মানি লন্ডারিং অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর 

সম্প্রতি পর্যটননগরী কক্সবাজারে ক্যামেলকো সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেশের আর্থিক খাতের বরেণ্য ব্যক্তিগণ এই সম্মেলনে অংশ নিয়ে মানি লন্ডারিংয়ের বিভিন্ন ক্ষতিকর দিক নিয়ে আলোচনা করেন। বক্তাগণ একবাক্যে স্বীকার করেন যে, মানি লন্ডারিং যে কোনো দেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। মানি লন্ডারিংকে তারা অর্থনীতির ‘দুষ্টক্ষত’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এটা কোনোভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই যে, একটি দেশের অর্থনীতির স্বাভাবিক গতির জন্য মানি লন্ডারিং অত্যন্ত ক্ষতিকর।

তাই অধিকাংশ দেশ, বিশেষ করে যারা বৈদেশিক মুদ্রা সংকটে ভোগেন তারা কখনোই মানি লন্ডারিংকে উৎসাহিত করেন না। কিছু কিছু দেশ অন্য দেশ থেকে পাচারকৃত মুদ্রাকে তাদের দেশে স্বাগত জানালেও তারা নিজের দেশে মানি লন্ডারিংকে উৎসাহিত করে না। অনেক দেশই চায় অন্য দেশের মুদ্রা তাদের দেশে আসুক। এজন্য তারা নানা ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকে। যেমন, মালয়েশিয়া সেকেন্ড হোম প্রকল্পে যে কোনো বিদেশি নাগরিক একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করলে সে দেশে নাগরিকত্ব পেতে পারেন। কানাডাতেও এ ধরনের প্রকল্প আছে। সম্প্রতি তুরস্কও এমন একটি প্রকল্প চালু করেছে। সেখানে বাংলাদেশ থেকে তুরস্ক গমনকারী অন্তত ২০০ জন বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। এ ধরনের প্রকল্পে অন্য দেশ থেকে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য লোভনীয় অফার দিয়ে থাকে। বিভিন্ন দেশে অভ্যন্তরীণভাবে যারা দুর্নীতি বা অনিয়মের মাধ্যমে অর্থোপার্জন করেন, তাদের অনেকেই এসব প্রকল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের অবৈধ অর্থকে বৈধতা দেবার চেষ্টা করেন।

যেহেতু এসব প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য অধিকাংশ দেশই বৈধভাবে অর্থ নিয়ে যাবার জন্য অনুমতি প্রদান করে না, তাই অবৈধ অর্থের মালিক ও ধারকগণ পাচারের মাধ্যমে অর্থ বিদেশে নিয়ে যান। এভাবেই দেশে দেশে মুদ্রা পাচার বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী বাড়ছে মানি লন্ডারিং। অনেকেই মানি লন্ডারিং এবং মুদ্রা পাচারকে একই অর্থে ব্যবহার করে থাকেন। অথবা মানি লন্ডারিং আর মুদ্রা পাচারের পার্থক্য বুঝতে পারেন না। তারা মনে করেন, মানি লন্ডারিং আর মুদ্রা পাচার একই জিনিস। আসলে তাদের এই ধারণা মোটেও ঠিক নয়। মুদ্রা পাচার মানি লন্ডারিংয়ের একটি কৌশল হলেও মুদ্রা পাচার এবং মানি লন্ডারিং এক জিনিস নয়। মানি লন্ডারিংয়ের সংজ্ঞার প্রতি দৃষ্টি দিলেই মানি লন্ডারিং এবং মুদ্রা পাচারের ভিন্নতা বুঝতে পারব। সাধারণভাবে মানি লন্ডারিং বলতে এমন কার্যক্রমকে বোঝায়, যেখানে উপার্জিত অবৈধ অর্থ বা সম্পদের উৎস এবং পরিমাণ গোপন করে নানা রূপান্তর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অবৈধ অর্থকে অর্থনীতির মূল স্রোতধারায় প্রবিষ্ট করিয়ে বৈধতা দেওয়া হয়। সাধারণত তিনটি উপায়ে মানি লন্ডারিং করা হয়। এগুলো হচ্ছে (১) প্লেসমেন্ট,(২) লেয়ারিং এবং (৩) ইন্টিগ্রেশন। কোনো অপরাধমূলক কার্য হতে উদ্ভূত বা উপার্জিত অর্থ যখন প্রথমবারের মতো ফিন্যান্সিয়াল সিস্টেমে প্রবেশ করানো হয় তাকে প্লেসমেন্ট বলা হয়। লেয়ারিং বলতে প্লেসমেন্টকৃত অর্থ পর্যায়ক্রমে জটিল লেনদেনের মাধ্যমে বিভিন্ন স্তরে সরানোকে লেয়ারিং বলা হয়। পূর্ববর্তী দুটি পদ্ধতি সফল হবার পর ইন্টেগ্রেসনের মাধ্যমে অবৈধ অর্থ বা সম্পদ এমনভাবে ব্যবহƒত হয় যাতে মনে হয় উক্ত অর্থ বা সম্পদ বৈধ পথে উপার্জিত। আমাদের দেশের অনেকের মধ্যেই এমন ধারণা রয়েছে যে, মুদ্রা পাচার অর্থই হচ্ছে মানি লন্ডারিং। কিন্তু এটা মোটেও সঠিক ধারণা নয়। মুদ্রা পাচার মানি লন্ডারিংয়ের একটি কৌশল মাত্র। মানি লন্ডারিং দেশের অভ্যন্তরেও  হতে পারে। আবার মুদ্রা পাচারের মাধ্যমে বিদেশেও হতে পারে। যেমনÑকোনো একজন ব্যক্তি ডাকাতির মাধ্যমে অর্থোপার্জন করলেন। সেই অর্থ দিয়ে তিনি একটি স্কুল স্থাপন করলেন। সেই স্কুল থেকে যে উপার্জন হবে তা বৈধ উপার্জন হিসেবে বিবেচিত হবে। বৈধ অর্থও বিদেশে পাচার হতে পারে। কিন্তু মানি লন্ডারিং করা হয় অবৈধ অর্থ বা সম্পদ। ‘লন্ডারিং’ শব্দটি এসেছে লন্ড্রি থেকে। ময়লা কাপড় লন্ড্রিতে দিয়ে ধৈত করে যেমন পরিষ্কার করা হয় তেমনি অবৈধ অর্থকে লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া হয়। মানি লন্ডারিংয়ের কিছু কমন বৈশিষ্ট্য আছে। যেমনÑ যারা মানি লন্ডারিং করেন তারা কখনোই তাদের অর্থ বা সম্পদের উৎস এবং পরিমাণ প্রকাশ করেন না। তারা সব সময়ই চেষ্টা করেন কীভাবে অর্থের উৎস গোপন করে তার বৈধতা দেওয়া যায়।
মানি লন্ডারিং প্রতিটি দেশেই সংঘটিত হয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রাক্তন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাইকেল ক্যামদিসাস কয়েক বছর আগে বলেছিলেন, প্রতি বছর বিশ্বে যে অর্থ ও সম্পদ মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া হয় তার পরিমাণ বিশ্ব জিডিপির ২ থেকে ৫ শতাংশের সমান। অঙ্কের হিসাবে যার পরিমাণ ৮৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলার থেকে ২ ট্রিলিয়ন (এক ট্রিলিয়ন = এক লাখ কোটি) মার্কিন ডলারের সমান। কিন্তু এই পরিসংখ্যান কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। আগেই বলা হয়েছে, মানি লন্ডারগণ কখনোই তাদের অর্থের উৎস এবং পরিমাণ কাউকে জানায় না। মানি লন্ডারিংকৃত অর্থের হিসাব কোনো প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সংরক্ষিত হয় না, হওয়া সম্ভবও নয়। এছাড়া পরিসংখ্যানের মধ্যে যে ব্যবধান, তা যে ব্যবধান তা এই পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। ৮৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলার থেকে ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে ব্যবধান হচ্ছে ১ লাখ ১৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলার।

বাংলাদেশে প্রতি বছর কী পরিমাণ অর্থ মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে তার সঠিক কোনো হিসাব কারো পক্ষেই দেওয়া সম্ভব নয়। এমনকি কত টাকা প্রতি বছর পাচার হয় তাও জানা সম্ভব নয়। পাচারকৃত অর্থের প্রায় পুরোটাই মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে বৈধতা দেওয়া হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে ৭৫৩ কোটি ৩৭ লাখ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ ৬৪ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়। ২০১৫ সালে মোট ১ হাজার ১৫১ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার পাচার হয়। ২০০৮ সালে এর পরিমাণ ছিল ৫২৮ কোটি মার্কিন ডলার। ২০০৯, ২০১০, ২০১১, ২০১২ এবং ২০১৩ সালে যথাক্রমে ৪৯০ কোটি মার্কিন ডলার, ৭০৯ কোটি ডলার, ৮০০ কোটি ডলার, ৭১২ কোটি ডলার এবং ৮৮২ কোটি মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার হয়। জিএফআই বাংলাদেশ থেকে মুদ্রা পাচারের যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে, তা অবশ্যই উদ্বেগজনক। কিন্তু এটাই চূড়ান্ত হিসাব নয়। শুধু জিএফআই নয়, কোনো কর্তৃপক্ষই পাচার করা মুদ্রা এবং মানি লন্ডারিংকৃত অর্থের সঠিক পরিমাণ জানাতে পারবে না। মানি লন্ডারিং মাধ্যমে অবৈধ অর্থকে বৈধতা দেওয়া হয়। কিন্তু বৈধ এবং অবৈধ উভয় প্রকার মুদ্রাই পাচার হতে পারে। যেমনÑকোনো ব্যক্তির ছেলে হয়তো বিদেশে পড়াশোনা করে। তার ২৪ হাজার মার্কিন ডলার প্রয়োজন। কিন্তু বছরে ১২ হাজার মার্কিন ডলারের বেশি তার নিকট বৈধ পথে প্রেরণের কোনো সুযোগ নেই। এখন সেই ভদ্রলোক কী করতে পারেন? তিনি বৈধ পথে ১২ হাজার মার্কিন ডলার ছেলের নিকট পাঠিয়ে দিলেন। আবশ্যিক অবশিষ্ট ১২ হাজার মার্কিন ডলার তিনি হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে ছেলের নিকট পাঠিয়ে দিলেন। এই ১২ হাজার মার্কিন ডলারও বৈধ অর্থ, কিন্তু পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে তাকে অবৈধ পথে ডলার প্রেরণ করতে হলো।

বাংলাদেশে একশ্রেণির মানুষ অবৈধ পথে প্রচুর অর্থ কামিয়ে নিচ্ছেন। এই অবৈধ অর্থ তারা কোনো না কোনোভাবে মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বৈধতা দিচ্ছেন। মানি লন্ডারিং অবৈধ অর্থ উপার্জনকারীদের অর্থ বৈধতা দানের ক্ষেত্রে সহায়তা করে। অবৈধ অর্থ উপার্জনের সুযোগ অবারিত রেখে কখনোই মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। মানি লন্ডারিং নিয়ন্ত্রণ করতে হলে প্রথমেই অবৈধ অর্থ উপার্জনের রাস্তাগুলো বন্ধ করতে হবে। অবৈধ অর্থোপার্জনকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করতে হবে। মানি লন্ডারিং একটি দেশের অর্থনীতির জন্য খুবই ক্ষতিকর। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য মানি লন্ডারিং কোনোভাবেই অব্যাহতভাবে চলতে দেওয়া যায় না। তাই সম্মিলিতভাবে প্রচেষ্টার মাধ্যমে অর্থনীতির এই দুষ্টক্ষতকে দূর করার ব্যবস্থা করতে হবে। 

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড ও অর্থনীতিবিষয়ক লেখক