মমতার তৃণমূল কংগ্রেস কি কংগ্রেসকে ছাড়িয়ে যাবে

ভারতের গোয়া, হরিয়ানা, বিহার, আসাম, উত্তরপ্রদেশের পর এবার মেঘালয় কংগ্রেসে ভাঙন ধরেছে। গত বৃহস্পতিবার মেঘালয়ের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মুকুল সাংমাসহ ১২ জন কংগ্রেস বিধায়ক তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। সেখানে কংগ্রেসের বিধায়কসংখ্যা ১৮ থেকে কমে ছয়ে দাঁড়িয়েছে। তৃণমূল এখন মেঘালয়ের প্রধান বিরোধী দলে পরিণত হয়েছে। এর দুই দিন আগে কংগ্রেসের নেতা কীর্তি আজাদ ও অশোক তানওয়ার তৃণমূলে যোগ দেন।

মেঘালয়ের ঘটনা নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, এর আগে কংগ্রেসকে এত বড় ধাক্কা দেননি তৃণমূল নেত্রী পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। একদা জোটসঙ্গী তৃণমূলের এই আচরণে ক্ষুব্ধ ভারতের সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দল কংগ্রেস। তারা সেই ক্ষোভ গোপনও করেনি। বেশ কয়েকবার তৃণমূলের এই আচরণের নিন্দা করে কংগ্রেস বলেছে, এর ফলে বিজেপি শক্তিশালী হবে। একের পর এক কংগ্রেস নেতা তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পর বিভিন্ন রাজ্যে কংগ্রেসের ভিত যেমন দুর্বল হচ্ছে, তেমনি শক্ত উপস্থিতি বাড়ছে তৃণমূল কংগ্রেসের। ভারতের রাজনীতিতে সংকুচিত হচ্ছে কংগ্রেস আর বাড়ছে তৃণমূলের প্রভাব।

ভারতে ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। গত মে মাসে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিশাল জয়ের পর মমতা ব্যানার্জি আগামী লোকসভা নির্বাচনের আগে বিরোধী দলগুলো নিয়ে বিজেপিবিরোধী জোট গঠনে তত্পর হন। কিন্তু কয়েক মাস পর দেখা যাচ্ছে যে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কংগ্রেসের নেতারাই দল ভেঙে তৃণমূলে যোগ দিচ্ছেন। যে কারণে দল দুটির মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে! ভবিষ্যতে তারা বিজেপিবিরোধী জোট গঠন করতে পারবে কি না, তা নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে, তাহলে তৃণমূল কি কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে শুধু আঞ্চলিক দলগুলো নিয়ে জোট করতে চাইছে? আনন্দবাজার পত্রিকার এক খবরে বলা হয়েছে, সম্প্রতি দিল্লিতে অবস্থানকালে মমতা ব্যানার্জি জানান, শিগিগরই মুম্বাইয়ে গিয়ে এনসিপি নেতা শারদ পাওয়ার এবং শিবসেনার প্রধান উদ্ধব ঠাকরের সঙ্গে দেখা করবেন তিনি। এর মাধ্যমে আগামী দিনে বিরোধী জোট নিয়ে নতুন সমীকরণের সম্ভাবনা উসকে দিয়েছেন মমতা।

ঐ খবরে বলা হয়েছে, কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে বিভিন্ন আঞ্চলিক দলকে সঙ্গে নিয়ে ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে জোট তৈরি করতে চাইছেন মমতা। আর এটা হলে বদলে যাবে ভারতের রাজনৈতিক সমীকরণও। এক্ষেত্রে হয়তো তৃণমূলের অন্য হিসাব-নিকাশও রয়েছে।

হিন্দুস্তান টাইমসের এক খবরে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের চেয়ে বেশি আসন পেতে পারে তৃণমূল। লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের সেরা ফল ছিল ২০১৪ সালে। পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি আসনের মধ্যে ৩৪টিতেই জিতেছিল তারা। সেই সময় তৃণমূলের পক্ষে ভোট পড়েছিল ৩৯ দশমিক ৮ শতাংশ। এবার বিধানসভা নির্বাচনে ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট পেয়েছে তারা। সেই হিসাবে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে নিজেদের সেরা ফল করতে চাইবে তৃণমূল। ৩৪টির বেশি আসন জয়ের লক্ষ্য থাকবে তাদের। যদিও এটা ঠিক যে বিধানসভা ও লোকসভা ভোটের পরিপ্রেক্ষিতে পুরোপুরি আলাদা।

অন্যদিকে, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ৫২টি আসনে জিতেছিল কংগ্রেস। এর মধ্যে কেরালা (১৫), পাঞ্জাব (৮) এবং তামিলনাড়ু (৮) থেকেই এসেছিল ৩১টি আসন। কিন্তু চলতি বছর কেরালার বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসের যে ভরাডুবি হয়েছে, তাতে ২০২৪ সালে আদৌও কতগুলো আসন তারা পাবে, সেটা বলা কঠিন। তামিলনাড়ুতে কংগ্রেসের ভাগ্য পুরোপুরি ডিএমকের সঙ্গে আসন বণ্টনের ওপর নির্ভর করবে। আগেরবার লোকসভা ভোটের সময় তামিলনাড়ুতে ক্ষমতায় ছিলেন না এম কে স্টালিনরা। এবার তারা ক্ষমতায় আছেন। ফলে কংগ্রেসের ভাগ্যে কতগুলো আসন জুটবে, তা নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন আছে। অন্যদিকে, পাঞ্জাবে দলীয় কোন্দলেই জর্জরিত কংগ্রেস। খোদ রাজ্য কংগ্রেসের সভাপতি নিজের দলের মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধেই অনশনে বসার হুমকি দিচ্ছেন। আসামেও কংগ্রেসের অবস্থা শোচনীয়। এছাড়া সেখানে কংগ্রেসেও ভাঙন ধরিয়েছে তৃণমূল।

এসব দিক বিবেচনায় তৃণমূল পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও অন্য রাজ্য থেকে লোকসভা আসন জিতলে কংগ্রেসের ওপর আরো চাপ বাড়বে। দেশের প্রধান বিরোধী দলে পরিণত হবে তৃণমূল। যদিও এই মুহূর্তে অন্য রাজ্য থেকে তৃণমূলের সেই সম্ভাবনা তেমন দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। তারা বলছেন, এখন পর্যন্ত সারা ভারতে তৃণমূলের চেয়ে কংগ্রেসেরই উপস্থিতি ও প্রভাব বেশি। আর তৃণমূল যদি আসন বেশিও পায়, তারা কংগ্রেসের চেয়ে ভোট বেশি পাবে না। গত লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস ভোট পেয়েছে ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ। সেখানে ২০১৪ সালে তৃণমূল যখন সবচেয়ে ভালো করেছিল, তখন তারা পেয়েছিল ৪ দশমিক ১ শতাংশ ভোট।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ২০২৪ সালে তৃণমূল নিজেদের বিজেপি ও কংগ্রেসের বাইরে গিয়ে বড় দল হওয়ার আশা করতেই পারে। আর সেটা হলে ভারতের রাজনীতিতে মমতা ব্যানার্জির এযাবত্কালের সবচেয়ে বড় প্রভাব প্রতিষ্ঠা হবে। আর যদি ঐ নির্বাচনে বিজেপি জোট একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায়, সেক্ষেত্রে মমতা ব্যানার্জি আরো বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠবেন।