দিনের বেলায় কেউ ভ্রাম্যমাণ ফল বিক্রেতা, কেউ অটোরিকশা চালক। আর রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে হয়ে যায় সংঘবদ্ধ চোরের চক্র। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বলছে, এই চক্রটি দিনের বেলায় শ্রমিক সেজে মূলত বিভিন্ন বাসা-বাড়ি রেকি করে। সুযোগ বুঝে রাতে দুধর্ষ চুরি করে। এভাবে প্রায় চার-পাঁচ বছর ধরে চক্রটি এমন চুরি করে আসছে। চক্রটির ৪ সদস্যকে গ্রেফতারের পর শনিবার (১১ ডিসেম্বর) বিকাল ৩ টায় কাওরানবাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এমন তথ্য জানান সংস্থাটির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলো নাসির শেখ (২৫), মো. ফরহাদ (২৯), মো. সেলিম (২৬), মো. আজাদকে (৩৮)। গ্রেফতারের সময় তাদের কাছ থেকে চুরির কাজে ব্যবহৃত ২টি দেশীয় অস্ত্র, ৪টি মোবাইলফোন সেট, ২টি পোশাক, নগদ ৪ হাজার ৮০০ টাকা ও বিভিন্ন বাসা থেকে চুরি করা গলিত স্বর্ণের বারসহ ৪টি অলঙ্কার উদ্ধার করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘এই চক্রের সদস্য সংখ্যা ৬/৭ জন। ফাঁকা বাড়িই তাদের লক্ষ্য। ধানমন্ডির এমনই একটি ফাঁকা বাসায় গত ৬ ডিসেম্বর রাতে চুরির পরিকল্পনা করে তারা। ভাড়া করা মেসে চোরচক্রের ৫ সদস্য পরিকল্পনা করার জন্য একত্রিত হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী ৭ ডিসেম্বর রাতে চুরি করে সেই বাসায়। তারা ওইদিন রাতে ধানমন্ডির একটি বাসার জানালার গ্রিল কেটে ভেতরে ঢুকে চুরির ঘটনা ঘটে। এই সময় চোর দলের সদস্যরা আলমারি, ওয়ারড্রব ভেঙে প্রায় ২০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়।’
র্যাবের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘তাদের এই চুরির দৃশ্যটি প্রবাসে অবস্থানরত বাড়ির মালিক সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে দেখতে পান। পরবর্তী সময়ে সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুরুত্বসহ প্রচারিত হলে আলোড়ন সৃষ্টি হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘ওই ঘটনায় র্যাব ছায়া তদন্ত শুরু করে। একইসঙ্গে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়ে দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার (১০ ডিসেম্বর) দিবাগত রাতে র্যাব-২ রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও ঢাকা উদ্যান এলাকায় অভিযান চালিয়ে চোর চক্রের ৪ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা চুরির কথা স্বীকার করে।’
খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার ব্যক্তিরা জানিয়েছে, তারা ধানমন্ডি-মোহাম্মদপুর এলাকাকেন্দ্রিক একটি সংঘবদ্ধ চোর চক্রের সদস্য। সবাই শ্রমিক পেশার আড়ালে দীর্ঘদিন যাবত সংঘবদ্ধভাবে চুরি, ছিনতাইসহ অন্যান্য অপরাধ করে আসছিল।’
জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতাররা র্যাবকে জানায়, চুরির পরদিন সকালে তারা চুরি করা স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে আজাদের স্বর্ণের দোকানে যায়। এরপর ৫০ হাজার টাকায় সেগুলো বিক্রি করে। পরবর্তী সময়ে সেই টাকা নাসির, ফরহাদ ও সেলিমসহ দলের আরও ২ জন নিজেদের মধ্যে ভাগবণ্টন করে নেয়। আজাদ স্বর্ণালঙ্কার কেনার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো গলিয়ে ফেলে।
নাসির পেশায় একজন স্যানিটারি মিস্ত্রি। সে ৫/৬ বছর যাবত তার পেশার আড়ালে চুরি, ছিনতাইসহ অন্যান্য অপরাধে জড়িত হয়ে পড়ে। ধানমন্ডির বাসায় চুরির ঘটনায় গ্রিল কাটার পর প্রথম সে বাসায় ঢোকে। তার নামে ডিএমপির বিভিন্ন থানায় চুরি ও ছিনতাইয়ের অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে।
ফরহাদ পেশায় একজন ফল বিক্রেতা। সে এই চোর চক্রের অন্যতম সদস্য। ধানমন্ডির বাসায় চুরির ঘটনায় তাকে বাসার ভেতর টর্চ লাইট দিয়ে আলো ফেলতে ও গ্রিল কাটতে দেখা যায়। এর আগে ২০১৭ তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ।
সেলিম পেশায় সবজি বিক্রেতা। সেও চক্রের নিয়মিত সদস্য। ধানমন্ডির বাসায় চুরির ঘটনায় সে সানশেডে থেকে গ্রিল কাটতে সহায়তা করে।
আজাদ স্বর্ণালঙ্কার ব্যবসায়ী। রাজধানীর বছিলায় তার স্বর্ণের দোকান রয়েছে। এই ব্যবসার পাশাপাশি চোরাই স্বর্ণালঙ্কার ক্রয়-বিক্রয়ের কাজে জড়িত সে। জিজ্ঞাসাবাদে আজাদ জানায়, সে এর আগেও চুরি ও ছিনতাই করা স্বর্ণালঙ্কার কম দামে কিনে বেশি লাভে বিক্রি করেছে।
খন্দকাল আল মঈন জানান, গ্রেফতার চার জনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।