জরুরি পরীক্ষায় ট্রাম্প

তালেব রানা

 

বিরোধীদল ডেমোক্র্যাট ও নিজ দল রিপাবলিকানের ভেতরেও বিরোধিতা ছিল। কিন্তু এসবের তোয়াক্কা না করে মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের জন্য জরুরি অবস্থা জারি করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর ফলে কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে সামরিক খাতের নির্মাণ প্রকল্পের ৩৬০ কোটি ডলার, মাদকবিরোধী প্রকল্পের ২৫০ কোটি ডলার এবং ট্রেজারি বিভাগের ৬০ কোটি ডলার দেয়াল নির্মাণ প্রকল্পে বরাদ্দ দিতে পারবেন ট্রাম্প। আর এর সঙ্গে যোগ হবে কংগ্রেসের পাস করা ১৩৭ দশমিক ৫ কোটি ডলারের প্যাকেজও। সব মিলিয়ে মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণে তিনি ৮ বিলিয়ন ডলারের বরাদ্দ নিশ্চিত করতে পারছেন। যদিও সীমান্তের ২ হাজার মাইল জুড়ে দেয়াল নির্মাণের মোট খরচ ২ হাজার ৩শ’ কোটি ডলারের তুলনায় এ তহবিল অনেকটাই কম।

মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে দেয়াল নির্মাণ করা ছিল ট্রাম্পের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। এই দেয়াল নির্মাণ কাজ শুরু করতে চলতি বছর কংগ্রেসের কাছে ৫৭০ কোটি ডলারও বরাদ্দ চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা এই অর্থ দিতে রাজি হয়নি। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বিরোধী দলের এই মতভেদের জন্য গত বছরের শেষদিকে অর্থ বরাদ্দ না হওয়ায় টানা ৩৫ দিন মার্কিন কেন্দ্রীয় সরকারের একাংশ অচল ছিল। আরেক দফা অচলাবস্থা এড়াতে কংগ্রেসের সদস্যরা দেয়ালের জন্য ১৩০ কোটি ডলার বরাদ্দ দিতে সম্মত হয়। তবে এটা মানতে পারেননি তিনি। অচলাবস্থা এড়াতে বিলে সই করলেও শেষ পর্যন্ত নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন।

গত শুক্রবার হোয়াইট হাউসের রোজ গার্ডেনে ট্রাম্প জানান, মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে মাদক, অপরাধী এবং অবৈধ অভিবাসীর ঢল ঠেকিয়ে দেশকে সুরক্ষিত রাখতেই জরুরি অবস্থার আদেশে সই করেছেন। সীমান্তের পরিস্থিতিকে জাতীয় নিরাপত্তার বড় হুমকি উল্লেখ করেন তিনি। বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা এই পদক্ষেপকে ক্ষমতার সর্বোচ্চ অপব্যবহার বলে মন্তব্য করেছে। হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি এবং ডেমোক্র্যাট নেতা চার্লস শুমার যৌথ বিবৃতিতে বলেন, নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ট্রাম্প মরিয়া হয়ে উঠেছেন। দেওয়াল তৈরির অর্থ মেক্সিকোর কাছ থেকে আদায় করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু তাদের রাজি করাতে পারেননি। এখন করদাতাদের অর্থে এই সব করবেন। পেলোসি বলেন, প্রেসিডেন্ট হতাশায় ভুগছেন। আইনের পথে যা পারেননি, সেটা গায়ের জোরে করছেন। কিন্তু ট্রাম্পের দাবি, ডেমোক্র্যাটরা মিথ্যা বলছেন। তারা বলছে, প্রাচীর কাজের নয়। প্রাচীর অবশ্যই ১০০ শতাংশ কাজের। এর ফলে অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান ঠেকানো সম্ভব হবে। ট্রাম্পের ঘোষণার পরপরই হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের বিচার বিভাগীয় কমিটি জানিয়েছে, জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিষয়ে একটি তদন্ত শুরু করেছেন তারা।

মার্কিন গণমাধ্যম ইউএসএ টুডে’র এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের জরুরি অবস্থার ঘোষণা গণতন্ত্রের ওপর বড় আঘাত। দক্ষিণ সীমান্তে কোনো জরুরি পরিস্থিতি বিরাজ করছে না বরং যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো জরুরি পরিস্থিতির মুখে রয়েছে। সাধারণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় চাওয়া পূরণ না হলে প্রেসিডেন্টকে জরুরি অবস্থা জারিতে অনুমোদন দেওয়া কখনোই উচিত হবে না। এটা তার প্রেসিডেন্সি অফিসের চরম অপব্যবহার হবে এবং ভবিষ্যত্ প্রেসিডেন্টের প্রশাসনের জন্য বাজে নজির স্থাপন করবে। দলমত নির্বিশেষে সকল মার্কিন নাগরিকের উচিত এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা। বিশেষ করে রিপাবলিকানদের এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে হবে। এটা তারা না করলে পরবর্তীতে নিজেদেরকেই দোষারোপ করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় জরুরি অবস্থা আইনের একটি অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কংগ্রেস এই জরুরি অবস্থা আটকাতে পারবে। তবে সেক্ষেত্রে কংগ্রেসের উভয়কক্ষে যৌথ প্রস্তাবের অনুমোদন পেতে হবে এবং প্রেসিডেন্ট তাতে ভেটো দেবে না। হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে এখন ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। তারা ট্রাম্পের এ পদক্ষেপ আটকে দিতে প্রস্তাবনা পাসের পরিকল্পনা করছে। সিনেটেও এই প্রস্তাবনা পাস হতে পারে। কারণ রিপাবলিকান দলের অনেক সিনেটর এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প তাতে সই করবেন কিনা সেটাই বড় ব্যাপার। আর ট্রাম্প তার ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করলে তখন তা বদলাতে কংগ্রেসের দুই কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন হবে। সেটা না হলে নিশ্চিতভাবেই আইনি লড়াই শুরু হবে। ইতোমধ্যে জরুরি অবস্থা জারির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বেশ কয়েকটি মামলা হয়েছে। আরো মামলার প্রস্তুতি চলছে। যে কারণে বড় পরীক্ষার মুখে পড়তে চলেছেন ট্রাম্প। এই আইনি লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জিতবেন কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়।