটে বিকল্পই আছে যেগুলো নিয়ে চর্চা হচ্ছে। কিন্তু এর বাইরে আরো একটা পদ্ধতি আছে, যেটাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে উচিত পথ বলে মনে করি-নন স্টেট অ্যাক্টর্সদের ব্যবহার করা হোক। যেভাবে পাকিস্তান থেকে আত্মঘাতী হামলা হচ্ছে, সেই একইভাবে এদিক থেকেও প্রত্যাঘাত করা হোক। শঙ্কর রায় চৌধুরী মনে করেন, সরাসরি সামরিক বাহিনী বা কোনো সরকারি এজেন্সিকে যুক্ত না করে রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে নেই এমন সব ‘এলিমেন্ট’ ব্যবহার করে শায়েস্তা করার কথা ভারতের ভাবা উচিত। যদিও এরকম কাজে পশ্চিমা দেশগুলো হয়ত ভারতকে সমর্থন করবে না, তবুও এই একটা বিকল্প নিয়ে ভাবা যেতে পারে।
অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় জঙ্গিবাদ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও নিরাপত্ত থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট অফ কনফ্লিক্ট ম্যানেজমেন্টের পরিচালক অজয় সাহনীর মতে, যেসব বিকল্প নিয়ে আলোচনা হচ্ছে সেগুলো সবই চটজলদি ব্যবস্থা। একটা হামলার প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভাবা হচ্ছে। কৌশলগত পদ্ধতি নিয়ে কারো ভাবনা নেই। হামলার ঘটনায় কীভাবে তার প্রত্যাঘাত করা হবে, সেটা নিয়ে কথা হচ্ছে। সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলা এভাবে করা যায় না। যখনই একটা বড় ধরনের হামলা হয় তখনই এসব চিন্তাভাবনা শুরু হয়। কিন্তু প্রশ্নটা হলো এর আগের হামলা আর এই হামলার মাঝের সময়টাতে কী করা হলো? সামরিক ব্যবস্থাপনা বা গোয়েন্দা ব্যবস্থায় কী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?
সাহনী আরো বলেন, গত বছর মার্চে প্রতিরক্ষা বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি রিপোর্ট দিয়েছিল যে সামরিক বাহিনীর ৬৮ ভাগ সরঞ্জাম বহু পুরানো ও সেকেলে। এমনকি পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ বাধলে ১০ দিন পর্যন্ত লড়াই করার গুলি বারুদ মজুদ রয়েছে ভারতের। যদি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না নেওয়া হয়, তাহলে এভাবেই একেকটা হামলা হবে, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা মারা যাবেন আর সবাই ভাবতে বসবে কীভাবে প্রত্যাঘাত করা যায়!