এমএ আল আমিন
মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সুচি আগামী সাধারণ নির্বাচনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে পারেন বলে আভাস পাওয়া গেছে। নোবেল শান্তিজয়ী ও সাবেক গণতন্ত্রপন্থি আন্দোলনের নেত্রী সুচিকে এক সময় দেশটির অবিসংবাদিত নেত্রী মনে করা হতো। কিন্তু রাখাইনে (সাবেক আরাকান রাজ্য) সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর ওপর সেনাবাহিনীর নির্মম দমনাভিযানের সময় মুখে কুলুপ এঁটে রাখায় তার সেই ইমেজ ক্ষুণ্ন হয়েছে। তিনি যে কেবল চুপ করে ছিলেন তা নয়; বিভিন্ন সময় তিনি সেনা অভিযানকেও সমর্থন করেন।
রোহিঙ্গা ছাড়াও দেশটিতে শতাধিক সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী রয়েছে। তারাও সময় সময় সরকারি বাহিনীর অভিযানে কোণঠাসা অবস্থায় পড়েছে। সু চি কিন্তু কোনো একটি সংখ্যালঘু গ্রুপের প্রতি সহানুভূতি ব্যক্ত করেননি। এসব সমস্যার পাশাপাশি দেশটিতে সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেক ধীরগতি হয়েছে। এটিও তার জনপ্রিয়তা কমার একটি কারণ। গত নভেম্বরে অনুষ্ঠিত আঞ্চলিক নির্বাচনে সুচির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি) ১৩টি আসনের মধ্যে সাতটিতে জেতে। অথচ এ দলটিই ২০১৫ সালে হওয়া সাধারণ নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক আসনে জয়লাভ করে। যদিও সেনা ছত্রছায়ায় গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় সেনাবাহিনীর জন্য পার্লামেন্টে এক-চতুর্থাংশ আসন সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।
মিয়ানমারে আগামী বছর অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে নতুন রাজনৈতিক জোট তৈরি হচ্ছে। উদ্দেশ্য সু চির নেতৃত্বাধীন এনএলডির একচ্ছত্র প্রাধান্য খর্ব করা। উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য কাচিন থেকে নির্বাচিত এনএলডির এমপি দাসি লা সেঙ্গ বলেন, ‘জাতিগত গ্রুপগুলো একে অন্যের সঙ্গে জোট বাঁধতে শুরু করেছে। নির্বাচনে জয়লাভের জন্য আমরা আর দলের শক্তির ওপর নির্ভর করতে পারছি না, জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য আমাদের আগের চেয়ে অনেক বেশি কাজ করতে হবে।’ কাচিনে নভেম্বরের নির্বাচনে এনএলডি একটি আসন হারিয়েছে। ২০২০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আগের বারের মতোই জেতার আশা এনএলডি এখনো ছাড়েনি, কিন্তু বিশ্লেষকরা মনে করেন দলটি সম্ভবত সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। ইয়াঙ্গুনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান তাগুয়াং ইনস্টিটিউট অব পলিটিক্যাল স্টাডিজের গবেষক ইমেও হেইন বলেন, ‘সরকার গঠনের জন্য এনএলডি প্রয়োজনীয় সংখ্যক আসন পাবে কি না তা এখন এক প্রশ্ন সাপেক্ষ বিষয়। যদি তারা সেটি পেতে ব্যর্থ হয় তবে তাদের অন্যান্য ছোট দলের সঙ্গে সমঝোতা করে কোয়ালিশন গঠন করতে হবে।
এ দিকে দলের জনপ্রিয়তা যে কমতে শুরু করেছে তা সু চি নিজেও উপলব্ধি করেন। তার বিরুদ্ধে অন্যতম অভিযোগ তিনি দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা বিশেষ করে সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর অধিকারের তোয়াক্কা করেন না। অর্থনৈতিক খাতে সংস্কারের বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে, এ নিয়ে বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন। জানুয়ারিতে সু চি দেশটির বাণিজ্যিক রাজধানী ইয়াঙ্গুনের একটি স্কুলে বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজন করেন। সেখানে তিনি বলেন যে, তার দেশ একাধারে প্রাকৃতিক ও মানব সম্পদে সমৃদ্ধ। এ প্রসঙ্গে তিনি দেশটির বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করেন। তবে তার সমস্ত প্রচেষ্টা যে জান্তা রচিত সংবিধানের মধ্যে থেকেই পরিচালিত হচ্ছে, তাই সংবিধান নিয়ে তার দলের কোনো পরিকল্পনা আছে কি না সে কথা তিনি বলেননি। নির্বাচন সামনে রেখে ভোটার ও বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করার কাজ তিনি ইতোমধ্যেই শুরু করে দিয়েছেন।
তবে থেমে নেই সুচির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরাও। সু চির মিত্র ও সাবেক জান্তা সরকারের ৩ নম্বর ক্ষমতাধর ব্যক্তি শোয়ে ম্যান ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। এ দলের নাম ইউনিয়ন বেটারমেন্ট পার্টি। তিনি ২০১৫ সালে সেনা সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। তার সঙ্গে এখন মধ্যপন্থি সেনা কর্মকর্তারা জোট বাঁধছেন। সু চির বিপক্ষে আরও একজন শক্তিমান প্রতিদ্বন্দ্বীর আবির্ভাব ঘটতে যাচ্ছেন। তিনি ১৯৮৮ সালে জান্তা বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা কো কো গাই।