নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি বা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি আজ আমাদের দেশে বিশেষ নতুন কোনো খবর নয়, বরং প্রতি বছর বা প্রতি মাসে তো বটেই, এমনকি প্রতি মুহূর্তে প্রতি ক্ষণে বিনা নোটিশে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়বে—এটাই এখন স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান সময়ে এটা যেন আমাদের খেটে খাওয়া মানুষের জন্য ভাগ্যের অমোঘ লিখন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অথচ বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে ধর্মীয় (ঈদ-উৎসব, রমজান মোবারক, বড়দিন, বুদ্ধপূর্ণিমা, পূজা-পার্বণ) অথবা জাতীয় দিবসসহ যে কোনো বিশেষ অনুষ্ঠান উপলক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের ওপর বিশেষ ছাড় প্রদান করা হয়, যাতে ঐ সব দেশের সব শ্রেণির মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে ও সাশ্রয়ী মূল্যে তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী ক্রয় করতে পারে এবং সেই সব অনুষ্ঠান সমভাবে আনন্দময় পরিবেশে উপভোগ করতে পারে। আর এসব বিশেষ দিবস উপলক্ষে বিশেষ ছাড়ে বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী ক্রয় করার আশায় তারা সারা বছর এসব দিবসের জন্য অপেক্ষায় থাকে।
অন্যদিকে আমাদের দেশের কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী যারা বিশেষ উৎসব (দুই ঈদ, রমজান, দুর্গাপূজা, পয়লা বৈশাখ)-এর আগমনের অপেক্ষায় তীর্থের কাকের মতো বসে থাকে, যাতে এসব দিবসের বাহানা করে আপামর গ্রাহকদের গলা কেটে তাদের কাছ থেকে পণ্যসামগ্রীর কয়েক গুণ বেশি দাম আদায় করা যায়। তাদের উদ্দেশ্য থাকে যাতে সারা বছর এই অনৈতিক আয়ের অর্থ দিয়ে পায়ের ওপর পা রেখে অনায়াসে সংসার পরিচালনা করা যায় এবং অতি অল্প সময়ে এসব অসদুপায় অবলম্বন করে অগাধ অর্থ-বিত্তের মালিক হওয়া যায়। মানুষের কতগুলো অত্যাবশ্যক চাহিদা আছে, যা ছাড়া তার পক্ষে জীবন পরিচালনা করা সম্ভব নয়। চাহিদার সঙ্গে পণ্য জোগানের যদি মিল না থাকে, তাহলে সাধারণত পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়। চাহিদা বেশি হলে এবং সে অনুপাতে সরবরাহ কম হলে দ্রব্য সংগ্রহে শুরু হয় প্রতিযোগিতা; ফলে ঐ সব দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়।
এ কথা সর্বজনবিদিত যে, বর্তমান সরকার নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করা সত্ত্বেও আমাদের দেশের বাজারব্যবস্থা কখনোই কোনো আমলেই কোনো সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। আর এই অনিয়ন্ত্রিত বাজারব্যবস্থার কারণে যখন-তখন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটছে। হঠাৎ মূল্য বৃদ্ধিকরণে মজুতদার, মুনাফাখোর, চোরাকারবারি ইত্যাদি অসাধু ব্যবসায়ীই প্রধানত দায়ী। এরা সব সময় সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। হঠাৎ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য চোরাচালান ও মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে। এসব দ্রব্যসামগ্রীর চাহিদা যখন সাধারণ জনগণের কাছে প্রকট হয়ে ওঠে, তখন তারা এসব পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়ে ধীরগতিতে বাজারে ছাড়তে থাকে এবং যার পরিপ্রেক্ষিতে তারা প্রচুর অর্থের মালিক হয়। আবার কখনো কিছু অসৎ ব্যবসায়ী অধিক মুনাফার আশায় দেশীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও স্বল্প পরিসরে বাজারে ছাড়তে থাকে, যার ফলে পণ্যের সরবরাহ কমে যায় এবং মূল্য বাড়তে থাকে।
গত সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসের খুচরা বাজারের বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের চিত্র পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এ সময় হঠাৎ করে প্রতিটি দ্রব্যের দাম আকাশচুম্বী আকার ধারণ করে। চালের দাম হঠাৎ করে কেজিপ্রতি মানভেদে ১০-১৫ টাকা, সয়াবিনের দাম দুই দফায় লিটারপ্রতি ২০-২৫ টাকা, আটা-ময়দার দাম কেজিপ্রতি ৮-১০ টাকা বৃদ্ধি পায়। সবজির বাজারে গেলে ক্রেতাদের রীতিমতো মাথায় হাত। কাঁচা মরিচের (প্রতি কেজি ১২০-১৫০ টাকা) ঝাল ও পেঁয়াজের (প্রতি কেজি ৭৫-৮০ টাকা) ঝাঁজ এত বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে যে, ক্রেতা সকল এখন বাজারে যেয়ে ঠিকমতো চোখ মেলে তাকাতেই পারছে না। করলা যেখানে সাধারণত ২৫-৩০ টাকা কেজি পাওয়া যেত, সেখানে মানভেদে এখন ৬০-৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বেগুন প্রতি কেজি ৫০-৬০ টাকা, যে কোনো ধরনের শাকের আঁটি ১৫-২০ টাকা, তবে শ্রেণিভেদে আরও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে এবং এই দাম বাড়ার ক্রমধারা এখনো অব্যাহত আছে। অথচ বাজারের সবজির দোকানগুলোতে থরে থরে সাজানো নানা ধরনের আগাম শীতের টাটকা ও চকচকে শাক-সবজির পসরা; কোনো দোকানেই শাক-সবজির কোনো কমতি লক্ষ করা যায় না। কিন্তু কেন যেন বাজারদরের ওপর কারো কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
যদিও ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারি প্রশাসন নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি কমানোর জন্য চেষ্টার কমতি রাখেনি। অন্যদিকে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অকালবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, খরা, অকালবন্যা, দেশে ফসলাদির উৎপাদন হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির ধোয়া তুলে নিত্যব্যবহার্য পণ্যের দাম বৃদ্ধি অব্যাহত রেখেছে। তার পরেও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির লাগাম টেনে ধরতে টিসিবি যথারীতি রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে ট্রাকে করে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য সহনীয় মূল্যে বিক্রি করছে; তা যদিও এ দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল। ব্যক্তি ও জাতীয়
জীবনে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পরিণাম হয় খুবই ক্ষতিকর, সেটা বছরের যে সময়েই হোক না কেন। বাজারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেলে জনগণের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সংগতি থাকে না। ফলে জনজীবনে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয় এবং দুর্ভোগ বৃদ্ধি পায়।
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ফলে মুষ্টিমেয় বিত্তবান ব্যক্তি ছাড়া অধিকাংশ মানুষ নিদারুণ সমস্যা তথা অর্থকষ্টে পড়ে। সংখ্যাগরিষ্ঠ ভাগ্যহত মানুষকে দ্রব্যের বাড়তি মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করতে গিয়ে ব্যয় সংকোচন নীতি অবলম্বন করতে হয়। এমনকি তাদের সংসারের একান্ত প্রয়োজনীয় জিনিসের ব্যয়ের খাতও উপেক্ষা করতে হয়। এতে সংসারে দুঃখ-দুর্দশা, মনোমালিন্য বৃদ্ধি পায় এবং সমাজে নানা অবক্ষয়ের উদ্ভব ঘটে। সর্বোপরি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি আমাদের সামাজিক, জাতীয় ও অর্থনৈতিক জীবনে এক দুষ্ট রাহু। তাই যথাশিগগির এই রাহু থেকে মুক্তির জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনো কারণে পণ্যের ঘাটতি দেখা দিলে সরকারি ভাণ্ডার থেকে পণ্যের জোগান দিয়ে বাজারে দাম স্থিতিশীল রাখা বাঞ্ছনীয়। দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার জন্য মজুতদারি ও কালোবাজারি দূর করা আশু প্রয়োজন। মুদ্রাস্ফীতি যথাসম্ভব কমিয়ে আনা এবং অসাধু ও ফটকা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। তার সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিত বাজার পরিদর্শনের গতি আরও ত্বরান্বিত হওয়া প্রয়োজন। যদিও বর্তমানে সরকার পণ্যের মূল্য মনিটরিং করার জন্য টিসিবিকে দায়িত্ব প্রদান করেছে এবং বর্তমান আইন অনুযায়ী দোকানে দোকানে পণ্যের মূল্যতালিকা টানানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সর্বোপরি সামগ্রিক বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ আনা এবং কেউ যেন হঠকারী সিদ্ধান্ত দিয়ে দ্রব্যের মূল্যকে প্রভাবিত করতে না পারে, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখার কোনো বিকল্প হতে পারে না।
তবে শুধু সরকারের একার পক্ষে এর সমাধান দেওয়া অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার। সরকারের পাশাপাশি সচেতন জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং অসাধু মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের নৈতিকতাবিরোধী কার্যক্রম পরিহারই এ সমস্যার আশু সমাধান দিতে পারে। অতএব, নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য অযথা নানা বাহানা দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি করা একটি নীতি-নৈতিকতাবিরোধী ও অত্যন্ত গর্হিত কাজ। তাই দেশের সার্বিক উন্নয়নের ধারা ত্বরান্বিত করতে দ্রব্যমূল্যের অকল্পনীয় ঊর্ধ্বগতি প্রতিরোধকল্পে সরকার ও দেশপ্রেমিক জনগণের এখনই অগ্রণী ভূমিকা পালন করার উপযুক্ত সময়। তা না হলে এই অশুভ রাহুর করালগ্রাস তথা এই অনৈতিক কাজের ভয়াবহতা দিনে দিনে আরও মারাত্মক আকার ধারণ করবে—যা দেশ, জাতি, সম্প্রদায় বা কোনো সভ্য সমাজের জন্য কখনোই কাম্য হতে পারে না।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, শেরপুর সরকারি মহিলা কলেজ, শেরপুর।