নানা আয়োজনে কুমুদিনী ওয়েল ফেয়ার ট্রাস্ট অব বেঙ্গল (বিডি) লি. ও কুমুদিনী কল্যাণ সংস্থার ৯০তম প্রতিষ্ঠা দিবস উদযাপন করা হয়েছে। শুক্রবার (১৯ নভেম্বর) উত্থান একাদশী ও তিথি অনুযায়ী উপমহাদেশের প্রখ্যাত দানবীর মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও কুমুদিনী কল্যাণ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা শহীদ দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার (আরপি সাহার) ১২৫তম জন্মজয়ন্তী ছিল। এ উপলক্ষে তার সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান কুমুদিনী কমপ্লেক্স, নারী জাগরণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ ভারতেশ্বরী হোমস, কুমুদিনী উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ, কুমুদিনী নার্সিং স্কুল ও বিএসসি নার্সিং কলেজ এবং তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
মূল অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে কুমুদিনী কমপ্লেক্সের ভিতরে ভারতেশ্বরী হোমসের সবুজ চত্বরে। এ উপলক্ষে কুমুদিনী কমপ্লেক্স বর্ণিল সাজে সজ্জিত করা হয়। সন্ধ্যায় ভারতেশ্বরী হোমসের সবুজ চত্বরে আয়োজন করা হয় দৃষ্টি নন্দন ডিস প্লে। মোমবাতি প্রজ্বলন করে স্মরণ করা হয় আর পি সাহা ও তার পুত্র ভবানী প্রসাদ সাহা এবং কুমুদিনী পরিবারের নিহত সদস্যদের। এ সময় সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন কুমুদিনী কল্যাণ সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজিব প্রসাদ সাহা। অনুষ্ঠানে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক ড. মো. আতাউল গনি, জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের পরিচালক মিনার মনসুর, মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. হাফিজুর রহমান, এসিল্যান্ড মীর্জা জুবায়ের হোসেন ও থানার ওসি মোহাম্মদ রিজাউল হক শেখ দিপু, তথ্য প্রতিমন্ত্রী, সাবেক কয়েকজন সচিব. বাংলাদেশে নিযুক্ত কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূতসহ শতাধিক অতিথি উপস্থিত ছিলেন। অতিথিদের পদচারণায় অনুষ্ঠানস্থল ও কুমুদিনী কমপ্লেক্স এক মিলন মেলায় পরিণত হয়।
অনুষ্ঠান শেষে ভারতেশ্বরী হোমসের ছাত্রী ও অতিথিদের প্রদীপ প্রজ্বলন অনুষ্ঠানে ছাত্রীরা গাইতে থাকেন- ‘ও আলোর পথ যাত্রী; এ যে রাত্রি এখানে থেমো না; আগুনের পরশ মনি ছোঁয়াও প্রাণে এবং আনন্দ লোকে মঙ্গোলও আলোকে গানগুলো।
কুমুদিনী ওয়েল ফেয়ার ট্রাস্ট্র অব বেঙ্গল (বিডি) লি. এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রাজিব প্রসাদ সাহা এবং পরিচালক (শিক্ষা) ও একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল প্রতিভা মুৎসুদ্দি জানান, দানবীর রনদা প্রসাদ সাহা ১৮৯৬ সালে মির্জাপুর গ্রামে এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম দেবেন্দ্র পোদ্দার এবং মায়ের নাম কুমুদিনী দেবী। অভাব আর দারিদ্রের মধ্যে বড় হয়ে তিনি দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। যুদ্ধের সময় ভারতের এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সেই সুবাদে তিনি ভারতে চলে যান। তার সাহস আর সততার জন্য ওই ব্যবসায়ী রণদা প্রসাদ সাহাকে তার সম্পত্তির দেখা শোনার দায়িত্ব দেন। এভাবেই তিনি প্রচুর অর্থের মালিক হন।
এ দিকে প্রচুর অর্থের মালিক হলেও তিনি সেই টাকা নিজের কাজে ব্যয় করেননি। তার সমুদয় সম্পদ দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য দান করে যান। তিনি সেবার ব্রত নিয়ে দেশের কল্যাণের জন্য নিজেকে আত্ম নিয়োগ করেন। তিনি মির্জাপুরে গড়ে তোলেন কুমুদিনী হাসপাতাল, নারী শিক্ষার জন্য ভারতেশ্বরী হোমস, কুমুদিনী উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ, দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা বিশ্ববিদ্যালয়, কুমুদিনী নার্সিং স্কুল ও কলেজ, নারায়ণগঞ্জে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্রে কলেজ, টাঙ্গাইল কুমুদিনী মহিলা কলেজ, মির্জাপুর মহাবিদ্যালয় বর্তমানে মির্জাপুর সরকারি কলেজ, মির্জাপুর এসকে পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় বর্তমানে মির্জাপুর এসকে পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, মির্জাপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন করেন।
১৯৭১ সালে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। যুদ্ধের সময় তার সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালে বহু নারী পুরুষ আশ্রয় নিয়ে চিকিৎসা সেবা পান। ১৯৭১ সালের ৭ মে এদেশের কিছু রাজাকার আল বদর বাহিনী ও পাকিস্তানি দোসররা রণদা প্রসাদ সাহা ও তার একমাত্র পুত্র ভবানী প্রসাদ সাহা রবিকে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। আজও তাদের খোঁজ মেলেনি।
কুমুদিনী ওয়েল ফেয়ার ট্রাস্ট অব বেঙ্গল (বিডি) লি. বা কুমুদিনী কল্যাণ সংস্থার ৯০তম প্রতিষ্ঠা দিবস ও দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার ১২৫তম জন্মজয়ন্তীকে ঘিরে এ বছর নানা কর্মসূচির আয়োজন করে কুমুদিনী পরিবার ও মির্জাপুর গ্রামবাসী।
কর্মসূচির মধ্যে আছে প্রার্থনা সভা, স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি, কাঙালি ভোজ, হাসপাতালের রোগীদের মধ্যে উন্নত খাবার পরিবেশন করা হয়। ভারতেশ্বরী হোমসে অনুষ্ঠিত হয় তার কর্মময় জীবনের ওপর আলোচনা সভা। অনুষ্ঠানে প্রশাসনের বিভিন্ন অধিদফতরের কর্মকর্তা, কুমুদিনী ওয়েল ফেয়ার ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজিব প্রসাদ সাহা, পরিচালক (শিক্ষা) ও একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রতিভা মুৎসুদ্দি, পরিচালক শ্রী মতি সাহা, পরিচালক সম্পা সাহা, মহাবীর পতি, কুমুদিনী হাসপাতালের পরিচালক ডা. প্রদীপ কুমার রায়, এজিএম (অপারেশন) অনিমেশ ভৌমিক লিটন, কুমুদিনী উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. এম এ হালিম, ভারতেশ্বরী হোমসের প্রিন্সিপাল ত্রয়ী বড়ুয়া, কুমুদিনী নার্সিং কলেজের প্রিন্সিপাল সিন্টার নরীনা ক্রুস ও মেট্রন সিসন্টার দিপালী পেরেরা প্রমুখ।