ছোটবেলার গল্প জানতে চাওয়া হলে আজম বলেন, 'আমরা পাঁচ ভাইবোনের মাঝে তিনজনই মোটামুটি সমবয়সী ছিলাম। এর জন্য একই সাথে পড়াশোনা করা হতো ছোটবেলা থেকেই। আর আমাদের স্কুল এর কথা বলতে গেলে এটা অনেকটা পুরোনো আমলের স্কুলগুলোর মতোই ছিল। বাঁশ-কঞ্চির বেড়া দিয়ে বানানো একরুমের ঘরই হলরুমই ছিল পুরো একটা স্কুল, যেখানে বেড়ার দেয়ালে পুরো রুমকে ৫ ভাগে ভাগ করে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির ক্লাস নেওয়া হতো।'
কুপি আর হ্যারিকেনের আলোয় পড়ুয়া এই ছোট্ট মানুষটি দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি অব্দি কখনোই দ্বিতীয় হননি। এরপর স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে ইন্টারে ভর্তি হয়েছিলেন উপজেলা শহরের সেতাবগঞ্জ ডিগ্রি কলেজে। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর এই ডিগ্রি কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া মানুষের সংখ্যা ছিল নিতান্তই কম।
কলেজের সময় আর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে জানাশোনার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'আমাদের আশেপাশে কয়েকগ্রামের কেউই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তো না সেসময়। কয়েক বছর আগে একজন শিক্ষার্থী মেডিকেল প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, তাকে দেখে ভাবতাম শুধু মেডিকেলে ভর্তি হয়ে ডাক্তার হওয়াই সবথেকে বড় ব্যাপার। কাজেই মেডিকেলে ভর্তির প্রস্তুতি নিই, কিন্তু প্রশ্নফাঁসের ঘটনা সব স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দেয়। এরপর শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিতে পেরেছিলাম। চান্স পেয়ে যাই হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চারবছর শেষে নিজ বিভাগে ৩য় স্থান অর্জন করেন তিনি। 'আমার সবসময়ই গবেষক কিংবা বিজ্ঞানী পরিচয়টাকে খুব বড় কিছু মনে হতো, এর জন্যই দ্বিতীয় বর্ষের শেষদিকে আমাদের শ্রদ্ধেয় রাশিদুল ইসলাম স্যারকে আমার গবেষণার আগ্রহ জানাই। এরপর থেকেই শুরু আমার গবেষণা জীবনের'—এমনটাই বলছিলেন আজম। স্নাতক হওয়ার পরের গল্প জানতে চাইলে তিনি জানান, 'আমার গ্র্যাজুয়েশন শেষে আমার কাছে ছিল দুটো জিনিস, সিজিপিএ ৩.৯১ আর ৪টা পাবলিকেশন্স। এর মাঝে জিআরই দিয়ে জানুয়ারিতে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএস ইন ফিশারিজ বায়োলজি এন্ড জেনেটিক্স প্রোগ্রামে ভর্তি হয়ে যাই। এখানে মাস্টার্সের প্রথম সেমিস্টার শেষে আইইএলটিএস (IELTS) দিয়ে ৭ পেয়ে যাই আর দ্বিতীয় সেমিস্টারে ৪.০ পাই। এই সেমিস্টার শেষে ক্যাম্পাসে আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে জীবনের প্রথমবার অংশ নিয়েই সেকেন্ড বেস্ট ওরাল প্রেজেন্টেশন আওয়ার্ড' পেয়েছিলাম।'
আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবেদনের ব্যাপারে তিনি বলেন, '২০২০ সালের ১লা জুলাই থেকেই প্রফেসরদের ইমেইল করা শুরু করেছিলাম। এরপর জুলাই আগস্ট দুই মাসে প্রায় ৮৫০ জনকে ইমেইলে করেছি। আর গ্রামে নেটওয়ার্ক এতটাই দুর্বল যে কোনো প্রফেসর ভিডিও কলে কথা বলতে চাইলে এক কিলোমিটার দূরে কোথাও গিয়ে কথা বলতে হতো।'
একদিন লুজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটির এক প্রফেসরের সাথে ১০ কি.মি দুরে উপজেলা শহরে গিয়ে কথা বলে আসতে হয়েছে তাকে। এ বছর ফেব্রুয়ারির ২৪ তারিখে সর্বপ্রথমে সেই লুজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকেই টিচিং অ্যাসিস্টেন্টশিপ-এর অফার পেয়েছেন। তারপর অফার এসেছে ইউনিভার্সিটি অফ ওকলাহোমা এবং টেক্সাস টেক থেকেও। তিনটিতেই পিএইচডি প্রোগ্রামের জন্য।
আমেরিকার ওকলাহোমা স্টেটের 'ইউনিভার্সিটি অফ ওকলাহোমা' থেকে ৫ বছরের পিএইচডি প্রোগ্রামে প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকার ফান্ড পেয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন আজম। প্রথম অফার লেটার পাওয়ার অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'এই অনুভুতিটা আসলে আমি কোনোভাবেই বলে বোঝাতে পারবো না। আমি অফার লেটার কতবার যে পড়েছি তার কোনো হিসাব-ই নেই। যেদিন সন্ধ্যায় প্রথম অফার লেটার পেয়েছিলাম সেদিনের উত্তেজনায় আমি সারারাত একফোঁটাও ঘুমাইনি। এতদিনের এত প্রতীক্ষার সেই মুহূর্ত কোনোদিনও ভুলে যাওয়ার মতো নয়।'
সবশেষে তিনি বলেন, 'দেশের শিক্ষাঙ্গনে একটি গবেষণামূলক পরিবেশ দেখতে চাই। এছাড়া তরুণ প্রজন্মের উচিত শুধু স্বপ্ন দেখেই বসে না থেকে নিজের উপর আত্মবিশ্বাস রেখে স্বপ্ন পূরণে কাজ করা। লক্ষ্যে অটুট থাকলে কোনো একটা উপায় এসে ধরা দেবেই।'