প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ভোটাধিকার নিশ্চিতের পাশাপাশি ও প্রবেশগম্য ভোটকেন্দ্র নিশ্চিতকরণে ১২ দফা সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংস্থা (বিপিইউএস)। বৃহস্পতিবার (৯ ডিসেম্বর) কাওরানবাজারে অবস্থিত ইত্তেফাক ভবনের মজিদা বেগম মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় এই সুপারিশমালা পেশ করা হয়।
দৈনিক ইত্তেফাক সম্পাদক তাসমিমা হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোটাধিকার ও প্রবেশগম্য ভোটকেন্দ্র নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক এই আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী, বিশেষ অতিথি ছিলেন সমাজসেবা অধিদফতরের পরিচালক মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম চৌধুরী।
মূল আলোচক ছিলেন ‘বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংস্থা’র নির্বাহী পরিচালক বদিউল আলম। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সরকারের এটুআই প্রকল্পের প্রতিবন্ধী বিষয়ক পরামর্শদাতা ভাস্কর ভট্টাচার্য ও ডিআরআরএ-এর নির্বাহী পরিচালক ফরিদা ইয়াসমিন।
আলোচনা সভায় ইত্তেফাক সম্পাদক তাসমিমা হোসেন বলেন, 'যারা ছোট আয়তনে নিজেদের অর্গানাইজেশনের মাধ্যমে সার্বিকভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সাহায্য করছেন, সেখানে সরকারের কাছে তাদের বক্তব্য তুলে ধরার জন্যই আজকের এই প্রচেষ্টা। প্রতিবন্ধী সম্পর্কিত রিসার্চ বা ডাটাবেজ আমাদের সঙ্গে শেয়ার করলে অবশ্যই আমাদের দায়িত্ববোধ থেকে এই সম্পর্কিত প্রতিবেদন-তথ্য প্রকাশ করার চেষ্টা করবো। আমি কথা দিচ্ছি, বছরে চারটা থেকে পাঁচটা লেখা আমরা প্রকাশ করবো। এটা আসলে সংবাদপত্রের দায়িত্ব।’
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাৎ হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘প্রতিবন্ধীদের জন্য কিছু করার ইচ্ছে থেকেই আজকের আলোচনা সভায় আমার আসা। আমি তাসমিমা হোসেন আপার সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে বলতে চাই, আমি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পাশে থাকতে চাই, তাদের সাহায্য করতে চাই। প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ আসলে এককভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের করার বিষয় নয়, সার্বিকভাবে সবাই মিলে কাজ করতে হবে।'
মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আমি মনে করি যেকোনো কাজের ক্ষেত্রে মাইন্ডসেটটা ভীষণ জরুরি। আপনি যদি ভালো কাজ করতে চান, আমার বিশ্বাস একজন অফিসারের পক্ষেই অনেক কিছু বদলানো সম্ভব। বর্তমানে সবকিছুই পজিটিভলি পরিবর্তন হচ্ছে, দেশ ডিজিটাল হচ্ছে। কাজেই আমরা হতাশা হতে চাই না। মাইন্ড সেট ঠিক রেখে ভালো কাজ করে যেতে হবে। বর্তমান সরকার সব সেক্টরেরই ডেভেলপ করছে, সমাজসেবা অধিদফতরও এর ব্যতিক্রম নয়। তাই সমাজসেবা অধিদফতর থেকে প্রতিবন্ধীদের জন্য সেবা উন্নয়ন করা সম্ভব।’
বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক বদিউল আলম বলেন, 'প্রতিবন্ধিতা প্রতিবন্ধকতা নয়, যদি প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয়। এছাড়া তিনি আগামী নির্বাচনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিষয়ে ইশতেহার আলোচনা করার অনুরোধ করেন। এছাড়া, তিনি নির্বাচন কমিশন অফিসে প্রতিবন্ধীদের জন্য মেইন একটি ভোকাল পারসন নিয়োগ করা হয়, এতে করে তিনি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতিনিধি হয়ে আমাদের কথাগুলো ওপর মহলে পৌঁছে দিতে পারবেন।’
সরকারের এটুআই প্রকল্পের প্রতিবন্ধী বিষয়ক পরামর্শদাতা ভাস্কর ভট্টাচার্য বলেন, ‘বর্তমান সরকারের যে আদর্শ, সোনার বাংলার আদর্শ, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী মানুষ হই, আমরা তাহলে অবশ্যই প্রতিবন্ধীবান্ধব মানুষ হবো। কেননা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ হচ্ছে সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া মানুষদের সামনে নিয়ে যাওয়ার আদর্শ। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ হচ্ছে রাষ্ট্রগঠনের আদর্শ। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বৈষম্যমুক্তির আদর্শ। সে আদর্শকে যদি আমরা ধারণ করি, তাহলে আমরা প্রতিবন্ধীবান্ধব মানুষ হবো।’
এছাড়া উপস্থিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে আলোচনায় অংশ নেন। অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে দৈনিক ইত্তেফাক সম্পাদক তাসমিমা হোসেন প্রধান অতিথি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরীর হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন।
আলোচনা সভায় যেসব সুপারিশ পেশ করা হয়েছে, সেগুলো হলো:
১। ভোটকেন্দ্রগুলো প্রবেশগম্য হতে হবে। সেখানে প্রতিবন্ধীবান্ধব টয়লেট থাকতে হবে।
২। দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ইভিএমে ভয়েজ নিশ্চিত করতে হবে।
৩। প্রতিবন্ধী মানুষকে ভোটকেন্দ্রে সাহায্য করার প্রিজাইডিং অফিসার অফিসার, পোলিং এজেন্ট ও সেচ্ছাসেবকদের প্রতিবন্ধিতা বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
৪। জাতীয় পরিচয়পত্রে প্রতিবন্ধিতার ধরন লিখতে হবে।
৫। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য উৎসাহিত ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে হবে। একইসঙ্গে নির্বাচনের পর কত শতাংশ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অংশগ্রহণ করেছেন, তার সমীক্ষা করতে হবে।
৬। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের রাজনৈতিক অধিকার ও নেতৃত্ব বিকাশে রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন ও সরকারের অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ নিতে হবে।
৭। বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত করার জন্য সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১২২ সংশোধন করতে হবে।
৮। ভোট দেওয়ার সময় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের গোপনীয়তা রক্ষা করা।
৯। ভোটকেন্দ্রগুলোর অবকাঠামোগত ও তথ্যগত প্রবেশগম্যতার ব্যবস্থা করা।
১০। তথ্যপ্রাপ্তি ও যোগাযোগের বাধা দূর করা।
১১। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোট দেওয়ার বিষয়ে জনগণকে সচেতন করার ব্যবস্থা নিতে হবে।
১২। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নির্বাচনে পর্যবেক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করা।