লঙ্কাকাণ্ড

 

আক্ষরিক অর্থে ‘লঙ্কাকাণ্ড’ ঘটে গেছে শ্রীলঙ্কার পার্লামেন্টে। প্রেসিডেন্ট সিরিসেনার নিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী রাজাপাকসের বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোট গ্রহণ নিয়ে পার্লামেন্টের ভেতরেই পরপর দুই দিন দুই পক্ষের এমপিদের মধ্যে নজিরবিহীন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পার্লামেন্টের ভেতর পুলিশ পর্যন্ত প্রবেশ করতে হয়েছে।

প্রথম সংঘর্ষ হয় বৃহস্পতিবার। এর আগেরদিন অনাস্থা ভোটে হেরে যান প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে। প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোটের একদিন পর বৃহস্পতিবার হাতাহাতি হয়। সংসদের বাইরেও বিরাজ করছিল যুদ্ধাবস্থা। শুধু কণ্ঠ ভোটের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনাস্থা জানিয়ে ক্ষমতাচ্যুত করার অধিকার স্পিকারের নেই বলে শ্রীলঙ্কার বিতর্কিত প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে দাবি করার পর লঙ্কাকাণ্ড ঘটে যায় পার্লামেন্টে। তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা হাতাহাতি, কিল-ঘুষি ও বোতল ছোড়াছুড়িতে জড়িয়ে পড়েন।

বৃহস্পতিবার পার্লামেন্ট অধিবেশন শুরুর পর স্পিকার কারু জয়াসুরিয়া বলেন, দেশে বর্তমানে কোনো সরকার নেই। কোনো প্রধানমন্ত্রীও নেই সেটা রাজাপাকসে অথবা তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী যিনিই হোন না কেন। স্পিকারের এই মন্তব্যের বিরোধিতা করে রাজাপাকসে বলেন, দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত ছিল। এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় শুধু কণ্ঠভোটে পাস হওয়া উচিত নয়। তিনি বলেন, দেশের প্রধানমন্ত্রী অথবা মন্ত্রিসভার সদস্য নিয়োগ অথবা ক্ষমতাচ্যুত করার ক্ষমতা স্পিকারের নেই। বুধবার দেশটির পার্লামেন্টে ২২৫ সংসদ সদস্যের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠরা তার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রকাশ করে।

প্রধানমন্ত্রী রাজাপাকসের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত ওই অনাস্থা ভোট মেনে নিতে রাজি নন প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা। স্পিকারের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে সিরিসেনা জানিয়েছেন, সংবিধান ও পার্লামেন্টের রীতিনীতি উপেক্ষা করে পার্লামেন্টে ওই অনাস্থা ভোটের আয়োজন করা হয়েছে। তিনি এটি মেনে নেবেন না।

স্পিকারের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আনেন রাজাপাকসে। তিনি বলেন, স্পিকার তার রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টির প্রতিনিধিত্ব করছেন। ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টির নেতৃত্বে রয়েছেন দেশটির ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমা সিংহে। সংকট নিরসনে নির্বাচনই সর্বোত্তম উপায় উল্লেখ করে দেশটিতে নতুন নির্বাচনের ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান রাজাপাকসে। তার এই আহ্বানের পর বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা পার্লামেন্টে ভোটাভুটির দাবি জানালে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। রাজাপাকসের দলের সংসদ সদস্যরা অনেকে স্পিকারকে গালাগালি করে তার দিকে তেড়ে যান।

ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টির সংসদ সদস্যরাও এসময় মারমুখী হয়ে এগিয়ে আসেন। শুরু হয় সরকারি ও বিরোধী দলীয় প্রায় ৩ ডজন সংসদ সদস্যের মল্লযুদ্ধ! রাজাপাকসের পক্ষের সদস্যরা স্পিকার জয়াসুরিয়াকে লক্ষ্য করে পানির বোতল, বই ও ক্যান ছুড়ে মারেন। তবে ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টির সদস্যরা ঘিরে রাখায় কোনো ধরনের আঘাত পাননি স্পিকার। পরে সংসদ অধিবেশন মূলতবি ঘোষণা করেন জয়াসুরিয়া।

প্রথমদিন হাতাহাতির পরদিনও ব্যাপক মারামারির ঘটনা ঘটেছে। এবার সে দেশের পার্লামেন্টে সদস্যরা পরস্পরের ওপর মরিচের গুঁড়া এবং চেয়ার ছুড়ে মারেন বলে জানা গেছে। মারামারিতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পার্লামেন্টে পুলিশ প্রবেশের নজিরবিহীন ঘটনাও ঘটেছে। বিশ্বের বিভিন্ন পার্লামেন্টে দুই পক্ষের সদস্যদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা নতুন নয়। তবে সংসদ সদস্যদের মধ্যে মরিচের গুঁড়া ছুড়ে মারার ঘটনাটি অভিনব। শুক্রবার পার্লামেন্টে অধিবেশনের শুরুতেই নব নিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী রাজাপাকসেকে নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়। তখন দুই দলের সদস্যরা পরস্পরের দিকে মরিচের গুঁড়া ছুড়েন। এসময় অনেক সদস্যকে চোখ ডলতে দেখা যায়।

একপর্যায়ে তারা আছাড় মেরে সংসদের চেয়ার ও টেবিল ভেঙে ফেলতে শুরু করেন। এরপর তারা চেয়ার-টেবিলের ভাঙা অংশগুলো লাঠি হিসেবে ব্যবহার করে পরস্পরের বিরুদ্ধে মারামারিতে লিপ্ত হন। এমনকি পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করেও চেয়ার ছুড়ে মারতে দেখা যায়। এই পরিস্থিতে ফের কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ ছাড়াই শেষ হয় অধিবেশন। অধিবেশন আগামী ১৯ তারিখ পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করে পুলিশের সহায়তায় কক্ষ ত্যাগ করেন স্পিকার কারু জয়াসুরিয়া।

গত ২৬ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা রনিল বিক্রমা সিংহেকে সরিয়ে প্রধানমন্ত্রী পদে রাজাপাকসেকে বসিয়ে দেওয়ার পর শ্রীলঙ্কায় গভীর রাজনৈতিক সংকট শুরু হয়। প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা সংসদ ভেঙে আগামী ৫ জানুয়ারি আগাম নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তার এই ঘোষণার পর শ্রীলঙ্কার তিনটি রাজনৈতিক দল প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেছিলেন। সংসদ ভেঙে দিয়ে আগাম নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্টের নেওয়া সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট।