আওয়ামী লীগের তরুণ নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারাচ্ছে দেশ?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকেই এখন একক শক্তি বলে মনে করেন রাজনীতিবিদ-রাজনীতিবিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা এ দলটি অনিয়ম, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবসমই ছিল সরব। পাশাপাশি যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দলকে এগিয়ে নিতে নেতৃত্বের জায়গায় এসেছে নতুন মুখ। দেশকে এগিয়ে নিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন তারা; একইসঙ্গে অর্জন করেছেন জনগণের আস্থা। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সামাজিক আন্দোলন ও জনসেবা-জনসচেতনতামূলক কাজেও তারা পালন করে আসছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কিন্তু সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে তরুণ নেতাদের সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য-কর্মকাণ্ড সেই অর্জনকে জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলেও মনে করছেন কেউ কেউ।

বেশ কয়েকদিন ধরেই ডা. মুরাদ হাসানের বিতর্কিত মন্তব্য ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’তে পরিণত হয়েছে। এরইমধ্যে ফাঁস হয়েছে মাহিয়া মাহীর সঙ্গে তার একটি ফোনালাপ। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া সেই অডিওতে শোনা গেছে, মাহীর উদ্দেশে তিনি অশোভন কথাবার্তা বলছেন। তাকে ধর্ষনের হুমকিও দিচ্ছেন। এমনকি আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের পাঠিয়ে তাকে তুলে আনার ভয়ও দেখিয়েছেন তিনি।

এর আগে, এক ফেসবুক লাইভে এসে তিনি বিএনপি নেতার কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে অশালীন বক্তব্য দেন। এছাড়া, টেলিভিশন টকশোতে সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়াকে ‘মানসিক রোগে আক্রান্ত’ বলেও তিনি মন্তব্য করেছিলেন। 

বিভিন্ন সময় বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য তাকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই নির্দেশের মধ্যদিয়ে প্রধানমন্ত্রী প্রমাণ করলেন, অনিয়ম, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সবসমই সরব। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যেই তরুণ নেতাদের হাতে দেশ পরিচালনার এমন গুরু দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাদের নিয়েই দল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছে, যাদের ওপর জনগণের সর্বোচ্চ আস্থা থাকার কথা ছিল, তারা কি আসলেই গণমানুষের আস্থা ধরে রাখতে পারছেন? না কি তাদের এমন কর্মকাণ্ডে শুধু তারা নন, কুলষিত হচ্ছে পুরো দলও? 

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকেই মনে করছেন, এসব কাণ্ডে তরুণ নেতৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে না। ব্যক্তি পর্যায়ের এমন কর্মকাণ্ডের জন্য শুধু ওই একক ব্যক্তিই দায়ী থাকবেন। এমন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সরব রয়েছে আওয়ামী লীগ। ইত্তেফাক অনলাইনকে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস. এম. কামাল হোসেন বলেন, ‘তরুণ নেতৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে না। তরুণ নেতৃত্বের প্রতি মানুষ আস্থা হারাচ্ছে না। কিছু কিছু ব্যক্তি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছেন। সামাজিকভাবে কারও নৈতিক অবক্ষয় হতে পারে, কখন কার নৈতিক অবক্ষয় হবে, সেটা বলা কঠিন।’ তিনি আরও বলেন, ‘সেটা তরুণ বা প্রবীণ নেতা বলে নয়।’

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘আওয়ামী লীগ তরুণ নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, সেটা দলীয়ভাবে মনে করি না। আওয়ামী লীগের তরুণ কর্মী যেই হোক না কেন, যদি অপ্রয়োজনীয়, অপ্রাসঙ্গিক বা কুরূচিপূর্ণ মন্তব্য করেন, বা দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো কাজ করেন কিংবা দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কোনো কাজ করেন, তাহলে তাকে শাস্তির আওয়ায় আনা হবে।’ তিনি আরও বলেন,  ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়া আওয়ামী লীগে কেউ অপরিহার্য নন। তাই কেউ শাস্তির ঊর্ধ্বে নন।’

নাছিম আরও বলেন, ‘কোনো একক ব্যক্তির অপকর্মের ফল তাকেই ভোগ করতে হবে।  মুরাদ হাসানকে তার কর্মকাণ্ডের জন্য মন্ত্রিপরিষদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।’

সর্বশেষ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৯ সালের ২০ ডিসেম্বর। উদ্বোধন করেন দলের সভানেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সম্মেলনে দলের দুর্দিনে ত্যাগীদের মূল্যায়নের কথা বলেছিলেন কেন্দ্রীয় নেতারা। তাদের সিদ্ধান্তে উঠে এসেছিল ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে তাদের ভাবনার কথা। সেই ভাবনা থেকেই সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে উঠে আসে নতুন মুখ। কিন্তু বিপত্তির সৃষ্টি হয়, যখন তাদের মধ্যে কেউ কেউ জনগণের সেই আস্থা ধরে রাখতে ব্যর্থ হন।

আরও চিন্তার বিষয় হলো, ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের এ রকম বেফাঁস মন্তব্যের ঘটনা এবারই  প্রথম নয়। এর আগে সাবেক পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য  লতিফ সিদ্দিকী, গাজীপুর সিটি করপোশেনের মেয়র ও গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম ও রাজশাহীর কাঁটাখালী পৌরমেয়র আব্বাস আলীর মন্তব্য নিয়েও হয়েছে সমালোচনা। তাদের বিরুদ্ধে  উঠেছে ধর্ম অবমাননা থেকে শুরু করে জাতির জনকের সম্পর্কে কটূক্তির মতো গুরুতর অভিযোগ। এর মধ্যে মাত্র এক মাসের ব্যবধানেই মন্ত্রিত্ব, মেয়রশিপ হারালেন ডা. মুরাদ হাসান, মো. জাহাঙ্গীর আলম ও আব্বাস আলী। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিযোগ, বিরোধী নেতা-নেত্রীদের বিরুদ্ধে বিষোদ্‌গার, কুরুচিপূর্ণ কথাবার্তা দেশের রাজনীতির সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। সর্বশেষ মুরাদ হাসানের ঘটনা এরই একটি প্রতিফলন। তবে তাকে পদত্যাগের মাধ্যমে একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হয়েছে বলেও তারা মনে করছেন। 

এই ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর সাবেক প্রেস-সচিব আশরাফুল আলম খোকন তার ফেসবুক টাইমলাইনে লিখেছেন, ‘কথাগুলো অনেকের কাছে খাপছাড়া মনে হতে পারে। তবু কিছু সমীকরণ মেলাবো। ডা. মুরাদ হাসানের গত কয়েক মাসের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে কিছু বিষয় পরিষ্কার হওয়া যাবে। তিনি রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে কথা বলেছেন। তার এই বক্তব্যের সঙ্গে আমার মতো অসাম্প্রদায়িক চেতনার অনেকেই একমত। তবু এই সময়ে, কোনো ইস্যু ছাড়া হঠাৎ করে তার এই বক্তব্য দেওয়ার কারণ কী? যখন দেশে জঙ্গি ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলন চলছে। এইখানে তিনি মোল্লাদের খেপিয়েছেন।’

খোকন আরও লিখেছেন, ‘বেগম জিয়ার পর বিএনপির নেতৃত্বে কে আসবেন—এটা এখন খুবই আলোচিত বিষয়। দলের একটি গ্ৰুপ ছাড়া পুরা জাতির কাছেই তারেক রহমান চরম বিতর্কিত ব্যক্তি। কর্মকাণ্ডে তার আর মুরাদের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই। ভাবা হচ্ছিল, তারেক রহমানের বউ ডা. জোবাইদা রহমান হয়তো বিএনপির হাল ধরবেন। কিন্তু তিনিও অনিচ্ছুক। সেই জন্যই কি চরম অশ্লীল মন্তব্য করে জাইমা রহমানকে লাইমলাইটে নিয়ে আসার চেষ্টা? তার প্রতি নারীদের সহানুভূতি তৈরি করা? এইখানে তিনি বিএনপি এবং নারীদের বিক্ষুব্ধ করেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে বাজে মন্তব্য করেছেন। ছাত্রী হলের মেয়েদের নিয়ে অপ্রীতিকর মন্তব্য করেছেন, যে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বয়ং বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গবন্ধু কন্যা পড়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা খেপলে কী হয়, তা মুরাদ হাসান খুব ভালো করেই জানেন। আর এর সঙ্গে যদি মেয়েরা মাঠে নামেন তো কথাই নেই। এইখানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের খেপিয়েছেন।’

প্রধানমন্ত্রী সাবেক এই প্রেস সচিব আরও বলেন, ‘এরপর তিনি হয়তো সিরিয়ালি হাইকোর্ট তথা আইনজীবী এবং প্রেসক্লাব তথা সাংবাদিকদের নিয়ে বাজে মন্তব্য করতেন। এই সব গোষ্ঠীকে বিক্ষুব্ধ করতে পারলে সরকারের পতন ঘটাতে আর কিছু লাগে না। একজন চলচ্চিত্র নায়িকার সঙ্গে চরম আপত্তিকর কথাগুলো তিনি বলেছেন দুই বছর আগে। দুইপক্ষের কেউই এটা রেকর্ড করে অনলাইনে ছাড়েননি। তাহলে কিভাবে বাইরে এলো? একটু মাথা খাটান। উত্তর পেয়ে যাবেন। সরকারের আরও সর্বনাশ করার আগেই ধরা খেয়েছেন। সরকারকে বিনাশ করতে গিয়ে নিজেই বিনাশ হয়ে গেছেন। কপালে হয়তো আরও শনি আছে।’

একই ঘটনায় ডা. মুরাদ হাসানের তীব্র সমালোচনা করেছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। নিজের ফেসবুক টাইমলাইনে তিনি লিখেছেন, ‘ডা. মুরাদ হাসান আওয়ামী লীগের এমপি ও তথ্য প্রতিমন্ত্রী।  তিনি প্রায়ই প্রতিদিন তার মস্তিষ্কবিকৃত বক্তব্যের মাধ্যমে এই দেশের গণমানুষের কাছে ধিকৃত ও ঘৃণিত হন। গতকাল এক বক্তব্যে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে নিয়ে খুব অশালীন ও বাজে কথা বলেছেন। ব্যারিস্টার জাইমা রহমান রাজনৈতিক কোনো কর্মকাণ্ডে নেই। বাবা-মায়ের আদরের মেয়ে হিসেবে পরিবারের সঙ্গেই তার বসবাস। জাইমা রহমানের দাদা ও নানার পরিচিতি অনেক ব্যাপক। সেই প্রসঙ্গে যাচ্ছি না। ডা. মুরাদ হাসান তার কথাবার্তায় আমাদের কাছে অতি নিকৃষ্ট ও খারাপ লোক। কিন্তু, তার মেয়ের কাছে অবশ্যই সেরা একজন বাবা। আচ্ছা, জাইমা রহমান নিয়ে মুরাদ যে কটূক্তি করেছেন,একই কটূক্তি তার মেয়েকে যদি কেউ করে, তখন মুরাদের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে? আর ডা. মুরাদ হাসান অন্য একজন বাবার মেয়ে নিয়ে এরকম অশালীন কথা বলার পর, তার মেয়ের সামনে চেহারা কিভাবে দেখান? খুব করে চাই; তিনি যেন হায়াতে বেঁচে থাকেন অন্তত ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর অবধি।’

জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। এই নির্বাচন স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য হবে। যদি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রার্থী নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের সেটা হয় না। আমাদের দলগুলো যাদের মনোনয়ন দেয়, সেই মনোনয়ন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হয় না। অনেক ক্ষেত্রে বিতর্কিত ব্যক্তিরা মনোনয়ন পেয়ে যান। আগে রাজনীতি হতো জণগনের স্বার্থে আর এখন রাজনীতি ব্যক্তি স্বার্থে হচ্ছে। তাই আজ রাজনীতি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।’

সোমবার (৬ ডিসেম্বর) রাতে ফেসবুক লাইভে এসে ডা. মুরাদ হাসানকে নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন  ব্যারিস্টার  সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। তিনি বলেন, ‘‘তথ্য প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসান কয়েকদিন ধরে টানা নারীদের নিয়ে অশ্লীল কথা বলে যাচ্ছিলেন। তাই মন্ত্রী ও এমপি পদে থাকার কোনো অধিকার তার নেই। খবর পেলাম একটু আগে তথ্য প্রতিমন্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন। আমি প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই। এই সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হলো ‘পাপ বাপকেও ছাড়ে না। শুধু মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করলেই হবে না। তিনি জামালপুরের যেখান থেকে এমপি হয়েছেন, এই চরিত্র নিয়ে তার এমপি পদে থাকার ন্যূনতম যোগ্যতাও নেই। দ্রুত তার এমপি পদ থেকে পদত্যাগ করা উচিত। কারণ তার কাছে কোনো মা বোন নিরাপদ নয়। আমি সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই জরুরি ভিত্তিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে তার অশ্লীল ভিডিওগুলো অপসারণ করেন। অপসারণ না করলে অল্প বয়সের ছেলেমেয়েরা এই ধরনের গালাগালি এবং অশ্লীল কথাবার্তা শুনে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়বে। তাই প্রতিমন্ত্রীর অশ্লীল অডিও-ভিডিও দ্রুত সরাতে হবে।’