আমাদের দেশে শিল্পীদের মেধাস্বত্ব নিয়ে খুব বেশি চর্চা নেই। মাত্র কিছুদিন হলো শিল্পী-কলাকুশলীরা এই ব্যাপারে সচেতন হয়েছেন। কপিরাইট অফিসও গুণী শিল্পীদের মেধাস্বত্বের ব্যাপারে সচেতন হয়েছেন। যার ফলে সম্প্রতি আইয়ুব বাচ্চুর সব গানের কপিরাইটের সংরক্ষণ ও তদারকির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। একইসঙ্গে অল্পসময়ের মধ্যে আইয়ুব বাচ্চুর পরিবারকে শিল্পীর গানের ডিজিটাল রয়্যালিটি বাবদ ৯ লাখ টাকা হাতে তুলে দিতে পেরেছে। কিন্তু সারাদেশে অগনিত গীতিকার, সুরকার; যাদের গান কালোত্তীর্ণ হয়েছে; এমন শিল্পীদের গানের মেধাস্বত্বের বিষয়টি আজও সুরাহা হয়নি। তবে ধীরে ধীরে সেইসব শিল্পী-কলাকুশলীর গানগুলোও মেধাস্বত্বের আওতায় আনা হচ্ছে।
পরিতাপের বিষয় হলো অগনিত কালজয়ী গানের শিল্পী-স্রষ্টা শাহ আব্দুল করিমের গানের রয়্যালিটি আজ পর্যন্ত সংরক্ষিত হয়নি। মানবেতর জীবন যাপন করছে বরেণ্য এই বয়াতির পরিবার। অথচ একজন স্রষ্টার তুমুল জনপ্রিয় হওয়া ১টি গান থাকলেও বাংলা ভাষাভাষী যে পরিমাণ শ্রোতা রয়েছে, তাতে তাদের পরিবারের আর্থিক কোনো সংকট থাকার কথা না! কিন্তু বাস্তবতা আজও ভিন্ন। আমাদের বয়াতিরা ‘শিল্পী সংগঠন’ বোঝে না। বোঝে না নানান প্রণোদনার বিষয়গুলোও। তাদের অনেকেই মনে করেন নিজের লেখা-সুর দেওয়া গানগুলো পথে-প্রান্তরে গেয়ে যা খুশি হয়ে দিচ্ছে, সেটিই তার পরম পাওয়া। জীবন এক সরল আনন্দে বয়ে যাওয়া কোনো নদী তাদের কাছে। দীর্ঘদিন ধরে অডিও ক্যাসেট যুগ থেকেই অগনিত বয়াতির লেখা সুর চুরি হয়ে আসছে নামি-দামি আধুনিক গানের ক্যাসেট কাভারে। মোড়কের ভেতরে লেখা থাকছে ‘সংগৃহীত’। আর এই ‘সংগৃহীত শব্দের খপ্পরে পড়েই তারা একজন বাউলের গানের মেধাস্বত্ব চুরি করছেন সবার সামনেই! এই চর্চা দীর্ঘদিন ধরে হয়ে আসছে।
‘কেন পিরিতী বাড়াইলা’, ‘মায়া লাগাইছে’, ‘আমি কুল হারা কলংকিনী’, ‘গাড়ি চলে না’ থেকে শুরু করে অগনিত গান যার লেখা ও সুরে তৈরি তিনি শাহ আব্দুল করিম। আজ তার সন্তানের গ্রাম থেকে ঢাকায় আসার অর্থটুকুও নেই। এমনই দারিদ্র্যে অবস্থান করছেন তারা।
তবে, জানা গেছে, সম্প্রতি এই বাউলের সব গানের মেধাস্বত্ব সংরক্ষণের জন্য কাজ করছেন সংশ্লিষ্ট অনেকেই। এর ভেতরে আইয়ুব বাচ্চুর মেধাস্বত্ব সংরক্ষণের কাজের ব্যাপারে যিনি সবচেয়ে অগ্রগ্রামী ছিলেন, সেই সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার জুয়েল মোর্শেদ কাজ করছেন শাহ আব্দুল করিমের গান নিয়ে।
জুয়েল মোর্শেদ বলেন,‘এটা শুনতে খুবই খারাপ লাগে যে, এত বড় বাউল, আমাদের দেশের এত বড় সম্পদ, এত বড় সংগীত পুরোধা ব্যক্তিত্বের পরিবার আজ মানবেতর জীবন যাপন করছে। আমরা এরই ভেতরে মৌখিকভাবে অনুমতি নিয়ে কাজ শুরু করেছি। শিগগিরই তার পরিবারের সঙ্গে লিখিত চুক্তি করেই তার গানের মেধাস্বত্ব সংরক্ষণের কাজ করবো।’
এদিকে, দীর্ঘদিন ধরে শিল্পী-কলাকুশলীদের মেধাস্বত্ব নিয়ে কাজ করছেন রকলিজেন্ড হামিন আহমেদ। বিএলসিপিএস-এর সভাপতি হামিন আহমেদ বলেন,‘দীর্ঘ প্রায় কয়েকবছর ধরে আমরা যে বিষয়টি গোছানোর চেষ্টা করছি, সেটি হলো, একটা সোসাইটি তৈরি করা। আর সেটি হলে শুধু শাহ আব্দুল করিম নন, সবারই মেধাস্বত্ব সমানভাবে সংরক্ষণ করা যাবে। তাই আমাদের এই মুহূর্তে প্রয়োজন একতা। নিজেদের ভেতরে ভুল বোঝাবুঝি দূর করা।’
উল্লেখ্য, বিভিন্ন টেলিকম কোম্পানির রিংটোন ওয়েলকাম টিউন থেকে শুরু করে ইউটিউব, ফেসবুকসহ যাবতীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেই এখন একটি সৃজনশীল কাজের রেভিনিউ তৈরি হয়। একসঙ্গে সেটি নিয়মনীতি মেনে সংরক্ষণ ও প্রকৃত স্বত্বাধিকারীর কাছে বণ্টনের কাজ করাটাই এখন মূল চাওয়া। আর এই মেধাস্বত্বের দাবির জন্যই লড়াই করছেন আজ জেমস, মাইলসসহ একাধিক সলো শিল্পী ও ব্যন্ড তারকারা। নিজেদের দাবির কারণেই তাদের মামলা মোকদ্দমা করতে হচ্ছে।
এর আগে শাহ আব্দুল করিমের এত অগনিত গানের ব্যবহারকারীরা বিচ্ছিন্নভাবে তার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে বা না নিয়ে কাজ করেছেন হয়তো। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে এর একটি সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা থাকলে সেক্ষেত্রে শিল্পী কুশলীরাও এসকল কালজয়ী গান নিয়ে কাজ করতে পারবেন। একইসঙ্গে প্রকৃত গানের স্রাষ্টাকেও অনাহারে অর্ধাহারে থাকতে হবে না।
শুধু তাই নয়, মেধাস্বত্বের প্রকৃত সংরক্ষণ সম্ভব হলে সেই গান নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনেও লড়াইয়ের বিষয়টি আরও জোরালো হয়। আমরা জানি মাইলসের একটি গান বলিউডের একটি ছবিতে আনু মালিক চুরি করে ব্যবহার করায় পরবর্তী সময়ে কপিরাইট আইনে হেরে গিয়ে তাকে জরিমানা গুনতে হয়েছিল। অন্যদিকে হালের বাদশা নামের এক ভারতীয় শিল্পী আমাদের বাউল শিল্পী রতন কাহারের গান ‘গেন্দা ফুল’-এর কথা-সুর চুরি করে তা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে কথা উঠলে মাত্র ১০ লাখ টাকায় একটি মৌখিক সমঝোতা হয়। অথচ মেধাস্বত্বের ব্যাপারে এই গানটিও জোরালো অবস্থানে থাকলে আইনি লড়াই করে জরিমানা আদায় সম্ভব ছিল।