এমনিতেই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগে আমাদের জীবন বিপর্যস্ত, সে সময়ে এ আবার কী শোনালেন বিজ্ঞানীরা! তারা বলছেন, সাগরতলের বড় বড় ফাটল দিয়ে বিপুল পরিমাণ পানি চলে যাচ্ছে পৃথিবীর অভ্যন্তরে। বলতে পারেন, পানি তো ভূগর্ভে যেতেই পারে, সেটা তো একেবারে চলে যাচ্ছে না, সাগরের সাথে তো তার সংযোগ থাকছেই। কিন্তু মুশকিল হলো, সাগর তলের জমিনের বড় বড় ফাটলগুলো টেকটোনিক প্লেটের ধার ঘেঁষে অবস্থিত এবং যখনই ভূমিকম্পের সময় প্লেটগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ হয় তখন ফাটল দিয়ে অতিরিক্ত পরিমাণ পানি ভূগর্ভের কয়েক মাইল গভীরে চলে যায়। শুধু তাই নয়, উপরের ফাটল বুঁজে যাওয়ার কারণে সেই পানি আর সাগরে ফিরে যেতে পারে না, তা ভূগর্ভেই থেকে যায়। এর মধ্যে কিছু পানি আগ্নেয়গিরির অগ্নুত্পাতের সময় বাষ্প আকারে বেরিয়ে আসে আর বাকি পানি পাথরের সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ‘ভেজা পাথরে’ পরিণত হয়ে ভূগর্ভেই অবস্থান নেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডগলাস ওয়েনস ও তার সহযোগীরা গত কয়েক বছর ধরে প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত মারিয়ানা ট্রেঞ্চে পানি শোষণ নিয়ে গবেষণা চালিয়ে আসছেন। তারা দেখেছেন পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর (প্রায় ৭ মাইল) এই ফাটল দিয়ে বিপুল পরিমাণ পানি ভূগর্ভে চলে যাচ্ছে এবং এই পানি শোষণের মাত্রা আগের হিসাবের চেয়ে অন্তত তিনগুণ বেশি। আর এই পানির একটি বড় অংশ ‘ভেজা পাথরে’ পরিণত হয়ে ক্রমাগত ভূগর্ভের অনেক গভীরে চলে যাচ্ছে। গবেষণায় ভূগর্ভের প্রায় ২০ মাইল গভীরেও এই ভেজা পাথরের জমিনের সন্ধান মিলেছে। অধ্যাপক ডগলাসের মতে, মারিয়ানা ট্রেঞ্চেই যে সবচেয়ে বেশি পানি শোষিত হচ্ছে, এমনটি নাও হতে পারে, টোঙ্গা ট্রেঞ্চসহ অন্যান্য ট্রেঞ্চ দিয়ে আরও অনেক বেশি পানি ভূগর্ভে চলে যাচ্ছে। মারিয়ানা ট্রেঞ্চে অধ্যাপক ডগলাস ও তার সহযোগীদের গবেষণা রিপোর্ট সম্প্রতি বিজ্ঞান সাময়িকী ‘ন্যাচার’-এ প্রকাশিত হয়েছে।
উল্লেখ্য, ভূপৃষ্ঠের পানি সাগরতলের ফাটল দিয়ে ভূগর্ভে চলে যাওয়া ও পরে আগ্নেয়গিরির মাধ্যমে বাষ্পাকারে পানি বেরিয়ে আসার এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াটি কোটি কোটি বছর ধরেই চলে আসছে। বিজ্ঞানীরা এটাও বলছেন যে, বিগত ৫৫০ মিলিয়ন বছরেও সাগরের পানি কমেনি। অর্থাত্, আগ্নেয়গিরির মাধ্যমে বাষ্পাকারে অনেক বেশি পানি বেরিয়ে আসছে। বিজ্ঞানীদের মূল চিন্তার বিষয় হলো, তাদের হিসাবে ধরণী এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পানি শুষে নিচ্ছে, কিন্তু সে পরিমাণ পানি কি বাষ্পাকারে বেরিয়ে আসছে? আর দীর্ঘ মেয়াদে ভূপৃষ্ঠের পানি যদি কমে যায়, তাহলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে এবং তা জীবজগতের জন্য কল্যাণকর নাও হতে পারে। গত বছরের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ভূগর্ভে ভূপৃষ্ঠের সমপরিমাণ পানি রয়েছে। এই ভারসাম্যটা বজায় থাকুক- শ্রষ্টার কাছে এই প্রার্থনা করা ছাড়া আমাদের আর করার কিই বা আছে। - সূত্র : নিউজউইক