‘অমর একুশে’ কবিতাটিই ’৪৭-পরবর্তী বাংলাদেশের আধুনিক কাব্যধারার প্রথম বীজকবিতা। এই কবিতার প্রকাশকালকেই বাংলাদেশের কবিতার প্রকৃত জন্মকাল হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে—যার ভ্রূণ উপ্ত হয়েছিল, বলা যায়, ১৯৪৮ সালে
কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫২ সালের ২২ মার্চ। সাতচল্লিশ-পরবর্তী বাংলাদেশের কবি ও কবিতার ‘দেউলিয়াত্ব’ সম্পর্কে কবিতার নিবিষ্ট পাঠকমাত্রই কমবেশি অবগত আছেন বলেই আমাদের বিশ্বাস। এর মধ্যে ১৯৫০ সালে, ‘নতুন কবিতা’ নামে একটি কাব্যসংকলন প্রকাশিত হয়েছিল। এতে হাসান হাফিজুর রহমান, শামসুর রাহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ ও বোরহান উদ্দীন খান জাহাঙ্গীরসহ কয়েকজন নবীন ও নতুন কবির কবিতা অন্তর্ভুক্ত হলেও, ‘তাঁদের কবিতার ভাষা, আঙ্গিক অথবা বক্তব্যে’ এমন কোনো নতুনত্ব ছিল না—যা তাকে সমকালীন ঢাকাকেন্দ্রিক অথবা কলকাতাকেন্দ্রিক কবিতা থেকে পৃথক আসন দিতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে, বায়ান্নের একুশে ফেব্রুয়ারিতে মাহবুব উল আলম চৌধুরী রচিত এবং একই দিনে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত কবিতাটিকে (‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি’) বিবেচনায় রেখেও, বলা চলে যে ‘অমর একুশে’ কবিতাটিই ’৪৭-পরবর্তী বাংলাদেশের আধুনিক কাব্যধারার প্রথম বীজকবিতা। এই কবিতার প্রকাশকালকেই বাংলাদেশের কবিতার প্রকৃত জন্মকাল হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে—যার ভ্রূণ উপ্ত হয়েছিল, বলা যায়, ১৯৪৮ সালে।
কী ছিল এই কবিতায়—যা তাকে পথিকৃতের এই দুর্লভ ও অনন্য মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে—এই প্রশ্ন খুবই প্রাসঙ্গিক। এর উত্তরে সংক্ষেপে বলা যায়, ছিল সমগ্র বাংলাদেশ—বাংলাদেশের জন্মের আকুতি, রাজনীতি এবং সর্বোপরি, বাংলাদেশের কবিতার ভবিষ্যত্ গতি-প্রকৃতি-রূপরেখা সবই। সেটি কি আঙ্গিকে, কি বক্তব্যে। ৯৮ পঙিক্তর সুদীর্ঘ এই কবিতাটি বয়ে গেছে এক কোমল অথচ ক্লান্তিহীন নির্ঝরের মতো। কিন্তু কোথাও তা আক্রান্ত হয়নি বর্ণনা ও বাহুল্যের বেনোজলে। এখানেও, প্রারম্ভিক বক্তব্যের মতোই, একুশের সর্বব্যাপী ও সুদূরপ্রসারী তাত্পর্য, বাঙালি জাতিসত্তার অনিবার্য ও অপ্রতিরোধ্য উত্থান, এবং ‘প্রতিক্রিয়ার দানবীয়’ শক্তির পতন সম্পর্কে উচ্চারিত হয়েছে দৃঢ় ও অবিচল আস্থা। লক্ষণীয়, সেই ১৯৫২ সালে কী অব্যর্থ, কী নিখাদ এই প্রত্যয় : ‘এখানে আমরা ফ্যারাউনের আয়ুর শেষ কটি বছরের/ঔদ্ধত্যের মুখোমুখি।’ এই ঔদ্ধত্যের বিপরীতে সমাজ-প্রগতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে এসেছে—‘কিষাণ’ ও ‘শ্রমিক’-এর প্রসঙ্গ। বর্ষার ‘পলিসিক্ত মাঠ’, ‘সোনালী শস্য’, ‘যমুনার ঘোলা স্রোত’, ‘পিতার বাস্পস্তব্ধ চোখ’, ‘দুঃসাহসী নাবিক’ এবং ‘আশাহত সখিনা’র পাশে অনায়াসে ঠাঁই করে নিয়েছে ‘বস্তীবাসিনী মা’। অতি যত্নে ও শ্রমে বোনা নকশিকাঁথার মতো পঙিক্তর পর পঙিক্তর বিন্যাসে যে-ছবিটি অবয়ব পেয়েছে, সেটি আবহমান বাংলার। এই কবিতার ভাব ও বক্তব্যগত ব্যঞ্জনা থেকে বিযুক্ত হয়ে, শুধু সমগ্র ছবিটির দিকে তাকালেও অভিভূত হতে হয়। এই ছবিটি, বাংলা ও বাঙালিবিরোধী সেই প্রেক্ষাপটে, স্বয়ং একটি প্রবল প্রতিবাদ।
বক্তব্যের ক্ষেত্রে সংযোজিত হয়েছে বিপুল ব্যঞ্জনাময় সম্পূর্ণ নতুন দু’টি মাত্রা। এর একটি হলো ‘ঘৃণা’ :
‘আবুল বরকত নেই; সেই অস্বাভাবিক বেড়ে ওঠা
বিশাল শরীর বালক; মধুর ষ্টলের ছাদ ছুঁয়ে হাঁটতো যে
তাঁকে ডেকো না;
আর একবারও ডাকলে ঘৃণায় তুমি কুঁচবে উঠবে—’
বাংলাদেশের কবিতায়, এবং রাজনীতিতেও, ঘাতকচক্রের বিরুদ্ধে সচেতনভাবে ‘ঘৃণা’ শব্দটির প্রয়োগ, বোধ করি, এটাই প্রথম। এবার দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যটি লক্ষ করা যাক :
‘বিচ্ছেদের জন্যে তৈরী হওয়ার আগেই
আমরা ওদেরকে হারিয়েছি—
কেননা, প্রতিক্রিয়ার গ্রাস জীবন ও মনুষ্যত্বকে সমীহ করে না।’
এত মিতভাষণে, এত অনিবার্য তীব্রতায় এবং এতটা স্বচ্ছভাবে ‘প্রতিক্রিয়া’র স্বরূপ উন্মোচন বাংলাদেশের কবিতায় ইতিপূর্বে প্রায় দুর্লক্ষই বলা চলে। সর্বোপরি, সবকিছুকে ছাপিয়ে, সর্বব্যাপ্ত, কালোত্তীর্ণ যে-আকুলতা ধ্বনিত হয়েছে কবিতার শেষ দু’টি পঙিক্ততে তার অনুরণন অনিরুদ্ধ :
‘আজ তো জানতে এতোটুকু বাকী নেই মাগো,
তুমি কি চাও, তুমি কি চাও, তুমি কি চাও।’
বলার অপেক্ষা রাখে না যে ‘তুমি কি চাও’ পুনরুক্তিময় এই পঙিক্ততে যে সুদূরপ্রসারী আকুলতা ফুটে উঠেছে, তা স্পষ্টতই স্বাধীনতার— পরাধীনতার শৃঙ্খল-মুক্তির। কী দুঃসাহসিক, কী দূরদর্শী এই স্বপ্ন, এই উচ্চারণ! হাসান হাফিজুর রহমানের আগে কিংবা সমকালে তো বটেই, এমনকি ষাটের দশকেও, অনুরূপ দৃষ্টান্ত বিরল। বলা অত্যুক্তি হবে না যে এর মধ্য দিয়ে শুধু বাংলাদেশের কবিতারই নয়, তিনি হয়ে ওঠেন স্বাধীন বাংলাদেশেরও প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা।