বে ড়া নো

রাজাহীন রাজবাড়িতে একদিন

এই নগর জীবন কখন কখন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে, তাই মাঝে মাঝে ছুটি নিতে হয়। সেই ছুটি নিয়ে গিয়েছিলাম ময়মনসিংহ শহরে ঘুরতে।

ঘুমটা ভেঙে গিয়েছিল ভ্যাপসা গরমে। দেখলাম ফ্যান বন্ধ, মানে বিদ্যুত্ নেই। অগত্যা বিছানা ছেড়ে উঠতেই হলো। একটু পর পিকু পাউরুটি, টোস্ট আর ডিম মামলেট নিয়ে উপস্থিত হলো। মনে মনে খুব খুশিই হলাম। পেটে রাম-রাবণের যুদ্ধ চলছে। পেটপূজা করার পর পিকু বলল, ‘চলো দাদা, বেরিয়ে পড়ি।’ আমাদের আজকের গন্তব্য ময়মনসিংহ শহরে অবস্থিত শশী লজ। পিকু ময়মনসিংহে নটরডেম কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। পুরো নাম স্বপ্ন দীপ মজুমদার পিকু। ময়মনসিংহ শহরের আকুয়া ওয়ারলেসের বাসিন্দা সে।

আকুয়া ওয়ারলেস থেকে তিন চাকার গাড়িতে উঠে বসলাম। এগিয়ে চলছি রেল লাইনের পাশ দিয়ে। ময়মনসিংহ জিলা স্কুল মোড় হয়ে পণ্ডিত পাড়া গলি পার হতেই চোখে পড়ল  প্রাচীন স্থাপত্যকীর্তির অনন্য নিদর্শন শশী লজ। সকাল ১০টা। শশী লজের প্রবেশ দ্বার পেরিয়ে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চললাম। দেখা হলো প্রবীণ ব্যক্তি নুরুল ইসলামের সঙ্গে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, এই শশী লজের ইতিহাস কী? তিনি জানালেন, মুক্তাগাছার জমিদার শ্রীকৃষ্ণ আচার্য চৌধুরীর তৃতীয় উত্তরপুরুষ রঘুনন্দন আচার্য চৌধুরী নিঃসন্তান ছিলেন। অথচ পিতৃতান্ত্রিক সমাজের কাঠামো অনুযায়ী সম্পত্তি সংরক্ষণে সক্ষম একটি পুত্রসন্তান খুব প্রয়োজন! কী করা যায়? জীবনের জটিল অঙ্ক কষতে কষতে দত্তক পুত্র গ্রহণের সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন তিনি। হ্যাঁ, গৌরীকান্ত আচার্য চৌধুরীকে দত্তক নিলেন রঘুনন্দন। সময়ের এক বিশেষ লগ্নে দত্তক পুত্রের হাতে জমিদারির ভার অর্পণ করে কিছুদিনের মধ্যেই তিনি পাড়ি জমালেন পরপারে। জমিদার গৌরীকান্ত আচার্য চৌধুরীর প্রতিও সদয় ছিল না নিয়তি! সন্তানহীন অবস্থায় অকাল প্রয়াণ ঘটল তারও। গৌরীকান্তের বিধবা পত্নী বিমলা দেবী দত্তক নিলেন কাশীকান্তকে। কাশীকান্তের কপালও মন্দ ছিল! দীর্ঘ রোগযন্ত্রণায় ভুগে সন্তানহীন অবস্থায় পরলোক গমন করলেন তিনিও! তার বিধবা পত্নী লক্ষ্মী দেবী আচার্য চৌধুরাণী পূর্বসূরিদের পথ অনুসরণ করে দত্তক নিলেন চন্দ্রকান্তকে। ভাগ্যের বিরুদ্ধাচারণে চন্দ্রকান্তও অতিদ্রুত ত্যাগ করলেন পৃথিবীর মায়া। তবে হাল ছাড়লেন না লক্ষ্মী দেবী। পুনরায় দত্তক নিলেন তিনি। দ্বিতীয় দত্তক পুত্রের পূর্বনাম পূর্ণচন্দ্র মজুমদার। কুলগুরুর সামনে মহাসমারোহে লক্ষ্মী দেবী নতুন নাম রাখলেন পুত্রের—সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী! সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরীর শাসনামলে ব্রহ্মপুত্র তীরবর্তী জনপদে যুক্ত হলো সোনালি মাত্রা। প্রায় একচল্লিশ বছর জমিদারি পরিচালনার প্রশস্ত প্রেক্ষাপটে বহু জনহিতকর কাজ করলেন তিনি। ময়মনসিংহে স্থাপন করলেন একাধিক নান্দনিক স্থাপনা। ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে ময়মনসিংহ শহরের কেন্দ্রস্থলে নয় একর ভূমির ওপর একটি অসাধারণ দ্বিতল ভবন নির্মাণ করলেন সূর্যকান্ত। নিঃসন্তান সূর্যকান্তের দত্তকপুত্র শশীকান্ত আচার্য চৌধুরীর নামে এই ভবনের নাম রাখা হলো শশী লজ।

প্রবেশপথের সামনেই শশী লজের সাজানো বাগান। বিচিত্র প্রজাতির ফুল শোভিত সেই বাগানের মধ্যভাগে বৃত্তাকার জলফোয়ারা। ফোয়ারার কেন্দ্রস্থলে অনুচ্চ বেদির ওপর দণ্ডায়মান গ্রিক স্থাপত্য রীতিতে নির্মিত স্বল্পবসনা নারীর মর্মর মূর্তি। বাগানের ঠিক পিছনেই লালচে ইট আর হলুদ দেয়ালে নির্মিত শশী লজ। আমরা ধীর পায়ে এগিয়ে চলেছি আর একের পর এক ছবি তুলে যাচ্ছি। এরমধ্যে আলাপ চলছে নুরুল ইসলামের সঙ্গে। তার কাছে আরও জানা গেল, ১৮৯৭ সালের ১২ জুন ভূমিকম্পে ভবনটি বিধ্বস্ত হয়। ১৯০৫ সালে একই জায়গায় পরবর্তী জমিদার শশীকান্ত আবার ভবন তৈরি করেন। ভবনের মূল ফটকে আছে ১৬টি গম্বুজ। ভিতরের প্রায় ৩৬টি ঘরের প্রতিটিতেই ছাদ থেকে ঝুলছে ঝাড়বাতি। ভবনের ভিতরে আছে মার্বেল পাথরের ফোয়ারা। দুষ্প্রাপ্য নাগলিঙ্গমগাছ ছিল, যা তখন হাতির খাবার হিসেবে ব্যবহূত হতো। ভবনের পিছন দিকে রয়েছে গোসলের জন্য দোতলা গোসলখানা। ধারণা করা হয়, এখানে বসেই রানি পাশের পুকুরে ভেসে বেড়ানো হাঁসের খেলা দেখতেন। পুকুর ঘাটটি ছিল মার্বেল পাথরের। ভবনের সামনে বাগানের মাঝখানে আরেকটি শ্বেতপাথরের ফোয়ারা। সুপ্রাচীন এই ভবনের পূর্বপ্রান্তের ঘরটি বর্তমানে ব্যবহূত হচ্ছে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষের কার্যালয় হিসেবে। বারান্দা অতিক্রম করে কয়েক ধাপ সিঁড়ি পেরোলেই রঙ্গালয়। সুদৃশ্য সেই রঙ্গালয়ের একপ্রান্তে বিশ্রামঘর। বিশ্রামঘরের পর কাঠের মেঝেযুক্ত হলঘর। হলঘরের পাশেই বর্ণিল মার্বেল পাথরে নির্মিত আরেকটি জলফোয়ারা। জলফোয়ারার ঠিক ওপরে ছাদ থেকে ঝোলানো স্ফটিকস্বচ্ছ কাচের ঝাড়বাতি। ভবনের কিছু দরজা-জানালা খোলা। তা দেখে মনে হতে পারে ভিতরে এখনো জমিদারের বসবাস। তবে ভবনে প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই। তালা দেওয়া। আনসার ভাইদের অনেক অনুরোধের পর তাদের সঙ্গে ভিতরে ঢোকার সুযোগ মিলল। বেশ কয়েকটি ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে ময়লা-আবর্জনা, সাথে ভ্যাপসা একটা গন্ধ। জানা গেল, চারজন শ্রমিক পুরো বাড়ি দেখাশোনার কাজ করছেন। তাদের কাজ বাড়িটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা। ৩৬টি ঘরের মধ্যে ৪টি ঘরে কাজ চলছে। কারুকাজ করা বাড়ির দরজা-জানালাগুলোর বেশির ভাগই ভেঙে গেছে। ভাঙা ঝাড়বাতির আর কোনো জৌলুস নেই। হলঘরের কাঠের পাটাতন বানানোর জন্য আবার কাঠ এনে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। ভবনের ছাদ থেকে পানি পড়ে। জমিদার আমলের দু-একটি সিন্দুক এখনো সেখানে পড়ে আছে। লাল ইট আর হলুদ দেয়ালে নির্মিত শশীলজের পাশেই আছে পদ্মবাগান। বাড়িটিতে বেশ কিছু স্নানঘর রয়েছে। একটি স্নানঘরে রয়েছে একটি সুড়ঙ্গ। ধারণা করা হয় এই সুড়ঙ্গপথেই গোপনে মুক্তাগাছা যাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। উল্লেখ্য, মুক্তাগাছার জমিদার বাড়িতেও এই রকম একটি সুড়ঙ্গপথ পাওয়া যায়। এছাড়া আরও কয়েকটি কক্ষের সঙ্গে পরিচয় হলো আমাদের। পরিচর্যাহীন, ধুলোমলিন সেই কক্ষগুলোর কোনোটি তালাবদ্ধ, কোনোটি নানা রকম অপ্রীতিকর আসবাবপত্রে ঠাসা। ভবনটির পিছনে একচিলতে উঠান। সবুজ ঘাসের আঁচল পাতা সেই উঠান পেরোলে একটি অপরিসর জলাশয়। জলাশয়ের পূর্ব ও পশ্চিম পাড়ে দুটি জরাজীর্ণ ঘাট থাকলেও দক্ষিণপ্রান্তে অবস্থিত দ্বিতল স্নানঘাটটির সৌন্দর্য সত্যিকার অর্থেই অসাধারণ। আমার ভ্রমণসঙ্গী পিকু জানাল, শশীলজেই ধারণ করা হয়েছিল হুমায়ূন আহমেদ রচিত ও পরিচালিত বিখ্যাত ধারাবাহিক নাটক ‘অয়োময়’-এর পর্বগুলো। যা বিটিভিতে প্রচারিত হয়েছিল। নাটকে এটি ছিল জমিদারের বাড়ি। মূলত এই নাটকের পরিচিতির পরেই স্থানীয়দের কাছে বাড়িটি ‘জমিদারবাড়ি’ হিসেবে পরিচিতি পায়। এছাড়া ‘রাখাল বন্ধু’ নামে আরেকটি ধারাবাহিক নাটকের শুটিংও এই বাড়িতে হয়েছিল। দেখতে দেখতে আমাদের বিদায় নেওয়ার পালা চলে এলো। আমরা ফিরে চললাম আমাদের গন্তব্যে। 

কিভাবে যাবেন

ঢাকার মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে ভোর ৫টা থেকে প্রতি আধা ঘণ্টা পরপর ময়মনসিংহের উদ্দেশে সৌখিন, এনা, নিরাপদ বাস ছাড়ে। টিকিটের মূল্য ২২০ টাকা। সময় লাগবে ২ ঘণ্টা অথবা সকাল ৭টা ৩০ মিনিটের তিস্তা এক্সপ্রেস করে ময়মনসিংহে ঘুরে আবার ৫টা ২০ মিনিটের ট্রেনে ফিরে যেতে পারেন ঢাকাতে। ট্রেনের ভাড়া ১২০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা। এর পর মাসকান্দা বাস টার্মিনাল অথবা স্টেশন হতে রিকশা, অটোরিকশা যোগে যাওয়া যায় অথবা ব্রিজ হতে রিকশা, অটোরিকশা, টেম্পু যোগে যাওয়া যায় শশী লজে। বলে রাখা ভালো, শশী লজ রবিবার পূর্ণ দিবস ও সোমবার অর্ধ দিবস বন্ধ থাকে।