চীনের প্রভাব বলয় থেকে মুক্ত হবে মালদ্বীপ?

 

২০১৩ সালের নির্বাচনে তত্কালীন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদকে হারিয়ে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন প্রোগ্রেসিভ পার্টি মালদ্বীপসের (পিপিএম) নেতা আবদুল্লা ইয়ামিন। নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে নিজের ক্ষমতার চূড়ান্ত দিকগুলো উন্মোচন করতে থাকেন ইয়ামিন। ক্ষমতায় থাকাকালে ভারতকে পাশ কাটিয়ে চীনের সাথে উচ্চাকাঙ্ক্ষী এক সম্পর্কের বন্ধন গড়ায় মনোযোগী হয়ে ওঠেন আব্দুল্লা ইয়ামিন। চীন-মালদ্বীপ অর্থনৈতিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করতে গত কয়েক বছর ধরে চীনের সাথে ঐতিহাসিক সব চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছেন প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন। চীনের সাথে মালদ্বীপের দহরম-মহরম সম্পর্ক শুধু প্রতিবেশি দেশগুলোর চোখেই বাঁকা লাগেনি সাধারণ জনগণকেও যে খুশি করতে পারেনি তা প্রকাশ পেয়েছে সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মালদ্বীপের রাজনৈতিক অবস্থার সংস্কার দাবি করে আসা এমডিপির নেতা ইব্রাহিম মোহামেদ সোলিহর কাছে পরাজিত হয়েছেন চীনপন্থি ইয়ামিন। মোহামেদ সোলিহ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ায় সম্ভবত সবচেয়ে বেশি স্বস্তি অনুভব করছে নয়া দিল্লি। মালদ্বীপের রাজনীতির পট পরিবর্তনের ভারতের স্বস্তির বিষয়টি আরো বেশি খোলাসা হয়েছে নব নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম সোলিহ’র শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতি। সোলিহ’র শপথ অনুষ্ঠানে মোদির উপস্থিতির আরো একটি তাত্পর্যপূর্ণ দিক হলো সেখানে মোদি ছিলেন সর্বোচ্চ স্তরের বৈদেশিক নেতা।

 সোলিহ মালদ্বীপের অন্যতম প্রবীণ রাজনীতিক। দেশটিতে গণতান্ত্রিক সংস্কারের জন্য তিনি বহু বছর ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন ভারতপন্থি এই রাজনীতিক। অন্যদিকে ইয়ামিনের শাসনামলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা চরম আকার ধারণ করেছিল মালদ্বীপ রাষ্ট্রটিতে। এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসেই দেশটির সর্বোচ্চ আদালতের এক রায়ের প্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন। রায় ঘোষণা করা দুই বিচারপতিকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেন। তার চাপে ঐ আদেশ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় আদালত। ঐ রায়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট নাশিদসহ বিরোধী দলীয় ৯ জনকে মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়েছিল আদালত। আর এ কারণেই আদালতের ওপর ক্ষুব্ধ হন ইয়ামিন। নিজের শাসনকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে এমন কোন শক্তি যাতে মালদ্বীপে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে সেজন্য তিনি স্বৈরাচারী হয়ে ওঠেন। চীনের সমর্থনপুষ্ট হওয়ার কারণেই ইয়ামিন এসব উচ্চভিলাষী সিদ্ধান্ত নিতেন বলে ধারণা করা হয়। তার এসব কর্মকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারতকে রীতিমতো উদ্বিগ্ন করে তোলে।

মালদ্বীপের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদ্বেগের বিষয়টি ফুটে ওঠে নির্বাচনের আগে তাদের হুঁশিয়ারিতে। ভোটের আগে দেশটির গণতান্ত্রিক পরিস্থিতির উন্নতি না হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিভিন্ন সহায়তা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। স্বভাবতই এই কারণে অনেকেই ভেবেছিলেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ব্যাপক দুর্নীতির আশ্রয় নেবে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন। কিন্তু জনরায়ের মুখে ঠিকই বিজয়ী হয়েছেন মোহামেদ সোলিহ। গত অক্টোবরেই দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট ময়মুন আবদুল গাইয়ুমের কথায় অবশ্য নির্বাচনে ভারতের প্রভাবের বিষয়টি ফুটে ওঠে। ঐ সময় তিনি বলেন, চীনের আজ্ঞাবহ প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লা ইয়ামিনের দু:শাসন বন্ধে মালদ্বীপে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে চাপ প্রয়োগ করে ভারত গুরম্নত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

মালদ্বীপকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদ্বেগের বড় কারণ গত কয়েক বছর ধরে সেখানে চীনের প্রভাব বাড়ছিল। গত কয়েক বছরে চীনের সাথে মালদ্বীপের সম্পর্ক খুবই জোরালো হয়েছে। গত বছর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ আন্তর্জাতিক সংযোগ প্রকল্প নিয়ে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের পর তা ভারতকে চিন্তায় ফেলে দেয়। একই সাথে এই চুক্তির ফলে চীনের সাথে মালদ্বীপের অর্থনৈতিক সম্পর্ক গতানুগতিক পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে বাণিজ্যের অঙ্ককে ছাপিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। যেখানে ২৫ শতাংশ শুল্কের বিনিময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে মাছ রপ্তানি করতে হয় মালদ্বীপকে সেখানে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির অধীনে চীনের বিশাল বাজারে মাছ ও মাছজাত পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে দেশটি। যদিও চীনের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে আসছিলেন বিরোধী দলগুলো।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মালদ্বীপ অনেকটাই চীনের ছায়ায় হারিয়ে যেতে বসেছিল। এ কারণে প্রতিবেশি দেশ ভারতসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র চীনের প্রভাবকে মোটেই ভালোভাবে দেখছিল না। দেশটিতে চীনের প্রভাব নিয়ে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। মালদ্বীপকে চীনের প্রভাব থেকে বের করে নিয়ে আসার এই সুযোগকে তাই বেশ ভালোভাবেই কাজে লাগিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। ইব্রাহিম মোহামেদ সোলিহর শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার পাশাপাশি তাকে ভারত সফরের আমন্ত্রণও জানিয়েছেন মোদি। এর আগে সাত বছর আগে ২০১১ সালে সর্বশেষ কোন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মালদ্বীপ সফর করলেও প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনের শাসনামলে ভারত-মালদ্বীপ সম্পর্ক অনেকটাই তলানিতে চলে গিয়েছিল। মালদ্বীপের উদ্দেশ্যে বিমানে চড়ার আগে এক টুইটবার্তায়ও ইব্রাহিম সোলিহর প্রতি তার অকুণ্ঠ সমর্থন প্রকাশ পেয়েছে। ঐ টুইট বার্তায় মোদি বলেন, গণতন্ত্রের জন্য মালদ্বীপবাসীর দীর্ঘ এবং সমন্বিত আকাঙ্খা, আইনের শাসন এবং সুন্দর আগামীর পথ সুগম করবে মালদ্বীপের সাম্প্রতিক নির্বাচন। ভারতবাসী মালদ্বীপে স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিক, উন্নত এবং শান্তিপূর্ণ প্রজাতন্ত্র দেখতে চায়।