নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলায় ইউপি নির্বাচনে বিজিবি সদস্য নিহতের ঘটনায় মামলার প্রধান আসামিকে গ্রেফতার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)।
সোমবার (১২ ডিসেম্বর) মো. মারুফ হোসেন ওরফে অন্তিককে ঢাকার আশুলিয়া থেকে গ্রেফতার করা হয়। মঙ্গলবার (১৩ ডিসেম্বর) কাওরানবাজার র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের মুখপাত্র কমান্ডার খন্দকার আল মঈন এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত মারুফ ভোট কেন্দ্রে হামলা এবং বিজিবি সদস্য হত্যার ঘটনায় বিভিন্ন তথ্য প্রদান করেছে। মারুফের পিতা মৃত মোসাদ্দেক হোসেন নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলায় গড়াগ্রাম ইউনিয়নের ১৯ বছর ধরে চেয়ারম্যান ছিলেন। তার পিতা ২০১৭ সালে মৃত্যুবরণ করলে তিনি উপ-নির্বাচনে নির্বাচিত হন।
জিজ্ঞাসাবাদে মারুফ জানায়, তার নির্বাচনী মূল্যায়ন অনুযায়ী নির্বাচনে জয়লাভ করতে তার স্থায়ী নিবাস এলাকার গড়াগ্রাম ইউনিয়নের ভোট কেন্দ্রে পশ্চিম দলিরাম মাঝাপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে প্রায় সব ভোট প্রয়োজন। যে কোন মূল্যে সে এই কেন্দ্রের প্রায় সকল ভোট তার অনুকূলে যেন হয় তার জন্য সে প্রয়োজনে পেশীশক্তি ব্যবহার করবে বলে পরিকল্পনা করে। মারুফ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পূর্ব থেকেই কেন্দ্র দখল এবং প্রয়োজনে হামলা করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে।
জিজ্ঞাসাবাদে আরও জানা যায় , পরিকল্পনা অনুযায়ী ভোট চলাকালীন আনুমানিক ৩টা ১৫ মিনিটে তার পক্ষের প্রায় ২০ থেকে ৩০ জন সমর্থক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে ভোট কেন্দ্রে অনধিকার প্রবেশ করে জোরপূর্বক জাল ভোট দেওয়ার চেষ্টা করে। ভোট কেন্দ্রের কর্তব্যরত পুলিশ অফিসার তাদের কেন্দ্র থেকে বের করে দিতে চেষ্টা করলে তারা তাকে গালি-গালাজসহ শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। পরবর্তীতে প্রিজাইডিং অফিসার উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে মোবাইলে উক্ত ঘটনা অবহিত করলে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার নির্দেশক্রমে ভোট গ্রহণ সাময়িক স্থগিত করা হয়।
অতিরিক্ত পুলিশ টহল দল ঘটনাস্থলে এসে আইন-শৃঙ্খলার পরিবেশ স্বাভাবিক করে। বিকেল সাড়ে ৪টায় ভোট গ্রহণ সমাপ্ত ঘোষণা করে ভোট গণনা শুরু করা হয়। কেন্দ্রে মোট ২৯৭১ ভোটের মধ্যে গ্রেফতারকৃত প্রার্থীর পক্ষে ২৩৩৬ ভোট এবং অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীরা যথাক্রমে; ৭০টি ও ০৬টি ভোট প্রাপ্ত হয়। ইতোমধ্যে অন্য ৮টি কেন্দ্রের ফলাফল বিশ্লেষণে সে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ভোটের তুলনায় সামান্য পিছিয়ে থাকায় সে ফলাফল পরিবর্তনের জন্য (সম্পূর্ণ ভোট তার পক্ষে প্রদানের জন্য) প্রিজাইডিং অফিসারকে আটকে রেখে চাপ দিতে থাকে। প্রিজাইডিং অফিসার অপারগতা প্রকাশ করলে সে সহ তার প্রায় শতাধিক সমর্থকসহ বিভিন্ন ধারালো দেশীয় অস্ত্র নিয়ে প্রিজাইডিং অফিসার, অন্যান্য নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ, কেন্দ্রের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপর হামলা করে আহত করে।
এ সময় নির্বাচনের কাজে ব্যবহৃত সরকারী যানবাহন ও নির্বাচন কেন্দ্রে ব্যাপক ভাংচুর চালায়। আনুমানিক সাড়ে ৮টায় বিজিবি টহল দল উপস্থিত হলে মারুফ হোসেন তার সমর্থকরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে বিজিবি সদস্যদের উপর চড়াও হয়। সংঘর্ষের একপর্যায়ে গুরুত্বর জখমের ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে নায়েক রুবেল ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন এবং আরও অনেকেই গুরুত্বর আঘাতপ্রাপ্ত হয়।
উল্লেখ্য, গত ২৮ নভেম্বর সারাদেশে ৩য় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ থানার গড়াগ্রাম ইউনিয়নের ভোটকেন্দ্র নং-৫৯, পশ্চিম দলিরাম মাঝাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহিংসতার ঘটনায় বিজিবি সদস্য নায়েক রুবেল হোসেন নিহত হন। এ ঘটনায় ভোট কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার ললিত চন্দ্র রায় বাদী হয়ে গত ৩০ নভেম্বর ৯৫ জন আসামির নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাতনামা আরও অনেকের নামে নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। এরই ধারাবাহিকতায় র্যাব সদর দপ্তর গোয়েন্দা শাখা ও র্যাব-৪-এর অভিযানে গতকাল রাতে ঢাকার আশুলিয়া এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে তাকে গ্রেফতার করে।